Logo

অবমুক্তির এক মাস পার হলেও ৪০টি ক্যামেরায় ধরা পড়েনি বাঘিনী

profile picture
জেলা প্রতিনিধি
বাগেরহাট
১৮ আগস্ট, ২০২৬, ১৯:৫৭
অবমুক্তির এক মাস পার হলেও ৪০টি ক্যামেরায় ধরা পড়েনি বাঘিনী
ছবি: সংগৃহীত

সুন্দরবনে চিকিৎসা ও পুনর্বাসন শেষে অবমুক্ত করার এক মাস পেরিয়ে গেলেও সন্ধান মেলেনি সেই বাঘিনীর। তার গতিবিধি পর্যবেক্ষণে ৪০টি স্বয়ংক্রিয় ট্র্যাপ ক্যামেরা বসানো হলেও এখন পর্যন্ত কোনো ক্যামেরায় বাঘিনীটির ছবি ধরা পড়েনি। বরং এসব ক্যামেরায় সুন্দরবনের অন্য তিনটি বাঘের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

ক্যামেরায় ধরা পড়া বাঘগুলোর ছবি বিশ্লেষণ করেও অবমুক্ত করা বাঘিনীর সঙ্গে কোনো মিল পাওয়া যায়নি। ফলে বাঘিনীটি বর্তমানে কোথায় রয়েছে, বনের পরিবেশে স্বাভাবিকভাবে টিকে থাকতে পারছে কি না এবং তার শারীরিক সক্ষমতা কেমন—এসব নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশসচেতন মহলের কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন, দীর্ঘ চিকিৎসার পর বনে ফিরে বাঘিনীটি স্বাভাবিকভাবে শিকার করতে পারছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। আবার খাদ্যসংকট কিংবা শিকারিদের পাতা ফাঁদে ফের আটকা পড়ার সম্ভাবনাও পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

শিকারিদের ফাঁদে গুরুতর আহত হয়েছিল বাঘিনী

বিজ্ঞাপন

বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের বৈদ্যমারী টহল ফাঁড়ির আওতাধীন শরকির খালসংলগ্ন এলাকায় হরিণ শিকারিদের পাতা ছিটকা ফাঁদে আটকা পড়ে বাঘিনীটি।

দীর্ঘ সময় ফাঁদে আটকে থাকার কারণে তার সামনের বাঁ পায়ে গুরুতর ক্ষত সৃষ্টি হয়। পরে ক্ষতস্থানে পচন ধরায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়ে।

বন বিভাগের সদস্যরা খবর পেয়ে বাঘিনীটিকে ফাঁদ থেকে উদ্ধার করেন। এরপর তাকে খুলনার বয়রায় বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের পুনর্বাসন কেন্দ্রে নেওয়া হয়।

বিজ্ঞাপন

সেখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দলের তত্ত্বাবধানে প্রায় ছয় মাস ধরে চিকিৎসা ও নিবিড় পরিচর্যা চলে। ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠে বাঘিনীটি। চিকিৎসার পাশাপাশি বনে ফিরে স্বাভাবিকভাবে টিকে থাকার মতো শারীরিক সক্ষমতা রয়েছে কি না, সেটিও পর্যবেক্ষণ করা হয়।

জুলাইয়ে সুন্দরবনে অবমুক্ত

চিকিৎসা ও পুনর্বাসন শেষে গত ১২ জুলাই বাঘিনীটিকে সুন্দরবনে অবমুক্ত করা হয়। উদ্ধারস্থল থেকে প্রায় ২০ থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে পূর্ব সুন্দরবনের আন্ধারমানিক ইকোট্যুরিজম কেন্দ্রসংলগ্ন বনাঞ্চলকে অবমুক্তির জন্য বেছে নেওয়া হয়।

বিজ্ঞাপন

অবমুক্ত করার পর বন বিভাগের তাৎক্ষণিক পর্যবেক্ষণে প্রায় ১৫০ মিটার এলাকায় বাঘিনীটির পায়ের ছাপ পাওয়া যায়। এতে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়েছিল, বাঘিনীটি বনে প্রবেশের পর স্বাভাবিকভাবেই চলাচল করছে।

তবে অবমুক্তির সময় ধারণ করা একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তার চলাফেরা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। ভিডিওতে দেখা যায়, খাঁচা থেকে বের হয়ে বনে প্রবেশের সময় বাঘিনীটি কিছুটা অস্বাভাবিকভাবে হাঁটছিল। তার শরীর ডানে-বাঁয়ে হেলে পড়ছিল এবং শক্তভাবে দাঁড়াতেও কিছুটা অসুবিধা হচ্ছিল বলে ভিডিওতে প্রতীয়মান হয়। কয়েকবার তাকে পেছনের দিকে ফিরে তাকাতেও দেখা যায়।

