পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে আপিল বিভাগের রায় বৃহস্পতিবার

সংবিধানের বহুল আলোচিত পঞ্চদশ সংশোধনী, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল এবং সংশোধনীর কয়েকটি বিধান অবৈধ ঘোষণার বিষয়ে হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের বিরুদ্ধে করা আপিলের শুনানি শেষ হয়েছে। এ মামলার ওপর বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) রায় ঘোষণা করবেন দেশের সর্বোচ্চ আদালতের আপিল বিভাগ।
বিজ্ঞাপন
বুধবার (৮ জুলাই) প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ টানা তিন দিনের শুনানি শেষে রায়ের জন্য আগামী বৃহস্পতিবার দিন নির্ধারণ করেন। ফলে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত এই সাংবিধানিক মামলার নিষ্পত্তির দিকে এখন সবার নজর।
রাষ্ট্রের পক্ষে আদালতে শুনানিতে অংশ নেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল। রিটকারীর পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে আদালতে বক্তব্য উপস্থাপন করেন অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির।
এর আগে গত বছরের ১৩ নভেম্বর হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিল করার অনুমতি দেয় আপিল বিভাগ। ওই আদেশ দেন প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ। সে সময় আবেদনকারীর পক্ষে শুনানি করেন ড. শরীফ ভূঁইয়া এবং রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার অনীক আর হক।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
এরও আগে গত ৩ নভেম্বর হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিল দায়ের করা হয়। রিটকারী সুজনের সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারের পক্ষে ওই আবেদন করেন আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া। আপিলে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী সম্পূর্ণ বাতিলের আবেদন জানানো হয়।
গত বছরের ১৭ ডিসেম্বর হাইকোর্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলসহ পঞ্চদশ সংশোধনীর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিধানকে সংবিধানবিরোধী ঘোষণা করে রায় দেন। একইসঙ্গে সংবিধানে গণভোটের বিধান পুনর্বহালের নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে আদালত পুরো পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল করেননি।
বিজ্ঞাপন
রায়ের পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট বলেন, গণতন্ত্র বাংলাদেশের সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং এই গণতন্ত্রের প্রকৃত বিকাশ ঘটে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও প্রভাবমুক্ত নির্বাচনের মাধ্যমে। আদালতের মতে, দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনগণের ইচ্ছার যথাযথ প্রতিফলন ঘটেনি এবং নির্বাচনব্যবস্থার প্রতি জনআস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলেও পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করা হয়।
হাইকোর্ট আরও বলেন, জনগণের প্রত্যাশার ভিত্তিতেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল এবং সময়ের সঙ্গে এটি সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর অংশে পরিণত হয়েছে।
বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ ওই রায় ঘোষণা করেন। রায়ে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে যুক্ত ২০ ও ২১ অনুচ্ছেদ, যা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্তির সঙ্গে সম্পর্কিত, সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর পরিপন্থী ঘোষণা করে বাতিল করা হয়।
বিজ্ঞাপন
এছাড়া পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে যুক্ত সংবিধানের ৭ক, ৭খ এবং ৪৪(২) অনুচ্ছেদও অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হয়। আদালতের মতে, এসব বিধান সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
তবে আদালত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, পঞ্চদশ সংশোধনী আইন পুরোপুরি বাতিল করা হয়নি। যেসব বিধান বহাল রয়েছে, সেগুলো ভবিষ্যতে জাতীয় সংসদ জনগণের মতামত বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী সংশোধন, পরিমার্জন বা পরিবর্তন করতে পারবে। এর মধ্যে জাতির পিতা-সংক্রান্ত স্বীকৃতি এবং ২৬ মার্চের ভাষণ সম্পর্কিত বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
গণভোটের বিষয়ে আদালত বলেন, সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদে থাকা গণভোটের বিধান বাতিল করা হয়েছিল পঞ্চদশ সংশোধনীর ৪৭ ধারার মাধ্যমে। আদালতের মতে, এই পরিবর্তন সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ায় তা বাতিলযোগ্য। ফলে দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বিদ্যমান ১৪২ অনুচ্ছেদের বিধান পুনর্বহাল করা হয়।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
এদিকে সংবিধানের ৭ক অনুচ্ছেদে সংবিধান বাতিল, স্থগিত বা লঙ্ঘনের অপরাধের বিষয় এবং ৭খ অনুচ্ছেদে সংবিধানের মৌলিক বিধান সংশোধন-অযোগ্য হিসেবে উল্লেখ ছিল। এছাড়া ৪৪(২) অনুচ্ছেদে সংসদের মাধ্যমে অন্য আদালতকে মৌলিক অধিকার বাস্তবায়নের ক্ষমতা দেওয়ার বিধান ছিল। আদালত এসব বিধানও অসাংবিধানিক ঘোষণা করেন।
এই মামলার সূত্রপাত হয় গত বছরের ১৯ আগস্ট। সেদিন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে আনা পঞ্চদশ সংশোধনী কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না—তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন হাইকোর্ট। বিচারপতি নাইমা হায়দার ও বিচারপতি শশাঙ্ক শেখর সরকারের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ সুজনের সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারসহ কয়েকজনের রিট আবেদনের শুনানি শেষে ওই রুল জারি করেন।
পরবর্তীতে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার মামলায় পক্ষভুক্ত হন। এছাড়া ইনসানিয়াত বিপ্লব, গণফোরামসহ আরও কয়েকজন আবেদনকারী ইন্টারভেনর হিসেবে মামলায় যুক্ত হন।
বিজ্ঞাপন
উল্লেখ্য, ২০১১ সালের ৩০ জুন জাতীয় সংসদে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী পাস হয়। এই সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্ত করা হয়, নারীদের জন্য সংরক্ষিত সংসদীয় আসন ৪৫ থেকে বাড়িয়ে ৫০ করা হয় এবং সংবিধানের বিভিন্ন ধারায় আরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়। এখন সেই সংশোধনীর বৈধতা নিয়ে আপিল বিভাগের চূড়ান্ত রায়ের অপেক্ষায় রয়েছে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ।








