নির্বাচনে এগিয়ে বিএনপি, তরুণদের ভরে শক্ত অবস্থানে জামায়াত

দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় পর আবারও প্রকৃত অর্থে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সামনে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই নির্বাচনের মাধ্যমে ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাচ্ছেন দেশের মানুষ—যা অনেকের কাছেই একটি বড় রাজনৈতিক মোড়বদল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো রাজপথ ও নির্বাচনী প্রক্রিয়া থেকে কার্যত কোণঠাসা ছিল। কখনও নির্বাচন বর্জন, কখনও শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তার ও দমন–পীড়নের কারণে নির্বাচনী মাঠে প্রতিযোগিতা সীমিত হয়ে পড়ে। তবে ২০২৪ সালের ছাত্র–জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা দ্রুত বদলে যায়। এবারের নির্বাচন সেই পরিবর্তিত বাস্তবতারই প্রতিফলন।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, দীর্ঘদিন একচেটিয়া ক্ষমতার পর আওয়ামী লীগ বর্তমানে নিষিদ্ধ থাকায় এবারের নির্বাচনী লড়াই মূলত দুই শিবিরে বিভক্ত। একদিকে রয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট। বিশ্লেষকদের মতে, এই দুই শক্তির মধ্যেই নির্ধারিত হবে আগামী দিনের ক্ষমতার ভারসাম্য।
বিজ্ঞাপন
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান জানিয়েছেন, তার দল সংসদের প্রায় সব আসনেই প্রার্থী দিয়েছে এবং এককভাবে সরকার গঠনের মতো ফল পাওয়ার ব্যাপারে তারা আশাবাদী। দলের অভ্যন্তরীণ হিসাব অনুযায়ী, বিএনপি ৩০০ আসনের মধ্যে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে পারে বলে তারা মনে করছে।
অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটও এবারের নির্বাচনে বড় চমক দেওয়ার প্রত্যাশা করছে। দলটির নেতাদের দাবি, তাদের ‘পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি’ এবং তরুণ ভোটারদের সমর্থন এবার তাদের শক্ত ভিত তৈরি করেছে। বিশেষ করে অনূর্ধ্ব-৩০ বছর বয়সী তরুণ সমাজ—যাদের একটি বড় অংশ ২০২৪ সালের আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিল—তারা এখন জামায়াতঘনিষ্ঠ জোটের সঙ্গে সমন্বয় করে মাঠে কাজ করছে বলে বিভিন্ন বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
জরিপ ও গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের মোট ভোটারের প্রায় এক-চতুর্থাংশই জেনারেশন জেড বা তরুণ ভোটার। তাদের বড় একটি অংশ এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি।
বিজ্ঞাপন
সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, প্রায় সাড়ে ছয় শতাংশ ভোটার এখনো দ্বিধায় রয়েছেন, যা নির্বাচনের ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। তরুণদের ভোট কোন দিকে যাবে, সেটিই নির্ধারণ করতে পারে পরবর্তী সরকারপ্রধানের নাম।
ভোটারদের প্রধান উদ্বেগের জায়গা হিসেবে উঠে এসেছে দুর্নীতি ও লাগামহীন মূল্যস্ফীতি। ধর্মীয় পরিচয় বা প্রতীকের চেয়ে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, জবাবদিহিমূলক সরকার ও কার্যকর নেতৃত্বকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন ভোটাররা।
বিজ্ঞাপন
বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতের প্রতি একাংশ ভোটারের আগ্রহ ধর্মীয় অবস্থানের কারণে নয়, বরং দুর্নীতিমুক্ত ও শৃঙ্খলাবদ্ধ ভাবমূর্তির কারণেই।
এই নির্বাচন শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই নয়, আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। শেখ হাসিনা পরবর্তী বাংলাদেশে ভারতের প্রভাব কিছুটা হ্রাস পেয়েছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা, একই সঙ্গে চীনের প্রভাব তুলনামূলকভাবে শক্ত হয়েছে। বিএনপিকে দিল্লির সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে বাস্তববাদী মনে করা হলেও জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট ভারতীয় প্রভাব নিয়ে বেশি সমালোচনামুখর অবস্থান নিচ্ছে। তবে দুই পক্ষই দাবি করছে, ক্ষমতায় গেলে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে সব দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা হবে।
বিজ্ঞাপন
নির্বাচনী প্রচারণার চিত্রেও বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। রাজধানীসহ সারা দেশে বিএনপির ‘ধানের শীষ’ ও জামায়াতের ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীকের পোস্টার, ব্যানার ও প্রচারণা কার্যালয় চোখে পড়ছে। সড়কের মোড়ে মোড়ে প্রচারণার গান ও মিছিল আগের নির্বাচনের তুলনায় অনেক বেশি দৃশ্যমান। একসময় যেখানে প্রায় এককভাবে ‘নৌকা’ প্রতীকের আধিপত্য ছিল, সেখানে এবারের মাঠ অনেক বেশি প্রতিযোগিতামূলক।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে একটি স্পষ্ট ও গ্রহণযোগ্য রায় আসে, তাহলে কয়েক মাসের রাজনৈতিক অস্থিরতার পর দেশ আবার স্থিতিশীলতার পথে ফিরতে পারে। সাম্প্রতিক অস্থিরতায় তৈরি পোশাক শিল্পসহ গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একটি কার্যকর সরকার গঠন না হলে বিনিয়োগ সংকট ও বৈদেশিক মুদ্রার চাপ কাটানো কঠিন হয়ে পড়বে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন অর্থনীতিবিদরা।
সব দিক বিবেচনায়, বিএনপি এগিয়ে থাকলেও জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট, বিশেষ করে তরুণ ভোটের ওপর ভর করে, শক্ত অবস্থানে রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই নির্বাচনের ফলই নির্ধারণ করবে কে হচ্ছেন বাংলাদেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী—তারেক রহমান নাকি জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের কোনো নেতা। তবে শেষ কথা বলবে ব্যালট, আর সেই রায়ের দিকেই তাকিয়ে আছে গোটা দেশ।
বিজ্ঞাপন
সূত্র: রয়টার্স ও ডয়চে ভেলে








