পঞ্চদশ সংশোধনী : হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল শুনানি শুরু

সংবিধানের বহুল আলোচিত পঞ্চদশ সংশোধনী এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলসংক্রান্ত হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে দায়ের করা আপিলের শুনানি শুরু হয়েছে। সোমবার (৬ জুলাই) সকাল পৌনে ১০টার দিকে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগে এ শুনানি শুরু হয়।
বিজ্ঞাপন
আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে অংশ নিচ্ছেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল। অন্যদিকে রিটকারীদের পক্ষে শুনানি করছেন অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির ও ড. শরীফ ভূঁইয়া।
এর আগে গত বছরের ১৩ নভেম্বর হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার অনুমতি (লিভ টু আপিল) দেন আপিল বিভাগ। প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ ওই আদেশ দেন। সে সময় আবেদনকারীদের পক্ষে শুনানি করেন ড. শরীফ ভূঁইয়া এবং রাষ্ট্রপক্ষে অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার অনীক আর হক।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
এরও আগে গত বছরের ৩ নভেম্বর হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিল দায়ের করা হয়। আপিলে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী সম্পূর্ণভাবে বাতিলের আবেদন জানানো হয়। রিটকারী প্রতিষ্ঠান সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারের পক্ষে আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া এ আবেদন করেন।
বিজ্ঞাপন
গত বছরের ১৭ ডিসেম্বর বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ পঞ্চদশ সংশোধনীর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিধানকে সংবিধানবিরোধী ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে সংবিধানে গণভোটের বিধান পুনর্বহালের নির্দেশ দেন আদালত। তবে পুরো পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল করা হয়নি।
রায়ের পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট বলেন, গণতন্ত্র বাংলাদেশের সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর অন্যতম ভিত্তি। অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও প্রভাবমুক্ত নির্বাচনের মাধ্যমেই গণতন্ত্রের বিকাশ ঘটে। কিন্তু দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনগণের প্রকৃত মতামতের প্রতিফলন ঘটেনি এবং জনগণের মধ্যে নিরপেক্ষ নির্বাচনের আস্থা তৈরি হয়নি। আদালতের মতে, এরই ধারাবাহিকতায় জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
রায়ে আরও বলা হয়, জনগণের প্রত্যাশার ভিত্তিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল এবং সময়ের সঙ্গে এটি সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর অংশে পরিণত হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
হাইকোর্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্তিসংক্রান্ত পঞ্চদশ সংশোধনীর ২০ ও ২১ অনুচ্ছেদকে সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ঘোষণা করে বাতিল করেন। আদালতের মতে, এসব বিধান সংবিধানের মৌলিক কাঠামো তথা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
এছাড়া পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংযোজিত সংবিধানের ৭ক, ৭খ এবং ৪৪(২) অনুচ্ছেদও বাতিল ঘোষণা করা হয়। আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, এসব অনুচ্ছেদ সংবিধানের মৌলিক নীতির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
রায়ে উল্লেখ করা হয়, পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে মোট ৫৪টি ক্ষেত্রে সংযোজন, পরিবর্তন ও প্রতিস্থাপন করা হয়েছিল। তবে পুরো সংশোধনী বাতিল না করে আদালত বাকি বিধানগুলো বহাল রাখেন এবং ভবিষ্যতে জাতীয় সংসদ চাইলে জনগণের মতামতের ভিত্তিতে সেগুলো সংশোধন বা পরিবর্তনের সুযোগ থাকবে বলে উল্লেখ করেন।
বিজ্ঞাপন
গণভোট প্রসঙ্গে আদালত বলেন, সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদের অংশ হিসেবে থাকা গণভোটের বিধান বাতিল করা হয়েছিল, যা সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। তাই পঞ্চদশ সংশোধনীর ৪৭ ধারা বাতিল ঘোষণা করে দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বিদ্যমান ১৪২ অনুচ্ছেদ পুনর্বহাল করা হয়।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
হাইকোর্টের রায় ঘোষণার সময় রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদ উদ্দিন উপস্থিত ছিলেন। রিটকারী বদিউল আলম মজুমদারের পক্ষে ড. শরীফ ভূঁইয়া ছাড়াও বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, ইনসানিয়াত বিপ্লব, গণফোরাম এবং বিভিন্ন পক্ষের আইনজীবীরা শুনানিতে অংশ নেন।
মামলার সূত্রপাত হয় গত বছরের ১৯ আগস্ট। ওইদিন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না—তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন হাইকোর্ট। বিচারপতি নাইমা হায়দার ও বিচারপতি শশাঙ্ক শেখর সরকারের বেঞ্চ সুজনের সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারসহ অন্যদের করা রিট আবেদনের শুনানি শেষে এই রুল জারি করেন।
বিজ্ঞাপন
পরবর্তীতে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, ইনসানিয়াত বিপ্লব, গণফোরামসহ আরও কয়েকটি পক্ষ মামলায় ইন্টারভেনর হিসেবে যুক্ত হয়।
উল্লেখ্য, ২০১১ সালের ৩০ জুন জাতীয় সংসদে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী পাস হয়। এই সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্ত করা হয়, শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির জনক হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয় এবং জাতীয় সংসদে নারীদের সংরক্ষিত আসন ৪৫ থেকে বাড়িয়ে ৫০ করা হয়। এছাড়া সংবিধানের বিভিন্ন ধারায় আরও একাধিক সংশোধনী আনা হয়েছিল।








