Logo

রংপুরের চার হত্যায় আদালতের জবানবন্দিতে মিলল নতুন তথ্য

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
২৫ আগস্ট, ২০২৬, ১৯:৪৪
রংপুরের চার হত্যায় আদালতের জবানবন্দিতে মিলল নতুন তথ্য
ছবি: সংগৃহীত

রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ তাঁর পরিবারের চার সদস্য হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আদালতে দেওয়া আসামিদের জবানবন্দিতে নতুন তথ্য উঠে এসেছে। ১৬৪ ধারায় দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে আসামিরা জানিয়েছে, প্রথমে বাড়ির ছাদে গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থীকে হত্যা করা হয়। পরে দোতলার ঘরে ঢুকে ঘুম থেকে জেগে থাকা ছেলে আয়ুস চক্রবর্তী প্রিয়মকেও হত্যা করা হয়।

বিজ্ঞাপন

মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) দুপুরে আদালতের সংশ্লিষ্ট সূত্র, তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও পুলিশের বিভিন্ন সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

এর আগে রবিবার (২৩ আগস্ট) সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার আবদুল মাবুদ জানিয়েছিলেন, মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস পাশের ভবনের ছাদ দিয়ে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে উঠেছিলেন। সেখানে ইয়াবা সেবনের সময় গণপতি চক্রবর্তী তাঁদের দেখে ফেলেন। পরিচয় গোপন রাখতে তাঁকে গামছা দিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। পরে স্ত্রী ও মেয়েকেও একইভাবে হত্যা করা হয়। সর্বশেষ ঘুমন্ত অবস্থায় ছেলে প্রিয়মকে কাপড় ও বালিশ দিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয় বলে পুলিশ জানিয়েছিল।

তবে আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে আসামিরা ঘটনার বিষয়ে আরও বিস্তারিত তথ্য দিয়েছে বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

জবানবন্দি অনুযায়ী, শুক্রবার (২১ আগস্ট) ভোররাতে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ পাশের একটি বাসার ছাদ থেকে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির দোতলার ছাদে যায়। পানির ট্যাংকের পাশে বসে তারা ইয়াবা সেবন করছিল। একপর্যায়ে ভোর হয়ে গেলে গণপতি চক্রবর্তী সেখানে উপস্থিত হয়ে তাদের মাদক সেবনে বাধা দেন।

এ সময় দুজন মিলে গণপতির সঙ্গে থাকা গামছা দিয়ে তাঁকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে মরদেহ ছাদের এক পাশে রেখে টিন দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়।

গণপতির সঙ্গে ধস্তাধস্তি ও চিৎকারের শব্দ পেয়ে তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী এবং মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী ছাদে চলে আসেন বলে আসামিরা জানিয়েছে। তখন মুগ্ধ প্রীতিলতার গলায় গামছা পেঁচিয়ে ধরেন এবং সিদ্ধার্থ প্রার্থীর গলা ও মুখ চেপে ধরেন।

বিজ্ঞাপন

প্রীতিলতাকে হত্যার পর দুজন মিলে গামছা ও রশি ব্যবহার করে প্রার্থীকেও শ্বাসরোধে হত্যা করে। পাশের ভবন থেকে মরদেহ দেখা যাওয়ার আশঙ্কায় মা ও মেয়ের মরদেহ সিঁড়ির কাছে সরিয়ে রাখা হয় বলে জবানবন্দিতে বলা হয়েছে।

এরপর নিচতলায় গিয়ে তারা আয়ুস চক্রবর্তী প্রিয়মকে দেখতে পায়। ঘুম থেকে জেগে বিছানায় বসে থাকা প্রিয়ম সিদ্ধার্থকে চিনে ফেলায় তাকেও হত্যা করা হয় বলে আসামিদের জবানবন্দিতে উঠে এসেছে।

বাড়িতে সিসি ক্যামেরা থাকার সন্দেহে সিদ্ধার্থ নিচতলায় নেমে বৈদ্যুতিক মিটারের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে বলে সূত্র জানিয়েছে। এরপর দুজন সেখানে গোসল করে এবং আরও ইয়াবা সেবন করে। এ সময় খেজুর ও শসা খাওয়ার কথাও জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছে তারা।

বিজ্ঞাপন

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, হত্যাকাণ্ডকে ভিন্ন দিকে নেওয়ার জন্য পরে ডাকাতির ঘটনা সাজানোর চেষ্টা করা হয়। ঘরের বিভিন্ন জিনিসপত্র এলোমেলো করা হয়। এরপর বাড়ি থেকে কিছু স্বর্ণালংকার ও ১৫ হাজার টাকা নিয়ে জুমার নামাজের সময় ছাদ দিয়ে বেরিয়ে যায় তারা।

সূত্রের দাবি, ১৫ হাজার টাকা মুগ্ধের কাছে ছিল। অন্যদিকে সিদ্ধার্থ কিছু স্বর্ণালংকার প্রতিবেশী পূর্ণিমার বাড়ির পাশে মাটিতে পুঁতে রাখে। পেশায় স্বর্ণকার সিদ্ধার্থ পরে ওই স্বর্ণের কিছু অংশ পরীক্ষা করে দেখার চেষ্টা করে বলেও জানা গেছে।

যেভাবে উদ্ধার হয় চার মরদেহ

বিজ্ঞাপন

রংপুর জিলা স্কুলের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে অবসরে যান। অবসরের পর তিনি হোমিওপ্যাথি চিকিৎসাও করতেন। নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকায় নিজ জমিতে নির্মিত দোতলা বাড়ির দ্বিতীয় তলায় প্রায় দুই থেকে তিন বছর ধরে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বসবাস করছিলেন তিনি।

গত শনিবার রাতে ওই বাড়ি থেকে গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল (৬৫), তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী বালা (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী (২৫) এবং ছেলে আয়ুস চক্রবর্তী প্রিয়মের (১২) মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, চারজনকেই শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে।

এ ঘটনায় রবিবার ভোরে মুগ্ধ দাস (২৩) ও সিদ্ধার্থ দাস (১৯) নামে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। মুগ্ধ নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকার কানুদাসের ছেলে এবং সিদ্ধার্থ একই এলাকার বিনয়চন্দ্র দাসের ছেলে।

বিজ্ঞাপন

রবিবার দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার (ডিআইজি) আবদুল মাবুদ জানিয়েছিলেন, বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে গণপতি চক্রবর্তী ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যা করা হয়েছে।

ময়নাতদন্ত শেষে রবিবার বিকেলে চারজনের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে রাত সাড়ে ১০টার দিকে নগরীর দখিগঞ্জ শ্মশানে তাঁদের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD