Logo

ফেসবুকে ফেক আইডি ও ভিত্তিহীন অনলাইন সংবাদের দৌরাত্ম্য

profile picture
জেলা প্রতিনিধি
মৌলভীবাজার
৬ এপ্রিল, ২০২৬, ১৩:৫৩
ফেসবুকে ফেক আইডি ও ভিত্তিহীন অনলাইন সংবাদের দৌরাত্ম্য
ছবি: প্রতিনিধি

মৌলভীবাজার জেলায় ফেসবুকের ফেক আইডি ও বিভিন্ন অনলাইন টিভি পেজে ভিত্তিহীন সংবাদের অপব্যবহার দিন দিন উদ্বেগজনক আকার ধারণ করছে। একটি সংঘবদ্ধ চক্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে সম্মানহানিকর পোস্ট, বিকৃত মন্তব্য ও কৃত্রিম স্ক্রিনশট তৈরি করে সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি দেখাচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

অভিযোগ উঠেছে, কিছু ব্যক্তি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পেজ খুলে নিজেদের মতো করে সংবাদ পরিবেশন করছেন, যার অধিকাংশেরই কোনো নির্ভরযোগ্য ভিত্তি নেই। এসব খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে সমাজে বিভ্রান্তি ও আতঙ্ক সৃষ্টি করছে।

ভুক্তভোগীদের মধ্যে শিক্ষক, ব্যবসায়ী, সাংবাদিক, প্রবাসী ও শিক্ষার্থীরাও রয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে নারীদের ছবি ও নাম ব্যবহার করে কুৎসা রটানো হচ্ছে, যা সামাজিকভাবে মারাত্মক হয়রানির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আইনি জটিলতা ও সামাজিক লজ্জার ভয়ে অনেকেই প্রকাশ্যে অভিযোগ করতে সাহস পাচ্ছেন না।

বিজ্ঞাপন

সচেতন মহলের মতে, একটি টেলিভিশন চ্যানেল পরিচালনায় বিপুল অর্থ বিনিয়োগ প্রয়োজন হয় এবং পত্রিকা পরিচালনাতেও বড় অঙ্কের ব্যয় রয়েছে। তাছাড়া মূলধারার গণমাধ্যমে সংবাদ প্রচারের আগে একাধিক ধাপ পেরোতে হয়। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি স্মার্টফোন ব্যবহার করেই যে কেউ সহজে সংবাদ প্রচার করতে পারছে। ফলে ভিউ বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় অনেকেই দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবে তথ্য ছড়িয়ে দিচ্ছেন।

এছাড়া একজন ব্যক্তি একাধিক সিম ব্যবহার করে বিভিন্ন নামে একাধিক ফেসবুক আইডি খুলে বিভ্রান্তি ছড়ানো ও মানসম্মান ক্ষুণ্ন করার অভিযোগও রয়েছে।

স্থানীয়রা জানান, ভুয়া আইডি থেকে ইনবক্স বা ফোনে যোগাযোগ করে প্রথমে ভয় দেখানো হয়, পরে ‘মামলা থেকে বাঁচাতে’ অর্থ দাবি করা হয়। কেউ টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে অনলাইনে অপপ্রচার আরও বাড়ানো হয়। এতে ভুক্তভোগীরা মানসিক চাপের পাশাপাশি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।

বিজ্ঞাপন

এক ভুক্তভোগী বলেন, “আমার পরিবারকে নিয়ে ফেসবুকে একটি মিথ্যা সংবাদ ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। পরে আমরা সামাজিকভাবে বিব্রত ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হই। এ ধরনের ভিত্তিহীন সংবাদ বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।”

সচেতন নাগরিকদের মতে, যাচাইবিহীন সংবাদ প্রচারকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হলে গুজব ও অপপ্রচার অনেকাংশে কমে আসবে। তারা অনলাইন প্ল্যাটফর্মে সংবাদ প্রচারের জন্য নির্দিষ্ট নীতিমালা ও নিবন্ধন ব্যবস্থা চালুর দাবি জানান।

এছাড়া যে কোনো ঘটনা নিয়ে ফেসবুকে লাইভ সম্প্রচার করে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার কারণে অনেক সময় অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এ ধরনের অনিয়ন্ত্রিত লাইভ সম্প্রচারের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের দাবিও জানান তারা।

বিজ্ঞাপন

প্রবীণ সাংবাদিক ও ছড়াকার আব্দুল হামিদ মাহবুব বলেন, “কোনো সংবাদ প্রকাশের আগেই ফেসবুকে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এমনকি ফেসবুকে টকশো করা হচ্ছে, যা সম্পূর্ণ অনিয়ন্ত্রিত। এ বিষয়ে সরকারের কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।”

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সিনিয়র সাংবাদিক বলেন, “ফেসবুক ও অনলাইন টিভির কারণে আমরা সাংবাদিকরা বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ছি। ফেক আইডির মাধ্যমে মানসম্মান ক্ষুণ্ন করা হচ্ছে। এ ধরনের সাইবার অপরাধ দমনে দ্রুত আইনি পদক্ষেপ, সাইবার পুলিশিং জোরদার এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি জরুরি।”

বিজ্ঞাপন

সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি মো. জাফর ইকবাল বলেন, “ফেক আইডি সমাজে বিভ্রান্তি ছড়ানোর পাশাপাশি ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানছে। কুরুচিপূর্ণ লেখা ও ছবি প্রকাশের কারণে সামাজিক অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে। অনেকেই থানায় অভিযোগ দিলেও যথাযথ প্রতিকার পাচ্ছেন না।”

এ বিষয়ে মৌলভীবাজারের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ বিল্লাল হোসেন বলেন, “ভুয়া ফেসবুক আইডি ব্যবহার করে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। কেউ জিডি করলে আমরা ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করি। তবে অনেক সময় ফেসবুক কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা পাওয়া যায় না, ফলে সব ফেক আইডি শনাক্ত করা সম্ভব হয় না। ভুক্তভোগীরা সাইবার ট্রাইব্যুনালে মামলা করলে প্রতিকার পাওয়া যেতে পারে।”

সচেতন মহল ও সাধারণ মানুষ দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের মতে, ভিত্তিহীন সংবাদ পরিবেশনকারী অনলাইন চ্যানেল ও পেজগুলো বন্ধ করা গেলে সমাজে গুজব ও বিভ্রান্তি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।

জেবি/আরএক্স

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD