স্বাধীনতার বীর সন্তান মতিউর রহমানের জন্মবার্ষিকী আজ

স্বাধীনতার জন্য পাকিস্তান থেকে একটি প্রশিক্ষণ বিমান নিয়ে ভারতের উদ্দেশে যাত্রা করেছিলেন ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই থেমে যায় তাঁর যাত্রা। ১৯৭১ সালের ২০ আগস্ট বিমানটি বিধ্বস্ত হলে প্রাণ হারান এই বাঙালি বৈমানিক। স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য তাঁর সেই আত্মত্যাগ স্থান করে নেয় দেশের সর্বোচ্চ বীরত্বের ইতিহাসে। মরণোত্তর বীরশ্রেষ্ঠ খেতাবে ভূষিত হন তিনি।
বিজ্ঞাপন
আজ বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের ৮৫তম জন্মবার্ষিকী। ১৯৪১ সালের এই দিনে পুরান ঢাকার আগা সাদেক রোডের মোবারক লজে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তাঁর পৈতৃক বাড়ি নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলায়। বাবা মৌলভী আবদুস সামাদ এবং মা সৈয়দা মোবারকুন্নেসা খাতুন। বাংলাদেশের সাত বীরশ্রেষ্ঠের মধ্যে অন্যতম এই বীর সন্তান।
ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে তাঁর শিক্ষাজীবনের সূচনা। পরবর্তী সময়ে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের সারগোদায় পাকিস্তান বিমানবাহিনী পাবলিক স্কুলে পড়াশোনা করেন তিনি। এরপর ভর্তি হন বিমানবাহিনী একাডেমিতে। ১৯৬৩ সালের জুনে কমিশন লাভের মধ্য দিয়ে শুরু হয় তাঁর পেশাগত সামরিক জীবন। করাচিতে জেট কনভার্সন কোর্স শেষ করে পেশোয়ারে জেট পাইলট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
সামরিক কর্মজীবনের পাশাপাশি গড়ে উঠেছিল তাঁর সংসার। ১৯৬৮ সালে মিলি রহমানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন মতিউর। তাঁদের দুই কন্যা মাহিন ও তুহিন। ১৯৭১ সালের জানুয়ারির শেষ দিকে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ছুটিতে ঢাকায় আসেন তিনি। তখন পূর্ব বাংলায় স্বাধিকার আন্দোলন ক্রমেই স্বাধীনতার সংগ্রামে রূপ নিচ্ছিল।
বিজ্ঞাপন
মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ছুটিতে থাকা মতিউর স্থানীয় প্রতিরোধ সংগঠনে যুক্ত হন। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জীবনী অনুযায়ী, নরসিংদীতে স্বাধীনতাকামী মানুষকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন তিনি। পরে মে মাসে পাকিস্তানে কর্মস্থলে ফিরে যান। সেখানে নিয়মিত দায়িত্ব পালনের আড়ালে একটি বিমান নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার পরিকল্পনা করতে থাকেন।
সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা করেন ২০ আগস্ট। করাচির মাসরুর বিমানঘাঁটি থেকে টি-৩৩ প্রশিক্ষণ বিমান নিয়ে ভারতের দিকে যাওয়ার উদ্যোগ নেন মতিউর। বিমানে ছিলেন পাকিস্তানি পাইলট অফিসার রাশেদ মিনহাজও। বিমানটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তাঁদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। একপর্যায়ে সেটি পাকিস্তানের ভূখণ্ডে বিধ্বস্ত হয়; দুজনই নিহত হন। মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার উদ্দেশ্যে শুরু করা মতিউরের যাত্রা সেখানেই থেমে যায়।
বিজ্ঞাপন
তাঁর বয়স তখন ২৯ বছর। ত্রিশতম জন্মদিন আসার আগেই শেষ হয়ে যায় জীবন। স্ত্রী ও দুই শিশুকন্যাকে রেখে যাওয়া এই বৈমানিক স্বাধীন বাংলাদেশের বিজয় দেখে যেতে পারেননি। তবে তাঁর আত্মত্যাগ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে বাঙালি সামরিক সদস্যদের প্রতিরোধ ও স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নেওয়ার এক স্মরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। জন্ম ও মৃত্যুর তারিখ অনুযায়ী তাঁর সংক্ষিপ্ত জীবনের এই হিসাবও একাত্তরের হারিয়ে যাওয়া সম্ভাবনার কথা মনে করিয়ে দেয়।
মৃত্যুর পর মতিউর রহমানকে পাকিস্তানের মাসরুর বিমানঘাঁটির কবরস্থানে সমাহিত করা হয়। যে দেশের স্বাধীনতার জন্য তিনি প্রাণ দিয়েছিলেন, সেই দেশের মাটিতে তাঁর ফিরে আসতে লেগেছিল প্রায় ৩৫ বছর। ২০০৬ সালের ২৪ জুন রাতে পাকিস্তান থেকে তাঁর দেহাবশেষ ঢাকায় আনা হয়। জাতীয় পতাকায় আচ্ছাদিত কফিন গ্রহণের সময় উপস্থিত ছিলেন পরিবারের সদস্যরাও। দীর্ঘ অপেক্ষার পর স্বজনকে ফিরে পাওয়ার সেই মুহূর্ত ছিল তাঁদের জন্য গভীর আবেগের।
পরদিন, ২৫ জুন, পূর্ণ রাষ্ট্রীয় ও সামরিক মর্যাদায় ঢাকার মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তাঁকে পুনঃসমাহিত করা হয়। শ্রদ্ধা জানাতে উপস্থিত হন রাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষ। তিন বাহিনীর সম্মিলিত দল গার্ড অব অনার দেয়। স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে শেষ আশ্রয় পান বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান।
বিজ্ঞাপন
বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের জন্মবার্ষিকী শুধু একজন সাহসী বৈমানিককে স্মরণ করার দিন নয়, বরং স্বাধীনতার জন্য তাঁর ব্যক্তিগত ত্যাগ ও দৃঢ় সংকল্পকে নতুন করে উপলব্ধি করার উপলক্ষ। একজন প্রশিক্ষিত বৈমানিক, একজন স্বামী এবং দুই সন্তানের বাবা হয়েও দেশের স্বাধীনতার প্রশ্নে নিজের অবস্থান বেছে নিয়েছিলেন তিনি। তাঁর সেই যাত্রা অসমাপ্ত থাকলেও স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তব হয়েছে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে তাঁর আত্মত্যাগের ইতিহাস সাহস, দেশপ্রেম ও স্বাধীনতার মূল্য স্মরণ করিয়ে দেবে।








