Logo

দেশের প্রথম পুলিশ প্রতিষ্ঠিত হয় চুয়াডাঙ্গায়, অত:পর নীল চাষে সফলতা

profile picture
কাজী শুভ্র রহমান
৭ জুন, ২০২৬, ১৬:৪৮
দেশের প্রথম পুলিশ প্রতিষ্ঠিত হয় চুয়াডাঙ্গায়, অত:পর নীল চাষে সফলতা
ছবি: সংগৃহীত

ক) পূর্ব বঙ্গের উর্বর এবং সমতল ভূমিতে সর্ব প্রথম থানা ও পুলিশ বাহিনী প্রতিষ্ঠা করে ইষ্ট-ইন্ডিয়া কোং চুয়াডাঙ্গাতে। ৫টি নদী বেষ্টিত চুয়াডাঙ্গার প্রবেশ পথ ছিল চমকপ্রদ। সমতল ভূমি ও জলবায়ু নীল চাষের উপযোগী হওয়ায় ইষ্ট-ইন্ডিয়া কোং চুয়াডাঙ্গার সমগ্র জনপদে নীল চাষের পরিকল্পনাসহ নীল নক্সা প্রণয়ন করে।

বিজ্ঞাপন

শেষ নবাবের পতনের পর ১৭৫৭ খৃষ্টাব্দে ভারতবর্ষের ক্ষমতা চলে আসে ইষ্ট ইন্ডয়িা কোম্পানীর হাতে। ব্যবসা বাণিজ্যের নামে এ দেশে প্রবেশের পর প্রথমে দখলে নেয় মসনদ দ্বিতীয়ত: চলে লুটতরাজ, নারী নির্যাতন, ধর্ষণ, গুম, খুন। পুতুল সরকার মীর জাফরকে সরিয়ে ১৭৬০ খৃষ্টাব্দের ভিতরে সকল ক্ষমতার উৎস চলে আসে কোম্পানীর বেনয়িদের হাতে। ১৮০০ খৃষ্টাব্দের দিকে পরিকল্পনা করে নীল চাষের এবং সে লক্ষে সমগ্র চুয়াডাঙ্গাকে ১৭ টি কনসার্নে বাণিজ্যিক ও উৎপাদন কেন্দ্রে ভাগ করে নীল চাষের যাত্রা শুরু করে। নীল চাষে উদ্বুদ্ধ করতে দীর্ঘ আট বছর নীলকর সাহেবরা প্রাণান্তকর চেষ্টা করে কিন্ত চাষিরা অনাগ্রহ দেখাতে থাকে। নীল চাষে উদ্ধুদ্ধ করতে ভাল পথে ফলপ্রসু না হওয়াতে পুলিশ বাহিনী গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়। উদ্দেশ্য পুলিশ দিয়ে অত্যাচার করে নীল চাষে বাধ্য করা। এ আলোকে ইংল্যান্ড থেকে বেকার, ভবঘুরে, অপরাধী, অশিক্ষিত লোকদেরকে নিয়ে এসে পুলিশ বাহিনী গঠন করে। শিক্ষিত সাহেবরা হয় থানা প্রধান ইন্সপেক্টর এবং মাঠ পর্যায়ের কর্মীদেরকে বলা হতো কন্সটেবল। এ দেশের মানুষ ইন্সপেক্টরকে বলতো দারোগা কন্সটেবলদেরকে বলতো সিপাহি। ভৈরব, নবগঙ্গা, মাথাভাঙ্গা, কুমার ও মৈশাল (বর্তমানে চিত্রা) নদীকে কেন্দ্র করে ১৮০৮ খৃষ্টাব্দে ক) দামুড়হুদা খ) কালুপালিয়া ও গ) হার্দিতে তিনটি থানা প্রতিষ্ঠিত করে।

খ) ১৮১৭ খৃষ্টাব্দের দিকে কালুপালিয় থানার দারোগা অত্র এলাকার বিশিষ্ট ধনী সমাজসেবক রাজা রাখাল চন্দ্রকে বেইজ্জতি করলে দুই গ্রামের লোক ক্ষুব্ধ হয়ে থানা আক্রমণ ক’রে উক্ত দারোগাকে হত্যা করে সেই সাথে বাকি পুলিশ সদস্য পালিয়ে চুয়াডাঙ্গায় আশ্রয় নেয়। চুয়াডাঙ্গাকে নিরাপদ ভেবে ১৮১৮ খৃষ্টাব্দে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষ কোম্পানীর ৪৩ নং পত্রের আদেশে খতিয়ান নং ১৬ এর আরএস দাগ নং ৫৩১৯, মৌজা বুজরুক গড়গড়ি, চুয়াডাঙ্গাতে থানা প্রতিষ্ঠা করে। প্রথমে টিনশেড থাকলেও পরবর্তিতে বর্তমান থানা ভবনের উত্তরে ২০ ইঞ্চি গাঁথুনীর দৃিষ্ট নন্দন থানা ভবন তৈরি করে।

