পদ্মা ব্যারেজে বদলে যাবে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল, কুষ্টিয়া ও চুয়াডাঙ্গায় নতুন সম্ভাবনা

ফারাক্কা ব্যারেজের প্রভাবে দীর্ঘদিন ধরে পানির সংকটে ভুগছে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল। নদীর নাব্য কমে যাওয়ায় কৃষি, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার হাতে নিয়েছে বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প ‘পদ্মা ব্যারেজ’, যা বৃহত্তর কুষ্টিয়া ও চুয়াডাঙ্গা অঞ্চলের জন্য নতুন আশার আলো হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
রাজবাড়ীর পাংশা পয়েন্টে ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ এ ব্যারেজ নির্মিত হলে কুষ্টিয়ার হিসনা-গড়াই, চুয়াডাঙ্গার মাথাভাঙ্গা, ঝিনাইদহের নবগঙ্গা ও মধুমতীসহ বহু নদীতে আবারও পানিপ্রবাহ ফিরে আসবে। এতে দেশের ২৪টি জেলার মানুষ সরাসরি উপকৃত হবে।
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। শুরুতে এক ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা থাকলেও বিপুল ব্যয়, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও বাস্তবায়ন জটিলতা বিবেচনায় প্রকল্পটি দুই ধাপে বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
প্রকল্পের মোট সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৫০ হাজার ৪৪৩ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। প্রথম ধাপে ব্যয় হবে প্রায় ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। এ ধাপে ব্যারেজের মূল কাঠামো নির্মাণ, হিসনা-মাথাভাঙ্গা ও গড়াই-মধুমতি নদী সিস্টেম পুনঃখননের কাজ করা হবে।
দ্বিতীয় ধাপে চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতি নদী সিস্টেম পুনরুদ্ধার এবং সহায়ক অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে।
বিজ্ঞাপন
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে শুষ্ক মৌসুমে প্রায় ২ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। এর মাধ্যমে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলোতে স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরবে, কমবে লবণাক্ততা এবং উন্নত হবে কৃষি উৎপাদন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ফারাক্কা ব্যারেজ নির্মাণের পর হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতি নদী সিস্টেম প্রায় মৃতপ্রায় হয়ে পড়ে। পদ্মা ব্যারেজ সেই সংকট উত্তরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
মূল ব্যারেজে থাকবে— ৭৮টি স্পিলওয়ে গেট, ১৮টি আন্ডার স্লুইস গেট, ১৪ মিটার প্রশস্ত নেভিগেশন লক, দুটি ২০ মিটার প্রশস্ত ফিশ পাস, ব্যারেজের ওপর রেলসেতু। এ ছাড়া গড়াই, চন্দনা ও হিসনা নদীতে পৃথক অফটেক কাঠামো নির্মাণ করা হবে।
বিজ্ঞাপন
প্রকল্পের আওতায় দুটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা হবে। এর মাধ্যমে বছরে মোট ১১৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে মূল ব্যারেজে ৭৬ দশমিক ৪ মেগাওয়াট এবং গড়াই অফটেকে ৩৬ দশমিক ৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্রায় ২৮ দশমিক ৮০ লাখ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা নিশ্চিত হবে। এতে ধান উৎপাদন ২৩ দশমিক ৯০ লাখ টন এবং মাছ উৎপাদন ২ দশমিক ৩৪ লাখ টন পর্যন্ত বাড়তে পারে।
বিজ্ঞাপন
সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকল্পটি থেকে বছরে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়া সম্ভব।
পদ্মা ব্যারেজের ফলে খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরায় লবণাক্ততা কমবে। সুন্দরবন-এ স্বাদু পানির প্রবাহ বাড়বে, যা জীববৈচিত্র্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে যশোরের ভবদহ অঞ্চলের জলাবদ্ধতা সমস্যাও কমতে পারে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়-এর বন্যা ও পানি ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মাশফিকুস সালেহীন বলেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানি সংকট নিরসনে বড় ভূমিকা রাখবে। তবে নদীর স্বাভাবিক গতিপ্রকৃতি, পলি জমা ও নদীভাঙনের ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে আধুনিক প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা নিশ্চিত করতে হবে।
বিজ্ঞাপন
পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি বলেন, পদ্মা ব্যারেজ সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকারের অংশ। তিনি জানান, দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এলাকা ও প্রায় সাত কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা এ প্রকল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাই দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকার পরিকল্পনা এগিয়ে নিচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, পদ্মা ব্যারেজ শুধু একটি অবকাঠামো নয়; এটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানি, কৃষি, পরিবেশ, নৌচলাচল ও অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা। বিশেষ করে বৃহত্তর কুষ্টিয়া ও চুয়াডাঙ্গার মানুষের জন্য এটি হতে পারে নতুন সম্ভাবনার দ্বার।








