থানা-পুলিশে ঘেরা ঢাবি, তবুও নিরাপত্তাহীনতায় বাড়ছে আতঙ্ক

দেশের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক চর্চার অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস—যেখানে নিরাপত্তা থাকার কথা সবচেয়ে বেশি, সেই এলাকাই ক্রমেই অনিরাপদ হয়ে উঠছে বলে অভিযোগ উঠছে শিক্ষার্থীদের মধ্যে। চারপাশে থানা, পুলিশ ফাঁড়ি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকলেও বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে।
বিজ্ঞাপন
ক্যাম্পাসের দুই পাশে শাহবাগ ও নিউমার্কেট থানা, প্রবেশমুখে পুলিশ ফাঁড়ি এবং নিয়মিত প্রোক্টরিয়াল টহল থাকার পরও গত এক বছরে এখানে একাধিক হত্যাকাণ্ড, ছিনতাই ও মাদক সংশ্লিষ্ট ঘটনার পুনরাবৃত্তি শিক্ষার্থীদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বিশেষ করে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারসংলগ্ন এলাকায় সাম্প্রতিক কয়েকটি নৃশংস ঘটনা নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
২০২৫ সালের ১৩ মে রাতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান এলাকায় দুর্বৃত্তদের হামলায় নিহত হন শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী শাহরিয়ার আলম সাম্য। মোটরসাইকেলের সঙ্গে ধাক্কা লাগাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের একপর্যায়ে তাকে ছুরিকাঘাত করা হয়। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এর কিছুদিন পরই, গত ১৫ মার্চ রাতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকায় রাকিবুল ইসলাম নামে এক তরুণকে গুলি ও ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে আড্ডা দেওয়ার সময় হঠাৎ কয়েকজন যুবক এসে তার ওপর হামলা চালায় এবং ঘটনাস্থলেই গুরুতর জখম করে পালিয়ে যায়। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
বিজ্ঞাপন
শুধু হত্যাকাণ্ড নয়, ক্যাম্পাস ও আশপাশের এলাকাগুলোতে নিয়মিত ঘটছে ছিনতাই, চুরি ও সহিংসতার ঘটনা। টিএসসি, দোয়েল চত্বর, নীলক্ষেত, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান এবং শহীদ মিনার এলাকা ক্রমেই অপরাধপ্রবণ অঞ্চলে পরিণত হয়েছে বলে বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, সন্ধ্যার পর এসব এলাকায় বহিরাগতদের আনাগোনা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। অন্ধকার নামলেই মাদক সেবন ও কেনাবেচা বাড়ে, যা সাধারণ শিক্ষার্থী ও পথচারীদের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।
বিজ্ঞাপন
বিশেষ করে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানকে ঘিরে উদ্বেগ সবচেয়ে বেশি। ঐতিহাসিক এই স্থানটি এখন অনেকের কাছে মাদকসেবী ও কারবারিদের নিরাপদ জায়গা হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে। উদ্যানের বিভিন্ন পয়েন্টে প্রকাশ্যে গাঁজাসহ অন্যান্য মাদক কেনাবেচার অভিযোগ রয়েছে। এমনকি শিশু-কিশোরদেরও এই চক্রে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, কিছু কিশোর-কিশোরী জীবিকার তাগিদে মাদক বিক্রির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। কেউ আগে ফুল বিক্রি করলেও এখন বাধ্য হয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এই কাজে যুক্ত হয়েছে বলে জানায়। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিকল্প আয়ের সুযোগ পেলে তারা এই পথ ছাড়তে চায়, তবে পেছনে থাকা চক্র সম্পর্কে তারা প্রকাশ্যে কিছু বলতে চায় না।
একই সঙ্গে ছিনতাইয়ের ঘটনাও উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। চলতি বছরের ২৫ জানুয়ারি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের চার শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ছুরি দেখিয়ে প্রায় ৩০ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটে। এর আগেও নারী পুলিশ সদস্যকে লক্ষ্য করে ছিনতাইয়ের চেষ্টা ও হামলার ঘটনা সামনে এসেছে।
বিজ্ঞাপন
এসব ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শিক্ষার্থীরা। তাদের মতে, ক্যাম্পাসে অবাধে বহিরাগত প্রবেশ এবং পর্যাপ্ত নজরদারির অভাবই মূলত এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী। অনেকেই মনে করেন, পুলিশি টহল থাকলেও তা অপরাধ প্রতিরোধে যথেষ্ট কার্যকর নয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বলছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে এ ধরনের নিরাপত্তাহীনতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। একের পর এক হত্যাকাণ্ড ও অপরাধের ঘটনায় তারা দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষের যাতায়াত থাকায় এই এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও সমন্বিত করতে হবে। সিসিটিভি নজরদারি বাড়ানো, বহিরাগত নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত টহল জোরদার করলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব।
বিজ্ঞাপন
এদিকে শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিরাও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের অভিযোগ, মাদক ও অপরাধ সংক্রান্ত তথ্য বারবার জানানো হলেও দৃশ্যমান পদক্ষেপের অভাব রয়েছে। ফলে অপরাধের প্রবণতা কমার পরিবর্তে আরও বিস্তৃত হচ্ছে।
অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দাবি, নিরাপত্তা জোরদারে উদ্যোগ নেওয়া হলেও অনেক সময় শিক্ষার্থীদের একটি অংশই তা বাস্তবায়নে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ক্যাম্পাস উন্মুক্ত হওয়ায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা কঠিন হয়ে পড়ে বলেও তারা উল্লেখ করেছেন।
বিজ্ঞাপন
প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, ক্যাম্পাসে স্থায়ী পুলিশি উপস্থিতি নিয়ে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। ফলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যক্রম অনেকটাই পরিস্থিতিনির্ভর হয়ে যায়।
সব মিলিয়ে, নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে থাকা সত্ত্বেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অপরাধের পুনরাবৃত্তি একটি বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিক্ষার্থী, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ কঠিন বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।








