জিন্নাহকে ‘শ্রদ্ধা-ভালোবাসায়’ স্মরণ, ইনকিলাব মঞ্চে সমালোচনার ঝড়

১৯৪৮ সালে ঢাকায় এসে উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দেওয়া মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে ‘গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায়’ স্মরণ করেছে শহীদ শরীফ ওসমান হাদির ‘ইনকিলাব মঞ্চ’। পাকিস্তানের প্রথম গভর্নর জেনারেলের ৭৮তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে সংগঠনটির দেওয়া এই শ্রদ্ধা বার্তা প্রকাশ্যে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
বিজ্ঞাপন
গত শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) রাতে ইনকিলাব মঞ্চের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে জিন্নাহর একটি সাদাকালো প্রতিকৃতি প্রকাশ করে তাকে স্মরণ করা হয়। পোস্টে তার জন্ম ও মৃত্যুর তারিখ হিসেবে ২৫ ডিসেম্বর ১৮৭৬ এবং ১১ সেপ্টেম্বর ১৯৪৮ উল্লেখ করা হয়েছে।
পোস্টের সঙ্গে দেওয়া আনুষ্ঠানিক বার্তায় বলা হয়, ‘উপমহাদেশের অন্যতম রাজনীতিবিদ, দ্বিজাতিতত্ত্বের প্রবক্তা, পাকিস্তান রাষ্ট্রের অন্যতম স্বপ্নদ্রষ্টা ও পাকিস্তানের প্রথম গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ। বার্তাটিতে জিন্নাহকে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের একজন প্রভাবশালী নেত হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
পাকিস্তানের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ১৮৭৬ সালের ২৫ ডিসেম্বর করাচিতে জন্মগ্রহণ করেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মাত্র এক বছর পর ১৯৪৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর তিনি মারা যান। নতুন রাষ্ট্রটির প্রথম গভর্নর জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ১৯৪৮ সালের মার্চে তিনি ঢাকা সফরে আসেন।
ওই সফরে রেসকোর্স ময়দান, যা বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান নামে পরিচিত, এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে দেওয়া বক্তব্যে জিন্নাহ উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার কথা ঘোষণা করেন। তার বক্তব্যের প্রতিবাদে উপস্থিত ছাত্ররা তাৎক্ষণিকভাবে ‘নো, নো’ ধ্বনি দেন।
জিন্নাহর ওই অবস্থান তৎকালীন পূর্ব বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি জনগোষ্ঠীর ভাষা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে বিবেচিত হয়। পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলন ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে রূপ নেয়, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত।
বিজ্ঞাপন
ইনকিলাব মঞ্চের পক্ষ থেকে জিন্নাহকে ‘শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায়’ স্মরণ করে দেওয়া পোস্টটি প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। সাধারণ ব্যবহারকারী, অধিকারকর্মী ও রাজনৈতিকভাবে সচেতন বিভিন্ন মহলের অনেকে পোস্টটির সমালোচনা করেছেন।
সমালোচকদের একাংশের বক্তব্য, যে রাজনৈতিক নেতৃত্বের সময় বাঙালির ভাষা, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক অধিকারের ওপর দমন-পীড়নের সূচনা হয়েছিল, তাকে একটি গণআন্দোলনের চেতনা ধারণের দাবিদার সংগঠনের পক্ষ থেকে এভাবে শ্রদ্ধা জানানো সাংঘর্ষিক।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই উল্লেখ করছেন, দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তান রাষ্ট্রের কাঠামোর মধ্যেই তৎকালীন পূর্ব বাংলার মানুষের সঙ্গে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বৈষম্য তৈরি হয়েছিল। দীর্ঘদিনের সেই বৈষম্য ও শোষণ পরবর্তী সময়ে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনকে তীব্র করে তোলে।
বিজ্ঞাপন
সমালোচকদের মতে, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানি শাসন থেকে স্বাধীনতা অর্জন এবং বিপুল প্রাণহানির পর স্বাধীন বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে জিন্নাহকে মহিমান্বিত করে স্মরণ করা ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
এ কারণে ইনকিলাব মঞ্চের ওই ফেসবুক পোস্টকে ঘিরে রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে।








