ঐতিহ্যের শেষ প্রদীপ দুই বোনের মুখে বেঁচে আছে খাড়িয়া ভাষা

শতবর্ষের ঐতিহ্য বহনকারী একটি প্রাচীন ভাষা এখন বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে। পুরো সম্প্রদায়ে আর কেউ নেই মাত্র দুই বোনের মুখে টিকে আছে ভাষাটির শেষ নিঃশ্বাস। মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার রাজঘাট চা বাগানের বর্মাছড়ায় ৮১ বছর বয়সী খ্রিস্টিনা ও ৭৬ বছরের ভেরোনিকা কেরকেটা এই দুই বোনের মুখেই টিকে আছে খাড়িয়া ভাষা।
বিজ্ঞাপন
পুরো বাগান ঘুরেও তাদের ছাড়া প্রকৃত খাড়িয়া ভাষায় কথা বলতে পারেন এমন কাউকে পাওয়া যায়নি। এ অবস্থায় তাদের মৃত্যু হলে খাড়িয়া নামের ভাষাটিরও মৃত্যু ঘটবে। সেই সঙ্গে বাংলাদেশ থেকে হারিয়ে যাবে একটি ভাষা ও সংস্কৃতি।
জানা যায়, মৌলভীবাজার চা বাগানে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী জাতিসত্তা খাড়িয়াদের বসবাস। তাদের মাতৃভাষার নাম খাড়িয়া। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে এখন ৪১টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা রয়েছে। এগুলোর মধ্যে ১৪টি ভাষাকে বিপন্ন হিসেবে চিহ্নিত করেছেন গবেষকরা। তাদের মধ্যে খাড়িয়া একটি। সরকার চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, গারো ও সাদ্রি ভাষায় প্রাক-প্রাথমিক থেকে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পাঠ্যপুস্তক চালু করলেও খাড়িয়া ভাষা এখনো সেই সুযোগের বাইরে।
বিজ্ঞাপন
২০১৭ সালে ‘বীর তেলেঙ্গা খারঢ়য়া ল্যাঙ্গুয়েজ লার্নিং সেন্টার’ নামে একটি যুব সংগঠনের মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মকে ভাষা শেখানোর একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু চেষ্টায় কোনও সফলতা পাইনি। কারণ, বাংলাদেশে খাড়িয়াদের নিজস্ব বর্ণমালা নেই।’
তাদের বাবা-মা ভারতের রাঁচি থেকে এসে রাজঘাট বাগানে বসতি গড়েন। পরিবারে খাড়িয়া ভাষায় কথা বলার কারণেই দুই বোন ভাষাটি শিখেছেন। তবে নানা ভাষার মিশ্রণ ও প্রজন্ম পরিবর্তনের ফলে তাদের সন্তানসহ সম্প্রদায়ের অন্যরা এখন আর খাড়িয়া ভাষায় কথা বলতে বা বুঝতে পারেন না।
তারা দুই বোন বলেন, মা-বাবা ভারতের রাচি থেকে এখানকার চা বাগানে আসেন। এখানে আমাদের জন্ম হয়। ছোটবেলা থেকেই দেখেছি বাবা-মা খাড়িয়া ভাষা বলত। তাদের কাছ থেকে শেখা। বর্তমানে বাগানে অনেক ভাষার মিশ্রণে আমাদের সন্তানরা মাতৃভাষা বলতেও পারে না, এমনকি বুঝেও না। এই বাগানের মধ্যে আমরা দুই বোন খাড়িয়াতে কথা বলতে পারি। সুখ-দুঃখে আমরা আমাদের দুই বোনের মধ্যেই আমাদের ভাষায় কথা বলি। এতে আমাদের প্রাণ খুলে মনের ভাব প্রকাশ করি। পরিবারের অন্যরাসহ বাগানে কারও সঙ্গে আমরা দুই বোন প্রাণ খুলে মনের মতো করে কথা বলতে পারি না। এটাই আমাদের দুঃখ।
বিজ্ঞাপন
খ্রিস্টিনা কেরকেটা ও ভেরোনিকা কেরকেটা জানান, আমাদের নতুন প্রজন্মের কেউ এই ভাষায় কথা বলতে পারে না। এজন্য তারা বাংলা ভাষায় কথা বলে। যে কারণে আমরা আমাদের মাতৃভাষা এখন বলতে পারি না। আমাদের ছেলেমেয়ে, নাতি-নাতনি এই ভাষায় কথা বললে হাসাহাসি করে, ঠাট্টা করে।
নিজেদের ভাষার চর্চার বিষয়ে ভেরোনিকা কেরকেটা বলেন, এই গ্রামে আমি আর আমার ছোট বোন ছাড়া কেউ এই ভাষায় কথা বলতে পারে না। ছোটবেলায় আমরা সবাই এই ভাষায় কথা বলতাম। এখন কেউ বুঝে না। মাঝে মাঝে মনে হয়, আমরা চলে গেলে ভাষাটাও শেষ হয়ে যাবে।
স্থানীয়বাসিন্দা ও পরিবারের সদস্যরা জানান, সম্পর্কে আপন বোন হোন তারা দুজন আমাদের সাথে খাড়িয়া ভাষা বলেনা । কিন্তু তারা যখন দুইজন এক সাথে থাকেন ঠিকই তারা খাড়িয়া ভাষায় কথা বলেন, কিন্তু আমরা বুঝি না,কারণ ছোট থেকেই আমরা সেটা শিখতে পারিনি। আমাদের হয়তো কোথাও অবহেলা ছিল, কোথাও দুর্বলতা ছিল। এখন যে জেনারেশন আমাদের এই সময়ে এসে বুঝছি পারছি যে ফারসি ভাষার গুরুত্ব আসলে কতটুকু। আগামীতে যে আমাদের মাতৃভাষা দিবস আসছে, এই দিবসে যেন আমরা এ ভাষা নিয়ে একটু চর্চা করতে পারি। খাড়িয়া ভাষা সংরক্ষণে কোনো উদ্যোগ কিংবা বই-পুস্তক নেই। তাই এটি সংরক্ষণে যথাযথ কর্তৃপক্ষের উদ্যোগের দাবি জানান।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন: মৌলভীবাজারে পিকআপ-সিএনজি সংঘর্ষে নিহত ৩
শ্রীমঙ্গল উপজেলা রাজঘাট ইউনিয়ন পরিষদ, ইউপি সদস্য অনিল শাওতাল বলেন জাতীয় ভাষা কমিশন গঠন করে নৃগোষ্ঠীর ভাষা সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। প্রাথমিক শিক্ষায় মাতৃভাষা অন্তর্ভুক্ত ও শিক্ষক প্রশিক্ষণ চালু করতে হবে।
মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ সাবেক পিন্সিপাল ও বাংলা বিভাগ ফজলুল আরী জানান, সম্পর্কে আপন বোন হোন তারা দুজনেই রসি খাড়িয়া ভাষা জানে। কিন্তু তারা যখন দুইজন থাকেন ঠিকই তারা খাড়িয়া ভাষায় কথা বলেন। সময়ের স্রোতে হারিয়ে যেতে বসেছে এক অমূল্য ভাষা। দুই বোনের কণ্ঠে এখনো বেঁচে আছে ইতিহাসের শেষ প্রতিধ্বনি। প্রশ্ন একটাই এই ভাষা কি নতুন প্রজন্মের কাছে ফিরে আসবে, নাকি ইতিহাসের পাতায় নিঃশব্দে বিলীন হয়ে যাবে?
বিজ্ঞাপন








