রামিসা হত্যা : আজ মিলছে ডিএনএ রিপোর্ট, রবিবারেই চার্জশিট

রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণির স্কুলছাত্রী শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে গলা কেটে হত্যার মামলায় দ্রুততম সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ করতে যাচ্ছে পুলিশ। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক এসিড (ডিএনএ) পরীক্ষার কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
আজ শনিবার (২৩ মে) পরীক্ষার রিপোর্ট হাতে পাওয়ার কথা রয়েছে এবং সেটি পাওয়া মাত্রই আগামীকাল রবিবারের (২৪ মে) মধ্যে আদালতে বহুল আলোচিত এই মামলার চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করা হতে পারে।
শনিবার (২৩ মে) মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও পল্লবী থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) অহিদুজ্জামান গণমাধ্যমকে এই তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, ডিএনএ টেস্টের প্রক্রিয়া ইতিমধ্যেই শেষ হয়েছে। আজ ল্যাব থেকে আনুষ্ঠানিক রিপোর্টটি সংগ্রহ করা সম্ভব হলে দ্রুততার সঙ্গে মামলার চার্জশিট প্রস্তুত করে আদালতে জমা দেওয়া হবে। আশা করা যাচ্ছে, আগামীকাল রবিবারের মধ্যেই বিজ্ঞ আদালতে এই অভিযোগপত্র দাখিল করা সম্ভব হবে।
বিজ্ঞাপন
হত্যাকাণ্ডের পর গ্রেপ্তার হওয়া মূল আসামি সোহেল রানা গত বুধবার (২০ মে) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনাইদের আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় নিজের অপরাধ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছে। জবানবন্দি রেকর্ড করার পর আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে ঘাতক সোহেল জানায়, ঘটনার আগে সে ইয়াবা সেবন করেছিল। মাদকাসক্ত অবস্থায় সে এই পাশবিক ও বিকৃত যৌন লালসা চরিতার্থ করে। নিহত শিশুটির পরিবারের সঙ্গে তাদের পূর্ব কোনো শত্রুতা ছিল না বলে সে দাবি করে।
আদালতের নথিসূত্র ও জবানবন্দি থেকে জানা যায়, গত ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী রামিসা ঘর থেকে বের হয়। এসময় সোহেল রানার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার শিশুটিকে ফুসলিয়ে ও কৌশলে তাদের শয়নকক্ষে নিয়ে আসে। এরপর সোহেল শিশুটিকে জোরপূর্বক বাথরুমে ঢুকিয়ে ধর্ষণ করে। ধর্ষণের তীব্রতায় শিশুটি অচেতন হয়ে পড়ে।
বিজ্ঞাপন
ঠিক সেই মুহূর্তে রামিসার মা মেয়েকে খুঁজতে খুঁজতে সোহেলের দরজায় কড়া নাড়তে শুরু করেন। ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে সোহেল অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় বাথরুমের ভেতরেই ধারালো ছুরি দিয়ে রামিসাকে গলা কেটে হত্যা করে। এরপর লাশ গুম করার উদ্দেশ্যে মৃতদেহের মাথা কেটে শরীর থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে ফেলে। ধারালো অস্ত্র দিয়ে অবুঝ শিশুটির যৌনাঙ্গ ক্ষতবিক্ষত করা হয় এবং দুই হাত কাঁধ থেকে আংশিক বিচ্ছিন্ন করা হয়। পরবর্তীতে বাথরুম থেকে দেহটি এনে শয়নকক্ষের খাটের নিচে লুকিয়ে রাখা হয় এবং বিচ্ছিন্ন মাথাটি রাখা হয় একটি বড় বালতির ভেতর। এই বীভৎস অপরাধের পুরো সময়টাতে সোহেলের স্ত্রী স্বপ্না একই ঘরে উপস্থিত ছিলেন। নৃশংসতা শেষ করে সোহেল ঘরের জানালার গ্রিল কেটে কৌশলে পালিয়ে যায়।
ঘটনার দিন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রামিসার মা তাকে স্কুলে নিয়ে যাওয়ার জন্য খুঁজতে বের হন। খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে তিনি প্রতিবেশী সোহেল রানার ঘরের দরজার সামনে রামিসার জুতা পড়ে থাকতে দেখেন। সন্দেহ হওয়ায় তিনি ডাকাডাকি করলেও ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ মেলেনি। পরে রামিসার বাবা-মা এবং ভবনের অন্যান্য ফ্ল্যাটের বাসিন্দারা মিলে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন।
কক্ষে ঢুকেই তারা মেঝেতে রামিসার মস্তকবিহীন দেহ এবং ঘরের একটি বালতির ভেতর বিচ্ছিন্ন মাথাটি দেখতে পান। এ সময় ঘরের ভেতর স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন সোহেলের স্ত্রী স্বপ্না আক্তার। উপস্থিত লোকজন তাৎক্ষণিকভাবে জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ কল করে পুলিশকে অবহিত করেন। পল্লবী থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে স্বপ্না আক্তারকে নিজেদের হেফাজতে নেয়। পরবর্তীতে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলার ফতুল্লা থানার সমুখভাগ থেকে মূল ঘাতক সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয় পুলিশ।
বিজ্ঞাপন
এই পাশবিক হত্যাকাণ্ডের পরদিন, অর্থাৎ ২০ মে নিহত শিশুর বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা বাদী হয়ে পল্লবী থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। ওই দিনই দুপুরে গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করে পুলিশ।
আদালতে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পৃথক দুটি আবেদন জমা দেন। যার একটি ছিল মূল আসামি সোহেল রানার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ড করার জন্য এবং অন্যটি ছিল হত্যাকাণ্ডে সহযোগী হিসেবে তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে কারাগারে আটকে রাখার আর্জি জানিয়ে।
বিজ্ঞাপন
আদালতের আবেদনে পুলিশ উল্লেখ করে, ঘটনার পর স্বপ্না আক্তারকে ঘর থেকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তিনি স্বীকার করেন যে, তার স্বামী সোহেল রানা (৩০) পাশবিক কামনা চরিতার্থ করার জন্য রামিসাকে বাথরুমে আটকে রেখে ধর্ষণ ও গলা কেটে হত্যা করেছে। লাশ সম্পূর্ণ বিকৃত ও গুম করার উদ্দেশ্যে মাথা বিচ্ছিন্ন করা এবং যৌনাঙ্গ ক্ষতবিক্ষত করার পর সোহেল জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যায়। পরবর্তীতে পুলিশ ফতুল্লা থেকে সোহেলকে গ্রেপ্তার করার পর সেও পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এই রোমহর্ষক ও পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের আদ্যোপান্ত স্বীকার করে।
পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ডিএনএ রিপোর্টের মতো অকাট্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ হাতে আসামাত্রই রেকর্ড সময়ের মধ্যে মামলার চার্জশিট আদালতে পেশ করা হচ্ছে, যাতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই জঘন্য অপরাধের দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করা যায়।








