Logo

আপিল বিভাগের রায়ে ফিরলো গণভোট ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
৯ জুলাই, ২০২৬, ১০:২৪
আপিল বিভাগের রায়ে ফিরলো গণভোট ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা
ছবি: সংগৃহীত

সংবিধানের বহুল আলোচিত পঞ্চদশ সংশোধনীর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান অবৈধ ঘোষণার হাইকোর্টের রায় বহাল রেখেছেন দেশের সর্বোচ্চ আদালত। আপিল বিভাগের এ রায়ের ফলে সংবিধানে গণভোটের বিধান এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা। একই সঙ্গে পঞ্চদশ সংশোধনীর কয়েকটি ধারা সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে আদালতের পর্যবেক্ষণও বহাল থাকল।

বিজ্ঞাপন

বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) সকালে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের আপিল বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন। হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে দায়ের করা আপিল খারিজ করে দেন আদালত। ফলে পূর্বের রায় কার্যকর থাকছে।

রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে অংশ নেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল। রিটকারীদের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া। এছাড়া জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে আদালতে বক্তব্য উপস্থাপন করেন অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির।

রায় ঘোষণার পর আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া এবং অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির এ সিদ্ধান্তকে ‘ঐতিহাসিক’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই রায়ের মাধ্যমে সংবিধানের গুরুত্বপূর্ণ দুটি বিধান—গণভোট এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা—আবারও কার্যকর হওয়ার পথ সুগম হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

এর আগে গত ৮ জুলাই টানা তিন দিনের শুনানি শেষে আপিল বিভাগ রায়ের জন্য ৯ জুলাই দিন নির্ধারণ করেছিলেন। শুনানিতে পঞ্চদশ সংশোধনীর বিভিন্ন ধারার সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে বিস্তারিত যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করা হয়।

বিজ্ঞাপন

এরও আগে গত বছরের ১৩ নভেম্বর হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার অনুমতি দিয়েছিলেন আপিল বিভাগ। পরে গত ৩ নভেম্বর রিটকারীদের পক্ষ থেকে লিভ টু আপিল দাখিল করা হয়। এতে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর পুরোটা বাতিলের আবেদন জানানো হয়েছিল। আবেদনটি করেন সুজনের সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারের পক্ষে আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া।

উল্লেখ্য, গত বছরের ১৭ ডিসেম্বর হাইকোর্ট সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর কয়েকটি ধারা অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেন। একই সঙ্গে সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী গণভোটের বিধান পুনর্বহাল করা হয়। তবে আদালত পুরো পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল করেননি; কেবল সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক বিবেচিত কয়েকটি ধারা বাতিল ঘোষণা করেন।

রায়ের পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট বলেন, গণতন্ত্র সংবিধানের মৌলিক ভিত্তির অন্যতম অংশ এবং অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও প্রভাবমুক্ত নির্বাচনের মাধ্যমেই গণতন্ত্রের বিকাশ ঘটে। আদালতের মতে, দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক কয়েকটি জাতীয় নির্বাচনে জনগণের প্রকৃত ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটেনি এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রতি মানুষের আস্থা দুর্বল হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

হাইকোর্ট আরও পর্যবেক্ষণ দেন যে, জনগণের প্রত্যাশার ভিত্তিতে সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল এবং সময়ের সঙ্গে এটি সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর অংশে পরিণত হয়েছে। সেই কারণে এ ব্যবস্থা বিলুপ্ত করার বিধান সংবিধানের মৌলিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ ওই রায়ে পঞ্চদশ সংশোধনীর ২০ ও ২১ অনুচ্ছেদ বাতিল ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে সংশোধনীর মাধ্যমে যুক্ত হওয়া ৭ক, ৭খ এবং ৪৪(২) অনুচ্ছেদও সংবিধানবিরোধী বলে ঘোষণা করা হয়।

আদালত তার রায়ে উল্লেখ করেন, পঞ্চদশ সংশোধনীর সব বিধান বাতিল করা হচ্ছে না। যেসব বিধান বাতিল করা হয়নি, সেগুলো ভবিষ্যতে জাতীয় সংসদ প্রয়োজন অনুযায়ী জনগণের মতামতের ভিত্তিতে সংশোধন, পরিমার্জন বা পরিবর্তন করতে পারবে।

বিজ্ঞাপন

গণভোটের বিষয়ে আদালত বলেন, সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদের অংশ হিসেবে থাকা গণভোটের বিধান বাতিল করা হয়েছিল পঞ্চদশ সংশোধনীর ৪৭ ধারার মাধ্যমে। কিন্তু এই বিধান সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ায় তা বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে দ্বাদশ সংশোধনীর অধীনে বিদ্যমান গণভোটের ব্যবস্থা পুনরায় কার্যকর হয়েছে।

এ ছাড়া ৭ক ও ৭খ অনুচ্ছেদেও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে। ৭ক অনুচ্ছেদে সংবিধান বাতিল, স্থগিত বা লঙ্ঘনকে বিশেষ অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। আর ৭খ অনুচ্ছেদে সংবিধানের মৌলিক বিধান সংশোধনের অযোগ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। আদালত এ দুটি অনুচ্ছেদকেও বাতিল ঘোষণা করেছেন। একই সঙ্গে ৪৪(২) অনুচ্ছেদ, যা মৌলিক অধিকার বাস্তবায়ন সংক্রান্ত বিচারিক এখতিয়ার নিয়ে ছিল, সেটিও বাতিল করা হয়েছে।

এই মামলার সূত্রপাত হয় গত বছরের ১৯ আগস্ট, যখন হাইকোর্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে আনা সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না—সে বিষয়ে রুল জারি করেন। বিচারপতি নাইমা হায়দার ও বিচারপতি শশাঙ্ক শেখর সরকারের বেঞ্চ ওই রুল জারি করেন। পরে মামলায় বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, গণফোরামসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তি পক্ষভুক্ত হন।

বিজ্ঞাপন

উল্লেখ্য, ২০১১ সালের ৩০ জুন জাতীয় সংসদে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী পাস হয়। ওই সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্ত করা হয়। একই সঙ্গে সংরক্ষিত নারী আসনের সংখ্যা ৪৫ থেকে ৫০-এ উন্নীত করা হয় এবং সংবিধানের আরও বিভিন্ন অনুচ্ছেদে পরিবর্তন আনা হয়। সর্বশেষ আপিল বিভাগের রায়ের মধ্য দিয়ে সেই সংশোধনীর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিধানের সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে দীর্ঘদিনের আইনি বিতর্কে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD