Logo

অনলাইন জুয়া ও বেটিং ঠেকাতে কার্যকর হলো নতুন আইন

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
২ জুলাই, ২০২৬, ১৬:১৫
অনলাইন জুয়া ও বেটিং ঠেকাতে কার্যকর হলো নতুন আইন
ছবি: সংগৃহীত

দেশে অনলাইন জুয়া, স্পোর্টস বেটিং, ভার্চুয়াল ক্যাসিনো এবং ডিজিটাল মাধ্যমে পরিচালিত বিভিন্ন ধরনের জুয়ার কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে নতুন আইন কার্যকর করেছে সরকার। প্রায় ১৫৯ বছর আগে প্রণীত ‘প্রকাশ্য জুয়া আইন, ১৮৬৭’ বাতিল করে ‘জুয়া প্রতিরোধ আইন-২০২৬’ নামে আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর নতুন আইন প্রণয়ন করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

রাষ্ট্রপতির সম্মতির পর বুধবার (১ জুলাই) বাংলাদেশ গেজেটের অতিরিক্ত সংখ্যায় আইনটি প্রকাশ করা হয়। গেজেট প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই এটি কার্যকর হয়েছে।

নতুন আইনে প্রথমবারের মতো অনলাইন জুয়া, অনলাইন ও স্পোর্টস বেটিং, ভার্চুয়াল ও ফ্যান্টাসি বেটিং, ই-স্পোর্টস বেটিং, ডিজিটাল গ্যাম্বলিং প্ল্যাটফর্ম, ভিপিএন, প্রক্সি, মিরর সাইট, ক্রিপ্টোকারেন্সি, ডিজিটাল ওয়ালেট, ঘোস্ট সিম, ভুয়া মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) অ্যাকাউন্ট, ম্যাচ ফিক্সিং ও স্পট ফিক্সিংয়ের মতো বিভিন্ন ডিজিটাল অপরাধের স্পষ্ট সংজ্ঞা যুক্ত করা হয়েছে। এসব কার্যক্রমে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত থাকাও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে।

বিজ্ঞাপন

আইন অনুযায়ী, ইন্টারনেট, মোবাইল নেটওয়ার্ক, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ওয়েবসাইট, মোবাইল অ্যাপ, সার্ভার, ক্লাউডভিত্তিক অবকাঠামো, ভিপিএন বা অন্য যেকোনো প্রযুক্তিগত মাধ্যম ব্যবহার করে জুয়া পরিচালনা, বেটিং কার্যক্রম চালানো, অ্যাকাউন্ট খোলা বা ব্যবহার, অর্থ জমা, উত্তোলন কিংবা স্থানান্তর করা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। বিদেশি অনলাইন জুয়ার প্ল্যাটফর্মের প্রতিনিধি, এজেন্ট বা সহযোগী হিসেবেও কাজ করা যাবে না।

আইনে সাধারণ জুয়ার অপরাধে সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদণ্ড বা দুই লাখ টাকা জরিমানা কিংবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। অনলাইন বা দূরবর্তী জুয়ার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড অথবা এক কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানা করা যাবে।

এছাড়া অনলাইন বেটিং পরিচালনা, বুকমেকার হিসেবে কাজ করা, ভিপিএন বা মিরর সাইট ব্যবহার করে জুয়ার নেটওয়ার্ক পরিচালনা কিংবা ডিজিটাল অবকাঠামোর মাধ্যমে জুয়ার কার্যক্রম পরিচালনার অপরাধে সর্বোচ্চ সাত বছর কারাদণ্ড এবং পাঁচ কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

ম্যাচ ফিক্সিংয়ের জন্য সর্বোচ্চ সাত বছর কারাদণ্ড ও এক কোটি টাকা জরিমানা এবং স্পট ফিক্সিংয়ের জন্য সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড ও ৫০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। আদালত চাইলে দোষী ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বা স্থায়ীভাবে সংশ্লিষ্ট খেলাধুলা বা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ থেকেও নিষিদ্ধ করতে পারবেন।

জুয়ার বিজ্ঞাপন, প্রচারণা, স্পন্সরশিপ, অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং বা রেফারেল ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে জুয়ার প্রসারে ভূমিকা রাখলে গণমাধ্যম, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ইনফ্লুয়েন্সার, শিল্পী, খেলোয়াড় বা অন্য যেকোনো ব্যক্তি সর্বোচ্চ তিন বছর কারাদণ্ড অথবা ৫০ লাখ টাকা জরিমানা কিংবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন।