৪০ ক্যামেরায়ও নেই বাঘিনীর ছবি

বিজ্ঞাপন

বাঘিনীটির গতিবিধি পর্যবেক্ষণের জন্য অবমুক্তির আগেই আন্ধারমানিক এলাকায় প্রায় আট কিলোমিটারজুড়ে ২০টি স্বয়ংক্রিয় ট্র্যাপ ক্যামেরা স্থাপন করে বন বিভাগ। পরে শ্যালনদীর পূর্বপাড় ও জয়মনি এলাকায় আরও ২০টি ক্যামেরা বসানো হয়।

সব মিলিয়ে ৪০টি ক্যামেরার মাধ্যমে নিয়মিত নজরদারি চালানো হচ্ছে। কিন্তু এক মাস ধরে পর্যবেক্ষণের পরও এসব ক্যামেরায় অবমুক্ত করা বাঘিনীর কোনো ছবি পাওয়া যায়নি।

এদিকে ক্যামেরাগুলোতে তিনটি ভিন্ন বাঘের ছবি ধরা পড়েছে। এসব ছবি বিশ্লেষণ করে বন বিভাগের কর্মকর্তারা নিশ্চিত হয়েছেন, ক্যামেরায় ধরা পড়া বাঘগুলোর কোনোটি অবমুক্ত করা বাঘিনী নয়।

বিজ্ঞাপন

ক্যামেরায় না ধরা পড়াই মৃত্যুর প্রমাণ নয়

সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, বাঘিনীটিকে অবমুক্ত করার পর তাৎক্ষণিক পর্যবেক্ষণে প্রায় দেড়শ মিটার এলাকায় তার পায়ের ছাপ পাওয়া গিয়েছিল। শুরুতে তাকে কিছুটা দুর্বল ও অস্বাভাবিক মনে হলেও পরে পাওয়া স্পষ্ট পায়ের ছাপ দেখে স্বাভাবিক বলেই মনে হয়েছিল।

তিনি বলেন, ৪০টি ট্র্যাপ ক্যামেরায় বাঘিনীটির ছবি না পাওয়া গেলেও এটিকে তার মৃত্যুর প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। একটি বাঘ সাধারণত ৩০ থেকে ৪০ কিলোমিটার পর্যন্ত এলাকায় বিচরণ করতে পারে। তাই বাঘিনীটি নিজের বিচরণ এলাকা পরিবর্তন করে অন্যদিকে চলে গিয়ে থাকতে পারে।

বিজ্ঞাপন

ফলে নির্দিষ্ট এলাকায় স্থাপন করা ক্যামেরার আওতায় না আসাও সম্ভব বলে মনে করেন বন বিভাগের এই কর্মকর্তা। তবে দীর্ঘ সময় ধরে নজরদারি চালিয়েও তার কোনো ছবি না পাওয়ায় বিষয়টি নিয়ে পর্যবেক্ষণ অব্যাহত রাখা হয়েছে।

শারীরিক সক্ষমতা যাচাই করেই অবমুক্ত করা হয়েছিল

বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. এম এ আজিজ বাঘিনীটিকে অবমুক্ত করার আগে জানিয়েছিলেন, বনে ফেরানোর আগে তার শারীরিক সক্ষমতা এবং স্বাভাবিক শিকার ধরার প্রবৃত্তি বিভিন্ন ধাপে পরীক্ষা করা হয়েছিল।

বিজ্ঞাপন

পুনর্বাসন কেন্দ্রে ছয় মাস সাত দিন চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণের পর তার শারীরিক সক্ষমতা বিবেচনা করেই বনে অবমুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে তিনি জানিয়েছিলেন।

তবে বর্তমানে ৪০টি ক্যামেরায় দীর্ঘ সময়েও তার উপস্থিতি ধরা না পড়ায় বাঘিনীটি বাস্তবে কতটা স্বাভাবিকভাবে বনে বিচরণ করছে, সে প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি।

বন বিভাগ অবশ্য নজরদারি চালিয়ে যাচ্ছে। বাঘিনীটি নিরাপদে সুন্দরবনের কোনো অংশে বিচরণ করছে কি না, নাকি কোনো প্রতিকূলতার মুখে পড়েছে—তা নিশ্চিত হতে আরও পর্যবেক্ষণ ও তথ্য সংগ্রহের প্রয়োজন রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

চিকিৎসা শেষে বনে ফিরে যাওয়া এই বাঘিনীর বর্তমান অবস্থান এখনো অজানা। ফলে বন বিভাগ, বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ ও প্রকৃতিপ্রেমীদের অপেক্ষা—কবে ট্র্যাপ ক্যামেরায় আবার ধরা পড়বে তার ছবি এবং নিশ্চিত হবে সুন্দরবনের গভীরে সে নিরাপদেই টিকে আছে।

জেবি/এএস/জেএইচআর

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD