মোবাইল নিষেধাজ্ঞা ঘিরে বিতর্ক, ইসিতে যাচ্ছে জামায়াত–এনসিপি

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে ভোটকেন্দ্রে মোবাইল ফোন বহনের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করায় নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) এই সংক্রান্ত নির্দেশনা প্রকাশ্যে আসার পর রাজনৈতিক অঙ্গন ও সাধারণ ভোটারদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ জানাতে যাচ্ছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট ও ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি)।
বিজ্ঞাপন
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের এই নিষেধাজ্ঞাকে অযৌক্তিক আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ভোটকেন্দ্রে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এর মাধ্যমে কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে বাড়তি সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে কি না, সে প্রশ্নও উঠে আসে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, ভোট দিতে আসা মানুষের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। এমন অবস্থায় মোবাইল ফোন সঙ্গে রাখা অনেক সময় জরুরি হয়ে পড়ে। কিন্তু ৪০০ গজের মধ্যে মোবাইল নিষিদ্ধ করা হলে ভোটাররা ফোন কোথায় রাখবেন—সে বিষয়ে কোনো বাস্তবসম্মত ব্যাখ্যা নেই। অবিলম্বে এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে তিনি জানান, ১১ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে বিকেলেই নির্বাচন কমিশনে গিয়ে বিষয়টি উত্থাপন করা হবে।
বিজ্ঞাপন
এনসিপিও এই কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছে বলে জানা গেছে। দলটির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মিডিয়া সেক্রেটারি ইয়াসির আরাফাত জানান, এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ১১ দলের প্রতিনিধি হিসেবে ইসিতে যাবেন।
এনসিপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ভোটকক্ষের ভেতরে মোবাইল ফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হলে সেটি যুক্তিসংগত হতে পারত। কিন্তু ভোটকেন্দ্রের ৪০০ গজের মধ্যে মোবাইল বহনে নিষেধাজ্ঞার কোনো বাস্তব যুক্তি নেই। ইয়াসির আরাফাত বলেন, এর মানে কি ভোটারদের বাড়িতে মোবাইল রেখে ভোট দিতে যেতে হবে? সরকারি দায়িত্বে থাকা লোকজন ছাড়া কেউ মোবাইল রাখতে পারবে না—এমন সিদ্ধান্ত বাস্তবতা বিবর্জিত।
তিনি আরও বলেন, ভোটকেন্দ্রে কোনো অনিয়ম বা অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে তার প্রমাণ সংগ্রহের একটি বড় মাধ্যম হলো ভোটারদের মোবাইলে ধারণ করা ছবি ও ভিডিও। এই সুযোগ বন্ধ করে দেওয়া হলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রশ্ন তৈরি হবে। তার মতে, এ ধরনের সিদ্ধান্ত অহেতুক সন্দেহ ও বিতর্ক বাড়াচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য জানতে ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ এবং পরিচালক (জনসংযোগ) ও তথ্য প্রদানকারী কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিন মল্লিকের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা ফোন রিসিভ করেননি।
ইসির জারি করা নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ভোটের দিন এই নিষেধাজ্ঞা কঠোরভাবে বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) ইসির জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব মো. শহিদুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এই নির্দেশনা প্রকাশ্যে আসে।
বিজ্ঞাপন
নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে ভোটকেন্দ্রের ৪০০ গজের মধ্যে সাধারণ ভোটারদের জন্য মোবাইল ফোন বহন নিষিদ্ধ থাকবে। তবে প্রিজাইডিং অফিসার, ভোটকেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা, আনসার সদস্য এবং ‘নির্বাচন সুরক্ষা ২০২৬’ অ্যাপ ব্যবহারকারী দুজন নির্দিষ্ট আনসার সদস্য মোবাইল ফোন রাখতে পারবেন।
এদিকে, এই সিদ্ধান্ত নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও আলোচনা তুঙ্গে। সাংবাদিক সোহেল রানা এক ফেসবুক পোস্টে প্রশ্ন তুলেছেন—ভোট সংক্রান্ত সমস্যা বা অভিযোগ জানাতে সরকার যখন হটলাইন নম্বর দিয়েছে, তখন ভোটকেন্দ্রের আশপাশে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ থাকলে ভোটাররা কীভাবে সেই হটলাইনে যোগাযোগ করবেন। পথে কোনো বাধা বা হামলার শিকার হলে ফোন করার সুযোগ না থাকলে ভোটারদের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত হবে, সে প্রশ্নও তুলেছেন তিনি।
সব মিলিয়ে, ভোটকেন্দ্রে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, নিরাপত্তা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর আনুষ্ঠানিক অভিযোগ ও চাপের মুখে নির্বাচন কমিশন এ সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করে কি না, সেদিকেই এখন নজর সংশ্লিষ্ট মহলের।