চুয়াডাঙ্গা জেলা ঘোষিত হওয়ার পরেও সব মিলিয়ে প্রায় ১৭০ বছর কার্যক্রম চলেছে পুরাতন থানা ভবনে। চুয়াডাঙ্গা সদর থানার জায়গার পরিমান ১.২৭৭৫ একর। থানার পশ্চিমে মাথাভাঙ্গা নদী যেখানে জাহাজ ভিড়ত সাহেবদের। পশ্চিমেই ছিল জিতেন্দ্র মোহন্তের ঠাকুরবাড়ি এবং হাজী ইসলাম মালিকের জমি যা ১৮১৮ খৃষ্টাব্দে এ্যাকুয়ার করে নেয় ইষ্ট ইন্ডিয়া কোং।

বিজ্ঞাপন

গ) ১৮০৮ খৃষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয় হার্দি থানা। কাঁচিকাটা কনসার্নের অধীনে ছিল ১৫টি নীলকুঠি। এগুলো ভালভাবে পরিচালনার জন্য প্রাচিন গ্রাম হার্দিতে থানা প্রতিষ্ঠা করে।যাতায়াত ব্যবস্থা ভাল না থাকায় বৃটিশ সরকার ১৯০৮ খৃষ্টাব্দের ১৭ই নভেম্বর থানা সরিয়ে আনে অলমডাঙ্গায়। প্রথমে একটি টিনশেড ঘরে থানার কার্যক্রম শুরু করে। পরবর্তিতে জায়গা এ্যাকুয়ার করে বর্তমান স্থানে নিয়ে আসে। যার এ্যাকুয়ার্ড লেটার নং ৩০৭১ সি/ডি, ফরম নং ১৭, দাগ নং এসএ ১৭৪৩, আরএস ৪৭৩২ খতিয়ান নং১, ডিক্লেয়ারেশন লেটার নং ২০৯০। অলমডাঙ্গা থানার জায়গার পরিমান ২ একর ১৫ কাঠা ২৮ ছটাক। উত্তরে কালিপদ বিশ্বাসের, পূবে ঈমান আলী মন্ডলের জমি।

দক্ষিণে জেলা বোর্ডের রাস্তা, পশ্চিমে রাশ বিহারী ও রাম রতন জালানের সম্পত্তি। চুয়াডাঙ্গা মহকুমা তথা বর্তমান জেলার সবচেয়ে বড় থানা আলমডাঙ্গা।

ঘ) ১৮০৮ খৃষ্টাব্দে দামুড়হুদা থানা প্রতিষ্ঠা হলেও তার নথিপত্র পাওয়া যায়নি। যোগযোগ ব্যবস্থা ভাল হওয়ায় দামুড়হুদায় মহকুমা প্রতিষ্ঠিত হয়। দেশের সবচেয়ে বড় নীলকুঠি তথা বড় কনসার্ন ছিল কার্পাসডাঙ্গা নীলকুঠি। যা সম্পূর্নরূপে বিলুপ্ত করা হয় ২০০৪ খৃষ্টাব্দে। বর্তমানে দুটি পিলার দৃশ্যমান।

বিজ্ঞাপন

ঙ) দৌলৎ শাহ্ নামে জনৈক বুজুর্গ ইসলাম ধর্ম প্রচারের লক্ষে বর্তমান জীবননগরে আস্তানা গাড়েন এবং ধীরে ধীরে বসতি গড়ে ওঠে। পরবর্তিতে তাঁর নামানুসারে এলাকার নামকরণ হয় দৌলৎগঞ্জ। সেখানে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী ১৮২৫ খৃষ্টাব্দে সর্বপ্রথম একটি পুলিশ ফাঁড়ি প্রতিষ্ঠা করে। ১৮৩২ খৃষ্টাব্দে পূর্ণাঙ্গ থানায় রূপান্তরিত হয়। ১৯০৫ খৃষ্টাব্দে বৃটিশ সরকার দৌলৎগঞ্জ থানার নাম বিলুপ্ত করে নামকরণ করে জীবননগর থানা।

চ) বৃটিশ সরকার ১৯১৯ খৃষ্টাব্দে দর্শনাতে একটি পুলিশ ফাঁড়ি প্রতিষ্ঠা করে। ১০১ বছর পরে ২০২০ খৃষ্টাব্দে তদানিন্তন আওয়ামী সরকার ২৯শে ফেব্রুয়ারী ফাঁড়ি বিলুপ্ত করে পূর্ণাঙ্গ থানা প্রতিষ্ঠা করে। প্রথম ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ফরিদপুরের সন্তান ইন্সপেক্টর মাহাব্বুর রহমান।

জেবি/আরএক্স/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD