Logo

সাক্ষীদের বর্ণনায় উঠে এলো রামিসা হত্যাকাণ্ডের বিভীষিকাময় চিত্র

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
২ জুন, ২০২৬, ১৬:৩২
সাক্ষীদের বর্ণনায় উঠে এলো রামিসা হত্যাকাণ্ডের বিভীষিকাময় চিত্র
ছবি: সংগৃহীত

রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর হত্যা মামলায় আদালতে একে একে সাক্ষ্য দিয়েছেন ভুক্তভোগীর স্বজন, প্রতিবেশী ও প্রত্যক্ষদর্শীরা। তাদের বক্তব্যে ১৯ মে সংঘটিত ওই মর্মান্তিক ঘটনার ভয়াবহ ও হৃদয়বিদারক চিত্র উঠে এসেছে।

বিজ্ঞাপন

মঙ্গলবার (২ জুন) ঢাকার মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে মামলার শুনানিতে রামিসার বাবা-মা, বড় বোনসহ মোট ১৬ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হয়।

সাক্ষীদের বক্তব্যে উঠে আসে কীভাবে শিশুটির মাথাবিহীন মরদেহ উদ্ধার করা হয়, কী অবস্থায় ঘটনাস্থল পাওয়া যায় এবং অভিযুক্ত সোহেল রানার পালিয়ে যাওয়ার বিষয়টি।

বিজ্ঞাপন

মামলার বাদী ও রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা আদালতে বলেন, ঘটনার দিন সকালে তিনি অফিসের উদ্দেশে বাসা থেকে বের হন। তার কর্মস্থল কাকলী এলাকায় হওয়ায় ক্যান্টনমেন্ট হয়ে সেখানে যাচ্ছিলেন। সকাল আনুমানিক ১০টা থেকে ১০টা ১৫ মিনিটের মধ্যে তার স্ত্রী পারভীন আক্তার ফোন করে দ্রুত বাসায় ফিরতে বলেন।

তিনি আদালতকে জানান, ফোন পাওয়ার পর বাসায় ফিরতে তার প্রায় ২৫ থেকে ৩০ মিনিট সময় লাগে। বাসায় এসে দেখেন, ফ্ল্যাটের সামনে বিপুলসংখ্যক মানুষ জড়ো হয়েছে। দ্রুত ওপরে উঠে গিয়ে দেখেন, তার স্ত্রী পাশের ফ্ল্যাটের দরজায় দীর্ঘ সময় ধরে ডাকাডাকি করলেও কেউ দরজা খুলছে না।

হান্নান মোল্লা বলেন, পরে তিনিও দরজা খোলার চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে হাতুড়ি দিয়ে দরজার তালা ভেঙে ফ্ল্যাটের ভেতরে প্রবেশ করেন। ভেতরে ঢুকে টয়লেটের সামনে কিছু রক্ত দেখতে পান।

বিজ্ঞাপন

সাক্ষ্যগ্রহণকালে তিনি আদালতকে আরও জানান, ঘটনার আগে তিনি আসামিদের চিনতেন না। আমি আসামিকে জীবনেও দেখিনি, বলেন তিনি।

ভুক্তভোগী শিশুটির মা পারভীন আক্তার আদালতে বলেন, ঘটনার সময় তিনি বাসায় রান্নার কাজে ব্যস্ত ছিলেন। রান্নার শেষ পর্যায়ে এসে মেয়েকে দেখতে না পেয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। বড় মেয়ের কাছে জানতে চাইলে সে জানায়, রামিসা তার সঙ্গে কোথাও যায়নি।

পারভীন আক্তার বলেন, রান্না করার সময় একটি চিৎকার শুনেছিলাম। ভেবেছিলাম পাশের বাসার কোনো শিশু হয়তো চিৎকার করছে। পরে বড় মেয়ে ফিরে এলে আমার মেয়ের খোঁজ করি। সে জানায়, রামিসা তার সঙ্গে যায়নি।

বিজ্ঞাপন

তিনি জানান, এরপর ভবনের নিচতলা, একটি অফিস কক্ষ, ব্যাচেলর বাসাসহ বিভিন্ন স্থানে মেয়েকে খুঁজতে থাকেন। একপর্যায়ে তৃতীয় তলায় পাশের ফ্ল্যাটের সামনে গিয়ে মেয়ের একটি জুতা দেখতে পান। তখন তার মনে হয়, আগে শোনা চিৎকারটি হয়তো তার মেয়েরই ছিল।

আদালতে কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, আমি বারবার স্বপ্নাকে বলেছি- বোন দরজাটা খুলে দে। কিন্তু সে দরজা খোলেনি।

বিজ্ঞাপন

সাক্ষ্যে তিনি আরও বলেন, তিনি ও আশপাশের লোকজন বারবার দরজায় ধাক্কা দিলেও ভেতর থেকে কেউ সাড়া দেয়নি। পরে আরও লোকজন এসে দরজা খোলার চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে ফ্ল্যাটের ভেতরে রক্ত দেখতে পান তারা। পরে সেখান থেকে আমার মেয়ের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

পারভীন আক্তার আদালতকে জানান, পরে অভিযুক্ত আসামি স্বপ্না আক্তার উপস্থিত লোকজনকে বলেছিল- সোহেল রানা ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে পালিয়ে গেছে।

সাক্ষ্যে রামিসার চাচি আদালতে বলেন, আমার স্বামী ফোন দিয়ে বলেন, রামিসাকে পাওয়া যাচ্ছে না। পরে গিয়ে দেখি বাসায় ভিড় ও কান্নাকাটি চলছে। ঘরে গিয়ে খাটের নিচে এক পাশে রামিসার মাথাবিহীন মরদেহ দেখতে পাই। তখন পুলিশ সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করছিল।

বিজ্ঞাপন

জেরায় তিনি বলেন, আমি গলাকাটা মরদেহ দেখেছি, ধর্ষণের দৃশ্য দেখিনি।

রামিসার চাচা মিজানুর রহমান লিটন আদালতে বলেন, আমি মেট্রোরেলে থাকাকালে স্ত্রী ফোন করে জানান, রামিসাকে পাওয়া যাচ্ছে না। বাসায় এসে দেখি রক্ত পড়ে আছে। একটি বড় বালতির মধ্যে রামিসার মাথা ছিল। তার গলা ও হাত কাটা ছিল।

তিনি আদালতে উপস্থিত আসামি সোহেল রানা ও স্বপ্না খাতুনকে শনাক্ত করেন।

বিজ্ঞাপন

একই ভবনের বাসিন্দা মনির হোসেন বলেন, সকাল ১০টা থেকে ১১টার মধ্যে শব্দ শুনে নিচে নেমে দেখেন রামিসার মা সোহেল রানার দরজায় ধাক্কা দিচ্ছেন। পরে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে রক্ত দেখতে পান।

তিনি বলেন, স্বপ্নাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি। ভেতরের আরেকটি গেট তালাবদ্ধ ছিল। সেটি খুলে রামিসার মাথাবিহীন মরদেহ দেখতে পাই।

প্রতিবেশী জাকিরুল ইসলাম রাজন আদালতে বলেন, রামিসার মা ডাকাডাকি করলে ফিরে আসি। দরজা না খোলায় পরে ভেতরে ঢুকে প্রথমে বাথরুমে কাপড় পড়ে থাকতে দেখি। এরপর রক্ত দেখতে পাই। স্বপ্নাকে জিজ্ঞেস করলে সে কিছু জানে না বলে। পরে খাট উঁচু করে রামিসার বস্ত্রবিহীন মরদেহ দেখতে পাই। একটি বালতির মধ্যে মাথা ছিল।

বিজ্ঞাপন

গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য দেন আবু সামা নামের এক প্রতিবেশী। তিনি আদালতে বলেন, সকাল প্রায় ১০টার দিকে নাস্তা করছিলাম। তখন দেখি পাশের বাসার জানালা বেয়ে এক ব্যক্তি খালি গায়ে নিচে নামছে। আমি তাকে চোর মনে করে ‘চোর চোর’ বলে চিৎকার করি। পরে পাশের বাসা থেকে চিৎকার শুনে গিয়ে রামিসার মরদেহ দেখি।

জেরায় তিনি বলেন, পরে মিডিয়ায় ছবি দেখে নিশ্চিত হই, জানালা দিয়ে নামা ব্যক্তিই আসামি সোহেল রানা।

আরেক সাক্ষী মনিরুজ্জামান শাহীন আদালতে বলেন, ঘটনাস্থলে গিয়ে তিনি একটি পাতলা ছুরি এবং বালতির মধ্যে রামিসার মাথা দেখতে পান। পুলিশ সদস্য রুমা আক্তারও আদালতে সাক্ষ্য দেন। তবে তার সাক্ষ্যের বিস্তারিত অংশ পরে আদালতে উপস্থাপন করা হয়।

বিজ্ঞাপন

সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আজিজুল রহমান দুলু সাংবাদিকদের বলেন, সাক্ষীদের বক্তব্যে মামলার গুরুত্বপূর্ণ অনেক তথ্য উঠে এসেছে। বিশেষ করে ভুক্তভোগীর বাবা-মায়ের সাক্ষ্যে ঘটনার লোমহর্ষক বর্ণনা পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে ধর্ষণ ও হত্যার পর আসামি সোহেল রানা গ্রিল কেটে পালিয়ে যাওয়ার বিষয়েও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আদালতের সামনে এসেছে।

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD