পটুয়াখালীর খামারে কোটি টাকার সাপের বিষ, মিলছে না বাজার

একসময় বিষধর সাপ দেখলেই আতঙ্কে মানুষ সেগুলো মেরে ফেলত। অথচ সেই সাপের বিষই বর্তমানে চিকিৎসাবিজ্ঞানে অত্যন্ত মূল্যবান কাঁচামাল। প্রাণঘাতী সাপের কামড়ের প্রতিষেধক অ্যান্টিভেনম তৈরির অন্যতম প্রধান উপাদান হলো সাপের ভেনম।
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশে এ কাঁচামালের চাহিদা থাকলেও এখনো বিদেশি উৎসের ওপর নির্ভর করতে হয়। এরই মধ্যে পটুয়াখালীতে গড়ে ওঠা একটি নিবন্ধিত সাপের খামারে নিয়মিত ভেনম সংগ্রহ করা হলেও নীতিগত ও বাণিজ্যিক জটিলতার কারণে তা বাজারজাত করা সম্ভব হচ্ছে না।
পটুয়াখালী সদর উপজেলার মাদারবুনিয়া ইউনিয়নের নন্দীপাড়া গ্রামের উদ্যোক্তা আব্দুর রাজ্জাক বিশ্বাস প্রায় আড়াই দশক ধরে বিষধর সাপ সংরক্ষণ, লালন-পালন এবং সাপের বিষ সংগ্রহের কাজ করে আসছেন। তার প্রতিষ্ঠিত ‘বাংলাদেশ স্নেক ভেনম’ খামারটি সম্প্রতি প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের নিবন্ধন পেলেও উৎপাদিত ভেনম এখনো ওষুধ শিল্পে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়নি।
ছোট উদ্যোগ থেকে বড় খামার
বিজ্ঞাপন
সরেজমিনে দেখা যায়, উদ্যোক্তার বাড়ির সামনেই গড়ে উঠেছে ব্যতিক্রমধর্মী এই সাপের খামার। একটি সুরক্ষিত ভবনের ভেতরে ছোট ছোট আলাদা খাঁচায় রাখা হয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির বিষধর সাপ। প্রতিটি খাঁচায় সাপের নাম, পরিচিতি এবং প্রয়োজনীয় তথ্য উল্লেখ রয়েছে। প্রশিক্ষিত কর্মীরা নিয়মিত এসব সাপের পরিচর্যা করছেন।
বর্তমানে খামারটিতে প্রায় আড়াই শতাধিক বিষধর সাপ রয়েছে। এর মধ্যে কিং কোবরা, রাসেলস ভাইপার, সাদা গোখরা, পদ্ম গোখরা, কেউটে, কালকুলিন, পঙ্খীরাজ, গোঁড়া, বিষঝুড়ি, দাঁড়াশ, বাসুয়া ও পাইথনসহ বিভিন্ন প্রজাতির সাপ সংরক্ষণ করা হচ্ছে।
শখ থেকে গবেষণামুখী উদ্যোগ
বিজ্ঞাপন
প্রবাস জীবন শেষে ২০০০ সালে দেশে ফিরে শখের বশে কয়েকটি সাপ লালন-পালন শুরু করেন আব্দুর রাজ্জাক বিশ্বাস। প্রাণীর প্রতি ভালোবাসা থেকেই ধীরে ধীরে বিষধর সাপ সংরক্ষণ, উদ্ধার ও বংশবিস্তার কার্যক্রমে যুক্ত হন তিনি।
গ্রামের বিভিন্ন এলাকায় লোকালয়ে ঢুকে পড়া কিংবা আহত অবস্থায় পাওয়া সাপ উদ্ধার করে নিজের খামারে নিয়ে আসতেন তিনি। পাশাপাশি মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরিতে কাজ শুরু করেন। তার প্রচারণার মূল বার্তা ছিল— ‘সাপ মানুষের শত্রু নয়, পরিবেশের বন্ধু।’
সময়ের সঙ্গে সেই ছোট উদ্যোগই বড় পরিসরের খামারে পরিণত হয়। তবে এ পথ মোটেও সহজ ছিল না। দীর্ঘ বছর ধরে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে অনুমোদনের জন্য আবেদন, চিঠিপত্র ও নানা প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষে সম্প্রতি প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের নিবন্ধন পেয়েছে খামারটি।
বিজ্ঞাপন
নিবন্ধন মিললেও নেই বাণিজ্যিক সুযোগ
সরকারি নিবন্ধনের ফলে এখন বৈধভাবে বিষধর সাপ পালন ও ভেনম সংগ্রহের সুযোগ তৈরি হয়েছে। কিন্তু উদ্যোক্তার অভিযোগ, প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা ও শিল্পখাতের আগ্রহ না থাকায় উৎপাদিত ভেনম কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
আব্দুর রাজ্জাক বিশ্বাস জানান, গত ২৬ বছরে এই খামার গড়ে তুলতে তিনি নিজের প্রবাসজীবনের প্রায় সব সঞ্চয় ব্যয় করেছেন। সাপের খাবার, কর্মীদের বেতন ও খামার পরিচালনার খরচ চালাতে জমি বিক্রি করতে হয়েছে। এমনকি স্ত্রীর গয়নাও বিক্রি করেছেন। সব মিলিয়ে ইতোমধ্যে প্রায় এক কোটি টাকার বেশি ব্যয় হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
বিজ্ঞাপন

তার ভাষ্য, বহু বছরের চেষ্টার পর সরকারি নিবন্ধন মিললেও এখনো কোনো আর্থিক বা কারিগরি সহায়তা পাচ্ছেন না। ফলে মাসিক পরিচালন ব্যয় বহন করাই কঠিন হয়ে পড়েছে।
বেতন পাচ্ছেন না কর্মীরাও
খামারের কর্মী হৃদয় জানান, আর্থিক সংকটের কারণে নিয়মিত বেতন দেওয়া সম্ভব হয় না। সাপ উদ্ধার করতে গিয়ে কোথাও ২০০ থেকে ৫০০ টাকা পারিশ্রমিক পেলে তা দিয়েই কোনোভাবে চলতে হয়।
বিজ্ঞাপন
তার আশা, খামারটি পূর্ণাঙ্গভাবে পরিচালনার সুযোগ তৈরি হলে কর্মসংস্থানও বাড়বে এবং কর্মীদের আর্থিক অবস্থার উন্নতি হবে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা
স্থানীয় বাসিন্দা খলিলুর রহমান বলেন, এই খামার গড়ে তুলতে উদ্যোক্তা রাজ্জাক বিশ্বাস ব্যক্তিগত জীবনে অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন। দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এমন একটি সম্পদ সংরক্ষণে সরকার ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর এগিয়ে আসা প্রয়োজন।
বিজ্ঞাপন
প্রতি মাসে কোটি টাকার ভেনম সংগ্রহের সক্ষমতা
আব্দুর রাজ্জাক বিশ্বাসের দাবি, তার খামার থেকে প্রতি মাসে প্রায় এক পাউন্ড সাপের ভেনম সংগ্রহ করা সম্ভব। আন্তর্জাতিক বাজারে এর মূল্য প্রায় আট কোটি টাকার সমপরিমাণ হতে পারে।
তবে তিনি জানান, কাঁচা ভেনম সরাসরি বিক্রি করা যায় না। নির্ধারিত বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় পরিশোধন ও প্রক্রিয়াজাত করার পরই তা ওষুধ শিল্পে ব্যবহারযোগ্য হয়। নিবন্ধন পাওয়ার তিন মাস পার হলেও দেশের কোনো ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান এখনো এ বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি।
বিজ্ঞাপন
তিনি বলেন, দেশীয় ভেনম ব্যবহার করে অ্যান্টিভেনম উৎপাদন শুরু হলে বিদেশ থেকে কাঁচামাল আমদানির প্রয়োজন অনেকাংশে কমে যাবে। এতে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের পাশাপাশি নতুন শিল্প ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
যা বলছে বিশেষজ্ঞরা
পটুয়াখালীর সিভিল সার্জন ডা. মো. খালেদুর রহমান মিয়া বলেন, সাপের বিষ সংগ্রহ করা সম্ভব হলেও তা দিয়ে অ্যান্টিভেনম উৎপাদনের জন্য উন্নত গবেষণাগার, আধুনিক প্রযুক্তি এবং বিশেষায়িত অবকাঠামো প্রয়োজন। এজন্য দেশের বড় ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে।
বিজ্ঞাপন
তিনি আরও বলেন, খামার কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করলে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করা হবে।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. হাবিবুর রহমান জানান, খামারটিকে ভেনম সংগ্রহের নিবন্ধন দেওয়া হয়েছে। তবে সংগৃহীত ভেনম সরাসরি বাজারজাত করা যাবে না। নির্ধারিত মান বজায় রেখে অনুমোদিত প্রক্রিয়ায় প্রক্রিয়াজাত করার পরই তা ওষুধ শিল্পে ব্যবহার করা সম্ভব।
অন্যদিকে, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং কীটতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. এস. এম. হেমায়েত জাহান বলেন, দেশীয় ভেনম থেকে অ্যান্টিভেনম উৎপাদন সম্ভব হলে বিদেশের ওপর নির্ভরতা কমবে, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে এবং সাপে কাটা রোগীদের দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা সহজ হবে।
বিজ্ঞাপন
তিনি মনে করেন, সরকার, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় এবং ওষুধ শিল্পের সমন্বিত উদ্যোগে এই খাতকে এগিয়ে নেওয়া গেলে বাংলাদেশে অ্যান্টিভেনম গবেষণা ও উৎপাদনের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। একই সঙ্গে জৈব নিরাপত্তা, প্রাণিকল্যাণ নীতি, প্রশিক্ষিত জনবল এবং কার্যকর সরকারি তদারকি নিশ্চিত করাও অত্যন্ত জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যথাযথ নীতিগত সহায়তা, গবেষণা এবং শিল্পখাতের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে পটুয়াখালীর এই খামার শুধু একটি ব্যক্তিগত উদ্যোগ হিসেবেই নয়, বরং দেশের স্বাস্থ্যসেবা, ওষুধ শিল্প এবং অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ সম্পদে পরিণত হতে পারে।








