মাদ্রাসা শিক্ষককে চড় মারা সেই ব্যক্তিকে গ্রেফতার করতে চায় পুলিশ

গাজীপুরের টঙ্গীতে একটি মাদ্রাসায় প্রথম শ্রেণির এক ছাত্রীকে চুমু দেওয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে শিক্ষককে চড় মারার ঘটনায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে। এ ঘটনায় শিশুটির বাবার দায়ের করা মামলায় অভিযুক্ত শিক্ষককে গ্রেফতারের পর কারাগারে পাঠানো হয়েছে। অন্যদিকে, মাদ্রাসার অধ্যক্ষের করা পাল্টা মামলায় শিশুটির বাবাকে গ্রেফতারের চেষ্টা করছে পুলিশ।
বিজ্ঞাপন
শিশুটির বাবার অভিযোগ, মাদ্রাসার ওই শিক্ষক তার মেয়েকে যৌন হয়রানি করেছেন। এ বিষয়ে বাবা-মাকে জানালে শিশুটিকে হত্যার হুমকিও দেওয়া হয় বলে দাবি তার। তবে মাদ্রাসার অধ্যক্ষের দাবি, শিক্ষকের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং ঘটনাটি প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অংশ।
শিক্ষককে চড় মারার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। ফেসবুকে অনেকে শিশুটির বাবার প্রতি সমর্থন জানিয়ে অভিযুক্ত শিক্ষকের বিচার দাবি করছেন। বিভিন্ন মাদ্রাসায় শিশুদের যৌন হয়রানির অভিযোগের প্রসঙ্গ তুলে অনেকে সমালোচনা করছেন এবং এ বিষয়ে আলেমদের সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন।
অন্যদিকে, মাদ্রাসাশিক্ষকদের একাংশসহ বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা শিক্ষককে মারধরের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাদের অনেকে অভিযোগের সত্যতা যাচাই ও আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন।
বিজ্ঞাপন
টঙ্গী পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আরিফুর রহমান বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘উভয় পক্ষে দুটি মামলা হয়েছে। মাদ্রাসা শিক্ষককে আমরা আগেই আটক করেছি। পরে মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল আরেকটি মামলা করেছেন। সেই মামলায় এজাহার নামীয় আসামিকে গ্রেফতারের জন্য কাজ করছি।’
এজাহারভুক্ত আসামি শিশুটির বাবা কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ।’
পুলিশ জানিয়েছে, মাদ্রাসার অধ্যক্ষের করা মামলায় প্রতিষ্ঠানটিতে ভাঙচুর ও শিক্ষকদের মারধরের অভিযোগ আনা হয়েছে। শিশুটির বাবার বিরুদ্ধে ১৭ লাখ টাকা লুটের অভিযোগও করা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
এদিকে, শিশুটির বাবা শুক্রবার রাতে সংবাদ সম্মেলন করে নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা চেয়েছেন। একই সঙ্গে মেয়ের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার বিচার এবং নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
ভিডিওতে যা দেখা গেছে
টঙ্গীর ওই মাদ্রাসার শিক্ষককে সজোরে চড় মারার ভিডিওটি বৃহস্পতিবার থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে দেখা যায়, এক ব্যক্তি ‘কিসের চুমুরে’ বলে আরেক ব্যক্তিকে থাপ্পড় মারছেন। এরপর আরও কয়েকজন ওই ব্যক্তিকে মারধর করেন। পরে স্থানীয় লোকজন জড়ো হলে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে শিক্ষককে উদ্ধার করে নিজেদের হেফাজতে নেয়।
বিজ্ঞাপন
পরে জানা যায়, চড় মারা ব্যক্তি ওই মাদ্রাসার প্রথম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর বাবা। আর যাকে চড় মারা হয়েছে, তিনি মাদ্রাসাটির শিক্ষক ও উপাধ্যক্ষ।
ভিডিওতে চড় মারার আগে ওই শিক্ষককে বলতে শোনা যায়, ‘স্টুডেন্টদের সাথে অন্য রকম সম্পর্ক। সবার সাথে, বিশেষ করে ক্লাস ওয়ানের। তার এক পর্যায়ে আমি বললাম, চুমু।’
এ সময় সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তি ‘কীসের চুমুরে’ বলে তাকে থাপ্পড় মেরে ফেলে দেন।
বিজ্ঞাপন
শিশুটির বাবার বক্তব্য
ঘটনাটি নিয়ে আলোচনা শুরু হওয়ার পর শুক্রবার রাতে সংবাদ সম্মেলনে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন শিশুটির বাবা। তিনি নিজের যাচাইকৃত ফেসবুক অ্যাকাউন্টেও সংবাদ সম্মেলনের ভিডিও প্রকাশ করেন।
তার দাবি, কী ঘটেছিল তা জানতে তিনি ওই শিক্ষকের কাছে গিয়েছিলেন। শিক্ষক সবার সামনে শিশুটির সঙ্গে জোরাজুরি ও চুমু দেওয়ার কথা বলার পর তিনি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি বলে জানান।
বিজ্ঞাপন
তিনি বলেন, ‘সবার সামনে সে বলতেসে আমি তার সাথে (শিশুটির সঙ্গে) জোরাজোরি করেছি, চুমু দিয়েছি। “জোরাজুরি” পর্যন্ত শোনার পর আমি কিন্তু কিছু করিনি। কিন্তু “চুমু” এটা শোনার পর ওই মোমেন্টে অ্যাজ অ্যা গার্ডিয়ান আমি নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারিনি। এরপর যা ঘটেছে আপনারা দেখেছেন।’
সংবাদ সম্মেলনে তিনি দাবি করেন, কাউকে নিয়ে দলবদ্ধ হামলা চালানো নয়, বরং মেয়ের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার বিচার চাইতেই তিনি মাদ্রাসায় গিয়েছিলেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া আরেকটি ভিডিওতে তাকে বলতে দেখা যায়, চুমুর ঘটনা বাবা-মাকে জানালে শিশুটিকে মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছিলেন ওই শিক্ষক।
বিজ্ঞাপন
মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের করা লুটপাটের অভিযোগও প্রত্যাখ্যান করেছেন শিশুটির বাবা। সেখানে যাওয়ার ভিডিও ফুটেজ রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। পাশাপাশি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওবার্তায় তিনি বলেন, ‘থাপ্পড় দিয়ে আমি কোনো আলেম বা শিক্ষককে অপমান করিনি। আমি একজন দুশ্চরিত্র লম্পটকে আমি থাপ্পড় দিয়েছি।’
অধ্যক্ষের দাবি, অভিযোগ মিথ্যা
মাদ্রাসাটির অধ্যক্ষ বিবিসি বাংলাকে বলেন, ঘটনার সময় ওই শিক্ষক শিক্ষার্থীদের বলছিলেন, ফলাফল ভালো করলে তিনি তাদের ‘পাপ্পি’ দেবেন। তবে কাউকে চুমু দিয়েছেন—এমন কথা তিনি বলেননি বলে দাবি অধ্যক্ষের।
বিজ্ঞাপন
তার ভাষ্য, শিশুটির মা মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছিলেন, মেয়ে বাড়িতে গিয়ে বলেছে যে ফলাফল ভালো হলে শিক্ষক তাকে চুমু দেওয়ার কথা বলেছেন। এরপর ওই শিক্ষকের কাছে বিষয়টি জানতে চাওয়া হয়।
অধ্যক্ষের দাবি, শিক্ষক তখন জানান, তিনি সবার উদ্দেশে কথাটি বলেছেন, নির্দিষ্ট কোনো শিক্ষার্থীকে উদ্দেশ্য করে নয়। এ ধরনের কোনো ঘটনাও ঘটেনি বলে তিনি দাবি করেন।
অধ্যক্ষ আরও বলেন, অভিযোগ সত্য হলে অভিভাবকেরা শিশুটিকে আবার ওই শিক্ষকের ক্লাসে পাঠাতেন না। অভিযুক্ত শিক্ষক মাদ্রাসাটিতে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে পড়াতেন বলেও জানান তিনি।
বিজ্ঞাপন
অন্যদিকে, শিশুটির বাবার করা মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, মাদ্রাসার নিচতলার সিঁড়িতে শিশুটিকে যৌন নিপীড়ন করা হয়েছে। এর আগে বুধবার শিশুটির পরিবারের দুই সদস্য মাদ্রাসায় গিয়ে শিক্ষকের কাছে ঘটনা সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলেন। শিশুটির বাবা সাংবাদিকদের বলেন, অভিযুক্ত শিক্ষক তার মেয়ের সঙ্গে অশালীন আচরণ করেছেন। এ কারণেই তিনি মামলা করেছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পক্ষে-বিপক্ষে প্রতিক্রিয়া
ঘটনাটি ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন মাদ্রাসায় শিশু নির্যাতনের অভিযোগের প্রসঙ্গ তুলে অনেকে শিশুটির বাবার প্রতি সমর্থন জানাচ্ছেন। ফেসবুকে চড় মারার ঘটনা নিয়ে নানা ধরনের ব্যঙ্গচিত্র ছড়িয়ে পড়েছে। কেউ কেউ এ ঘটনাকে সমর্থন করেন কি না, তা জানতে জরিপও প্রকাশ করছেন।
একজন লিখেছেন, ‘সন্তানের জন্য প্রতি বাবাকে এভাবেই দাঁড়াতে হবে।’
আরেকজন লিখেছেন, ‘উনি সকল বাবাদের শিখিয়ে দিলেন কীভাবে প্রতিবাদ করতে হয়, উনি যদি হেরে যায় হেরে যাবে বাংলাদেশ।’
অন্যদিকে, মাদ্রাসাশিক্ষক ও ধর্মভিত্তিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের অনেকে শিক্ষককে মারধরের সমালোচনা করছেন। মাওলানা দিদার আহমেদ ফেসবুকে লিখেছেন, অভিযোগ সত্য হলেও আইন ও মাদ্রাসা কমিটির মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত ছিল এবং প্রমাণ ছাড়া কাউকে এভাবে মারধর করা ঠিক নয়—এমন বক্তব্য তুলে ধরেছেন তিনি।
মো. মাহাদী হাসান নামে আরেকজন লিখেছেন, ‘মাদ্রাসার ভেতরে ঢুকে হামলা, ভাঙচুর ও শিক্ষকদের গায়ে হাত তোলা—এ কেমন বিচার?’
শিশুদের সুরক্ষা নিয়ে মাদ্রাসাগুলোর বার্তা
এ ঘটনা নিয়ে আলোচনার মধ্যে কিছু মাদ্রাসা থেকে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শিক্ষকদের আচরণ নিয়ে ভিডিওবার্তাও প্রকাশ করা হয়েছে।
মাদরাসাতুত তাকী আল ইসলামিয়াহ তাদের ফেসবুক পাতায় প্রকাশিত ভিডিওবার্তায় জানিয়েছে, কোনো শিশুকে এমন কিছু করা যাবে না, যাতে সে অস্বস্তি বোধ করে। কোনো শিক্ষক শিক্ষার্থীর সঙ্গে অনৈতিক আচরণের কথা চিন্তা করলেও তার প্রতিষ্ঠান ছেড়ে যাওয়া উচিত বলে বার্তায় উল্লেখ করা হয়।
মাদরাসাতুজ জয়তুনা তাদের যাচাইকৃত ফেসবুক পাতায় প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান মোখতার আহমদের বক্তব্য তুলে ধরে জানিয়েছে, কোনো শিক্ষকেরই শিক্ষার্থীকে চুমু দেওয়া বা অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে স্পর্শ করার বৈধতা নেই। এ ধরনের অপরাধের কঠোর শাস্তির দাবিও জানানো হয়েছে।
ইসলামবিষয়ক লেখক মাওলানা শরীফ মুহাম্মদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন মাদ্রাসায় শিশুদের ঘিরে নেতিবাচক খবর প্রকাশিত হওয়ায় মানুষের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। টঙ্গীর ঘটনাটিও সেই পরিস্থিতির মধ্যে ঘটেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তার মতে, মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষকে শিশুদের শতভাগ সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে এবং আধুনিক শিশু ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। একই সঙ্গে অভিভাবকদেরও সন্তানকে যে প্রতিষ্ঠানে পাঠাচ্ছেন, সেটির পরিবেশ ও নিরাপত্তার বিষয়ে সচেতন থাকা প্রয়োজন।
মাদ্রাসায় শারীরিক শাস্তি নিষিদ্ধের নির্দেশনা
বাংলাদেশের বিভিন্ন মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীদের নির্যাতনের অভিযোগ প্রায়ই আলোচনায় আসে। শারীরিক শাস্তির পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে শিশুদের যৌন নিপীড়নের অভিযোগও সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে। এ ধরনের ঘটনা দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কমবেশি ঘটে আসছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সম্প্রতি দেশের ছয়টি মাদ্রাসা বোর্ডের নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামি'আতিল কওমিয়া বাংলাদেশ শিক্ষার্থীদের মারধর করে শাস্তি দেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে একটি নির্দেশনা জারি করেছে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যথাযথ আচরণ নিশ্চিত করতে প্রতিটি মাদ্রাসায় সুরক্ষা কমিটি গঠন বা পুনর্গঠন করে সক্রিয় রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
গত ১২ সেপ্টেম্বর আল-হাইআতুল উলয়ার স্থায়ী কমিটির সভায় নির্দেশনাটি চূড়ান্ত হয়।
নির্দেশনায় শাসনের শরয়ি সীমা নির্ধারণের অংশে বলা হয়েছে, ‘লাঠি, বেত বা কোনো যন্ত্র দিয়ে আঘাত করা, মুখমণ্ডল-মাথা বা স্পর্শকাতর অঙ্গে আঘাত করা এবং হাড় ভাঙা, রক্তপাত বা দাগ সৃষ্টিকারী যেকোনো শাস্তি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। প্রকাশ্যে অপমান, গালমন্দ, তিরস্কার, কটু ভাষা বা ঘৃণাসূচক সম্বোধন এবং অন্য যেকোনো মানসিক নির্যাতনমূলক আচরণও পরিহারযোগ্য।’
নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, এসব সীমা লঙ্ঘনকারী শিক্ষক বা শিক্ষিকাকে শরিয়ত ও বিধি—উভয় দৃষ্টিতেই জবাবদিহির আওতায় থাকতে হবে।
সূত্র: বিবিসি বাংলা