বিজ্ঞাপন

ভুয়া সিম, ঘোস্ট সিম, ভুয়া এমএফএস অ্যাকাউন্ট অথবা অন্যের জাতীয় পরিচয়পত্র ও বায়োমেট্রিক তথ্য ব্যবহার করে জুয়ার কার্যক্রম পরিচালনার অপরাধে সর্বোচ্চ সাত বছর কারাদণ্ড এবং ৫০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। আর সংঘবদ্ধভাবে বা অর্থপাচারের উদ্দেশ্যে এ ধরনের অপরাধ সংঘটিত হলে সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ড ও পাঁচ কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে।

নতুন আইনে জুয়ার অর্থ ব্যাংক, এমএফএস, ডিজিটাল ওয়ালেট, হাওলা, হুন্ডি কিংবা ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে স্থানান্তর, গোপন বা বৈধ করার চেষ্টাকে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর আওতাভুক্ত অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ফলে এ ধরনের অপরাধে সংশ্লিষ্ট আইনের অধীনেও বিচার করা যাবে।

আদালতকে অপরাধে ব্যবহৃত ব্যাংক হিসাব, এমএফএস অ্যাকাউন্ট, ডিজিটাল ওয়ালেট, ক্রিপ্টো সম্পদ, সার্ভার, ডোমেইন, সিম, মোবাইল ফোন, কম্পিউটারসহ সংশ্লিষ্ট সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে জুয়ার আসর হিসেবে ব্যবহৃত ভবন, অফিস, কল সেন্টার, সার্ভার অবকাঠামো বা অন্যান্য সম্পত্তিও আদালতের নির্দেশে জব্দ করা যাবে।

বিজ্ঞাপন

কোনো কোম্পানি, করপোরেট প্রতিষ্ঠান, ডিজিটাল গ্যাম্বলিং প্ল্যাটফর্ম, হোস্টিং প্রোভাইডার বা পেমেন্ট গেটওয়ে এসব অপরাধে জড়িত থাকলে সংশ্লিষ্ট পরিচালক, ব্যবস্থাপক বা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে দায়ী করা যাবে। পাশাপাশি আদালত ওই প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন, লাইসেন্স বা কার্যক্রম স্থগিত কিংবা বাতিলের নির্দেশও দিতে পারবেন।

আইনে আরও বলা হয়েছে, অনলাইন জুয়া ও সাইবার স্পেসে সংঘটিত অপরাধের বিচার হবে সাইবার ট্রাইব্যুনালে। অন্যান্য অপরাধের বিচার হবে ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী। এসব অপরাধকে আমলযোগ্য, জামিন অযোগ্য এবং আপস-অযোগ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। সাব-ইন্সপেক্টর বা তার ঊর্ধ্বতন পদমর্যাদার পুলিশ কর্মকর্তা এসব অপরাধ তদন্ত করবেন।

তদন্তের স্বার্থে আদালতের অনুমতি নিয়ে অভিযুক্তের ব্যাংক হিসাব, এমএফএস অ্যাকাউন্ট, ডিজিটাল ওয়ালেট বা ক্রিপ্টো ওয়ালেট সাময়িকভাবে জব্দ বা ফ্রিজ করার ক্ষমতাও তদন্ত কর্মকর্তাদের দেওয়া হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি জোরদারে সরকারকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডিপ প্যাকেট ইনস্পেকশন (ডিপিআই), ট্রানজ্যাকশন মনিটরিং সিস্টেম, ডেটা অ্যানালিটিক্সসহ আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি জাতীয় ডিজিটাল ব্ল্যাকলিস্ট ডেটাবেজ, এনআইডি-সিম-এমএফএস সংযুক্তি ব্যবস্থা, বায়োমেট্রিক যাচাই ও ফেসিয়াল রিকগনিশন প্রযুক্তি ব্যবহারের বিধানও রাখা হয়েছে।

আইন বাস্তবায়নে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, বিটিআরসি, বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ), নির্বাচন কমিশন, সিআইডি, জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সিসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্স গঠন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, গবেষণা, বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির কার্যক্রম পরিচালনার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন আইন কার্যকর হওয়ার মাধ্যমে ঔপনিবেশিক আমলের ‘প্রকাশ্য জুয়া আইন, ১৮৬৭’ আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল হলো। তবে পুরোনো আইনের অধীনে চলমান মামলা ও বিচারিক কার্যক্রম নতুন আইনের বিধান অনুসারেই অব্যাহত থাকবে।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD