তিনশ বছরের ঐতিহ্য, মৌলভীবাজারে লাল দুর্গা দেখতে ভক্তদের ঢল

মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার পাঁচগাঁও গ্রামে শুরু হয়েছে প্রায় তিনশ বছরের ঐতিহ্যবাহী লাল বর্ণের দুর্গাপূজা। উপমহাদেশের একমাত্র লাল দুর্গা প্রতিমার পূজা হিসেবে পরিচিত এই আয়োজন ঘিরে প্রতিবছর দেশ-বিদেশের অসংখ্য ভক্ত ও দর্শনার্থীর সমাগম ঘটে। শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) মহাষষ্ঠীর পূজার মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে পাঁচ দিনব্যাপী শারদীয় দুর্গোৎসব।
বিজ্ঞাপন
দুর্গাপূজা উপলক্ষে মণ্ডপে মণ্ডপে চলছে প্রতিমা ও প্যান্ডেল সাজানোর শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান এই ধর্মীয় উৎসবকে কেন্দ্র করে পুরো মৌলভীবাজার জেলায় বিরাজ করছে আনন্দঘন পরিবেশ। মহাষষ্ঠী থেকে শুরু হওয়া উৎসব আগামী ২১ অক্টোবর বুধবার বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পাঁচগাঁওয়ের এই ব্যতিক্রমী দুর্গাপূজার ইতিহাস প্রায় তিনশ বছরের পুরোনো। ১৪১৫ বঙ্গাব্দে নতুন স্থানে মন্দির প্রতিষ্ঠা করা হয়। দেশের অন্য কোথাও এভাবে লাল বর্ণের দুর্গা প্রতিমার পূজা হয় না বলে স্থানীয়দের দাবি। ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত পাঁচ দিনে এখানে লক্ষাধিক ভক্তের সমাগম ঘটে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের পদচারণায় সাধারণত শান্ত থাকা গ্রামটি পরিণত হয় উৎসবমুখর জনপদে।
মৃৎশিল্পীরা আপন দক্ষতা ও যত্নে লাল বর্ণের দেবী প্রতিমা তৈরি করেন। প্রতিমার ব্যতিক্রমী রং ও সাজসজ্জা এই পূজাকে অন্য আয়োজন থেকে স্বতন্ত্র পরিচিতি দিয়েছে।
বিজ্ঞাপন
লাল দুর্গার আবির্ভাব নিয়ে প্রচলিত কাহিনি
পাঁচগাঁওয়ের লাল দুর্গাপূজার পেছনে রয়েছে একটি প্রচলিত কাহিনি। কথিত আছে, স্বর্গীয় সর্বানন্দ দাস আসামের শিবসাগরে মুন্সি পদে চাকরি করতেন। তিনি ছিলেন একজন সাধক। একবার আসামের কামরূপ-কামাখ্যায় গিয়ে পূজার জন্য পাঁচ বছরের একটি কন্যাশিশু চাইলে স্থানীয় লোকজন তাঁকে একটি শিশুকন্যা দেন।
সাধক ওই কন্যাশিশুর পূজা করার একপর্যায়ে দেখতে পান, ধীরে ধীরে তার গায়ের রং লাল হয়ে যাচ্ছে। এ ঘটনায় বিস্মিত হয়ে তিনি উপলব্ধি করেন, কন্যাশিশুটির মধ্যে স্বয়ং দেবীর আবির্ভাব ঘটেছে।
বিজ্ঞাপন
প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, তখন দেবী সাধককে বর চাইতে বলেন। সর্বানন্দ দাস তাঁর কাছে বর প্রার্থনা করলে দেবী নির্দেশ দেন, পাঁচগাঁওয়ের দুর্গা প্রতিমার রং হবে লাল। একই সঙ্গে সাধক দেবীকে রাজনগরের পাঁচগাঁওয়ে আবির্ভূত হওয়ার আকুতি জানান। সেই বিশ্বাস ও ঐতিহ্যকে ধারণ করেই সেখানে প্রতিবছর লাল বর্ণের দুর্গা প্রতিমার পূজা হয়ে আসছে।
আরও পড়ুন
•
বিজ্ঞাপন
•
•
জেলায় ১ হাজার ২২টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা
বিজ্ঞাপন
জেলা পূজা উদযাপন কমিটির সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর মৌলভীবাজার জেলায় সর্বজনীন ৮৯৮টি এবং ব্যক্তিগত ১২৪টিসহ মোট ১ হাজার ২২টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
অন্যদিকে, শারদীয় দুর্গোৎসব ঘিরে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। জেলার শ্রীমঙ্গল ৪৬ বিজিবি ব্যাটালিয়নের দায়িত্বাধীন সীমান্তসংলগ্ন ১০৯টি পূজামণ্ডপের নিরাপত্তা জোরদারে ১২ প্লাটুন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মোতায়েন করা হয়েছে।
দর্শনার্থীরা জানান, দেশের অন্যান্য দুর্গা প্রতিমার তুলনায় পাঁচগাঁওয়ের লাল দুর্গা একেবারেই আলাদা। তাঁদের দাবি, বাংলাদেশে এ ধরনের লাল বর্ণের দুর্গা প্রতিমা আর কোথাও দেখা যায় না। ভারতেও আসাম ও কামাখ্যা অঞ্চলে লাল বর্ণের প্রতিমা রয়েছে বলে তাঁরা উল্লেখ করেন। ব্যতিক্রমী এই প্রতিমা দেখতে প্রতিবছর দেশ-বিদেশ থেকে বিপুলসংখ্যক ভক্ত আসেন।
বিজ্ঞাপন
প্রতিমা তৈরির কারিগর অশোক আচার্য জানান, তাঁর দাদা ও বাবা দীর্ঘদিন ধরে এই পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁদের ধারাবাহিকতায় তিনিও লাল দুর্গা প্রতিমা তৈরির কাজ করে যাচ্ছেন। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই শিল্পকর্মের মাধ্যমে ঐতিহ্যটি টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন তাঁরা।
বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের মৌলভীবাজার জেলা শাখার সহসম্পাদক সুমন কল্যাণ ভট্টাচার্য বলেন, বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে নানা রূপ ও রঙের দুর্গা প্রতিমা এবং দুর্গোৎসব দেখা গেলেও লাল বর্ণের দুর্গা মায়ের বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সারা দেশের মধ্যে পাঁচগাঁওয়ের লাল দুর্গা মায়ের মন্দির অন্যতম জাগ্রত স্থান হিসেবে পরিচিত। প্রতিবছর এখানে বিপুলসংখ্যক ভক্ত সমবেত হন।
পূজা পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন সাধক সর্বানন্দ দাসের ষষ্ঠ বংশধর সঞ্জয় দাস। তিনি জানান, এটি তাঁদের পারিবারিক পূজা। পূর্বপুরুষ সর্বানন্দ দাস ধ্যানে বসে কুমারী পূজার মাধ্যমে লাল দুর্গার দর্শন পাওয়ার পর থেকে প্রতিবছর এখানে এই পূজা হয়ে আসছে। শুধু ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রতিমা নির্মাণ করে পূজার আয়োজন করা সম্ভব হয়নি। সে বছর ঘট পূজার মাধ্যমে ধর্মীয় আচার পালন করা হয়েছিল।
বিজ্ঞাপন
মৌলভীবাজারের পুলিশ সুপার মো. মনিরুল ইসলাম জানান, দুর্গাপূজায় সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সড়কে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে জেলা পুলিশ সর্বোচ্চ সতর্কতা ও পেশাদারত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছে।
প্রায় তিনশ বছরের ঐতিহ্য, ব্যতিক্রমী প্রতিমা এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসা বিশ্বাসের কারণে পাঁচগাঁওয়ের লাল দুর্গাপূজা মৌলভীবাজারের অন্যতম আকর্ষণীয় ধর্মীয় আয়োজন হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। ষষ্ঠী থেকে বিসর্জন পর্যন্ত ভক্তদের উপস্থিতিতে এই ছোট্ট গ্রাম পরিণত হয় উৎসব, সম্প্রীতি ও ঐতিহ্যের মিলনমেলায়।








