Logo

জীবনানন্দ দাশের ৭২তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ, স্মরণে নির্জনতার কবি

profile picture
জনবাণী ডেস্ক
২২ অক্টোবর, ২০২৬, ১৮:২৩
জীবনানন্দ দাশের ৭২তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ, স্মরণে নির্জনতার কবি
ছবি: সংগৃহীত

বাংলা সাহিত্যের আধুনিক কবিতার অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব জীবনানন্দ দাশের ৭২তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। প্রকৃতি, নিঃসঙ্গতা, বিষণ্নতা ও মানবজীবনের গভীর অনুভূতিকে স্বতন্ত্র কাব্যভাষায় তুলে ধরে তিনি বাংলা কবিতায় সৃষ্টি করেছিলেন নিজস্ব এক জগৎ। মৃত্যুর সাত দশকেরও বেশি সময় পরও তাঁর কবিতা পাঠকের মনে নতুন করে আলোড়ন তোলে।

বিজ্ঞাপন

১৮৯৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি বরিশালে জন্মগ্রহণ করেন জীবনানন্দ দাশ। ১৯৫৪ সালের ১৪ অক্টোবর কলকাতার বালিগঞ্জ ফাঁড়ির কাছে ট্রাম দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন তিনি। পরে ২২ অক্টোবর কলকাতার শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে রাত ১১টা ৩৫ মিনিটে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুর পেছনে ট্রাম দুর্ঘটনার ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে নানা আলোচনা ও বিতর্ক হয়েছে।

রবীন্দ্রপ্রভাবের বাইরে স্বতন্ত্র কাব্যজগৎ

জীবনানন্দ দাশের সাহিত্যিক জীবন ছিল অনেকটাই নিভৃত ও নিঃসঙ্গ। জীবদ্দশায় তিনি ব্যাপক জনপ্রিয়তা কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি পাননি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রভাববলয়ে থাকা বাংলা কবিতায় তিনি নিয়ে আসেন ভিন্নধর্মী শব্দচয়ন, অভিনব চিত্রকল্প এবং গভীর বিষণ্নতাময় আবহ।

বিজ্ঞাপন

তাঁর কবিতার জটিল রূপক, উপমা ও ব্যতিক্রমী প্রকাশভঙ্গি সমকালীন অনেক পাঠকের কাছে সহজবোধ্য ছিল না। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর সাহিত্যকর্মের স্বাতন্ত্র্য ও গভীরতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বাংলা আধুনিক কবিতার বিকাশে তিনি হয়ে ওঠেন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথপ্রদর্শক।

কবি বুদ্ধদেব বসুর দেওয়া ‘নির্জনতম কবি’ পরিচিতিটি জীবনানন্দের সাহিত্যিক সত্তার সঙ্গে গভীরভাবে মিলে যায়। তাঁর লেখায় প্রকৃতির সৌন্দর্যের পাশাপাশি নগরজীবনের ক্লান্তি, মানুষের নিঃসঙ্গতা, হতাশা এবং অস্তিত্বের নানা জটিলতা ফুটে উঠেছে।

ধানসিঁড়ি, বাংলার প্রকৃতি ও কবিতার মায়া

বিজ্ঞাপন

জীবনানন্দের কবিতায় বাংলার নদী, মাঠ, ধানখেত, পাখি ও গ্রামীণ প্রকৃতি পেয়েছে অনন্য রূপ। ধানসিঁড়ি নদী ও বাংলার চিরচেনা নিসর্গ তাঁর কাব্যে এমনভাবে উঠে এসেছে, যা পাঠককে বারবার শেকড়ের কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।

তাঁর বহুল পরিচিত পঙ্‌ক্তি—

‘আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে – এই বাংলায়

বিজ্ঞাপন

হয়তো মানুষ নয় – হয়তো বা শঙখচিল শালিখের বেশে’

এই পঙ্‌ক্তিতে বাংলার প্রকৃতির প্রতি গভীর টান এবং মৃত্যুর পরও আপন ভূখণ্ডে ফিরে আসার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পেয়েছে। তাঁর কবিতার প্রকৃতি নিছক দৃশ্যবর্ণনা নয়; বরং মানুষের স্মৃতি, অনুভূতি ও অস্তিত্বের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত।

মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয়েছে বহু অপ্রকাশিত রচনা

বিজ্ঞাপন

জীবদ্দশায় জীবনানন্দ দাশের সাতটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘ঝরা পালক’, ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’, ‘বনলতা সেন’, ‘মহাপৃথিবী’, ‘সাতটি তারার তিমির’ এবং ‘রূপসী বাংলা’। এর মধ্যে ‘রূপসী বাংলা’ তাঁর মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয়।

বাংলা ভাষার অন্যতম জনপ্রিয় কবিতা ‘বনলতা সেন’ তাঁকে পাঠকের কাছে বিশেষভাবে পরিচিত করেছে। কবিতার পাশাপাশি তিনি উপন্যাস ও ছোটগল্পও রচনা করেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে ‘মাল্যবান’ ও ‘সুতীর্থ’। সাহিত্যভাবনা ও কাব্যতত্ত্ব নিয়ে তাঁর প্রবন্ধগ্রন্থ ‘কবিতার কথা’ও গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।

কবির মৃত্যুর পর তাঁর রেখে যাওয়া ট্রাঙ্ক ও পাণ্ডুলিপি থেকে বহু অপ্রকাশিত কবিতা, উপন্যাস ও ছোটগল্পের সন্ধান পাওয়া যায়। এসব রচনা প্রকাশিত হওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর সাহিত্যিক প্রতিভার আরও বিস্তৃত পরিচয় সামনে আসে।

বিজ্ঞাপন

নিঃসঙ্গতার মধ্যেও সৌন্দর্যের সন্ধান

জীবনানন্দ দাশের ব্যক্তিজীবনে ছিল নানা প্রতিকূলতা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও মানসিক টানাপোড়েন। তবু তাঁর সাহিত্যজগতে প্রকৃতি ও সৌন্দর্যের অনুসন্ধান থেমে থাকেনি। মানুষের অন্তর্গত নিঃসঙ্গতা এবং আধুনিক জীবনের ক্লান্তিকে তিনি এমন ভাষায় প্রকাশ করেছেন, যা সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে আজও প্রাসঙ্গিক।

বাংলা কবিতার পরবর্তী প্রজন্মের ওপর তাঁর প্রভাব গভীর। রবীন্দ্রনাথ-পরবর্তী আধুনিক কবিতার স্বতন্ত্র ধারা নির্মাণে তাঁর অবদান বাংলা সাহিত্যকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

জীবনানন্দ দাশের আদি নিবাস বাংলাদেশের বরিশালে হলেও তাঁর পূর্বপুরুষদের বসতি ছিল তৎকালীন ঢাকা জেলার বিক্রমপুর পরগণার কুমারভোগের গাওপাড়ায়। পদ্মার ভাঙনে সেই গ্রাম বিলীন হয়ে যায়। পরে উনিশ শতকের শেষভাগে দাশ পরিবার বিক্রমপুর থেকে বরিশালে চলে আসে।

আজ তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে কবিতাপ্রেমীরা আবারও ফিরে তাকাচ্ছেন সেই নিভৃতচারী কবির দিকে, যিনি বাংলার প্রকৃতি ও মানুষের নিঃসঙ্গতাকে শব্দের মাধ্যমে অমর করে গেছেন। সময়ের কোলাহল থেকে দূরে তাঁর কবিতা আজও পাঠককে নিয়ে যায় এক শান্ত, গভীর ও অনুভবময় জগতে।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD