Logo

৯ লাখ টাকার আপস কি শেষ করবে বারিধারার দুর্ঘটনা মামলা?

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১৭:১০
৯ লাখ টাকার আপস কি শেষ করবে বারিধারার দুর্ঘটনা মামলা?
ছবি: সংগৃহীত

বারিধারায় নির্মাণশ্রমিক মেহেদী হাসান মীম নিহত হওয়ার ঘটনায় ৯ লাখ টাকার সমঝোতার দাবি সামনে আসার পর প্রশ্ন উঠেছে—নিহতের পরিবারের সঙ্গে আর্থিক সমঝোতা হলেই কি ফৌজদারি মামলার কার্যক্রম শেষ হয়ে যাবে? আইন ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য বলছে, শুধু ব্যক্তিগত সমঝোতার মাধ্যমে এমন মামলা স্বয়ংক্রিয়ভাবে শেষ হয় না।

বিজ্ঞাপন

২২ সেপ্টেম্বর বিকেলে ঢাকার বারিধারা ডিপ্লোমেটিক জোনের ১ নম্বর সড়কের ফুটপাতে বসে থাকা ২৪ বছর বয়সী নির্মাণশ্রমিক মেহেদী হাসান মীমকে একটি দ্রুতগতির প্রাইভেটকার চাপা দেয়। গুরুতর অবস্থায় তাকে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

ঘটনার পর মেহেদীর বড় ভাই মোক্তাদীর ইসলাম গুলশান থানায় মামলা করেন। মামলায় প্রথমে আকাশ মারককে চালক হিসেবে উল্লেখ করা হয়। পরে পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজ ও অন্যান্য তথ্য পর্যালোচনা করে ১৭ বছর বয়সী এক কিশোরের গাড়ি চালানোর সঙ্গে সম্পৃক্ততার প্রাথমিক তথ্য পাওয়ার কথা জানায়। আদালত পরে ওই কিশোরকে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

এদিকে কিশোরের আইনজীবী মো. আলমগীর হোসেন দাবি করেন, মেহেদীর পরিবারের সঙ্গে ৯ লাখ টাকার সমঝোতা হয়েছে। এর মধ্যে দাফন-কাফনের জন্য ১ লাখ এবং মেহেদীর বৃদ্ধ বাবা-মায়ের ভবিষ্যতের কথা বিবেচনায় আরও ৮ লাখ টাকা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। মেহেদীর ভাইও সমঝোতার কথা স্বীকার করেছেন, তবে টাকার অঙ্ক নিশ্চিত করেননি।

১০৫ ধারায় কী বলা আছে

বিজ্ঞাপন

সড়ক পরিবহণ আইন, ২০১৮-এর ১০৫ ধারায় মোটরযান চালনাজনিত দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত বা প্রাণহানির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট অপরাধের বিধান রয়েছে। বেপরোয়া বা অবহেলাজনিত মোটরযান চালনার কারণে মৃত্যু বা গুরুতর আহতের ঘটনায় সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড, সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।

তাই নিহতের পরিবারের সঙ্গে আর্থিক সমঝোতা হয়েছে—এ তথ্য একাই ফৌজদারি দায় শেষ করে না। অপরাধটি আইনত আপসযোগ্য কি না, সেটিই এখানে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

আদালতে আপসের নতুন বিধান কী বলে

বিজ্ঞাপন

২০২৬ সালের ফৌজদারি কার্যবিধি সংশোধনে ৩৪৫ ধারায় নতুন উপধারা যুক্ত হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, উভয়পক্ষ কোনো আপসযোগ্য মামলায় সম্মত হলে আদালত আপসের প্রক্রিয়া সহজ করতে বা সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে আইনি সহায়তার মাধ্যমে সমঝোতায় যেতে সহায়তা করতে পারেন। অর্থাৎ এই বিধান সব ধরনের ফৌজদারি মামলায় ব্যক্তিগত সমঝোতার মাধ্যমে মামলা শেষ করার সুযোগ দেয় না।

বারিধারার ঘটনায় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীও বলেছেন, সড়ক পরিবহণ আইনে দায়ের হওয়া এ ধরনের মামলা ব্যক্তিগত সমঝোতার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা যায় না। তদন্ত কর্মকর্তাও জানিয়েছেন, সমঝোতার বিষয়টি তদন্তে প্রভাব ফেলবে না এবং পুলিশ তাদের তদন্ত চালিয়ে যাবে।

তদন্ত চলবে কীভাবে

বিজ্ঞাপন

পুলিশের তদন্তে দুর্ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তদন্ত কর্মকর্তার আদালতে দেওয়া আবেদনে বলা হয়েছে, ফুটেজে দুর্ঘটনার পর কিশোরকে চালকের আসনের দিকের দরজা দিয়ে বের হতে দেখা যায় এবং তার সম্পৃক্ততার বিষয়ে প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে। তদন্ত এখনো চলমান।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

ফলে সমঝোতার দলিল থাকলেও পুলিশকে দুর্ঘটনার প্রকৃত পরিস্থিতি, গাড়িটি কে চালাচ্ছিলেন, চালনার ধরন কেমন ছিল এবং দুর্ঘটনার জন্য আইনগত দায় কার—এসব বিষয় তদন্ত করতে হবে। শেষ পর্যন্ত মামলার গতিপথ নির্ভর করবে তদন্ত, প্রমাণ এবং আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর।

৯ লাখ টাকা দেওয়া মানেই মামলা শেষ নয়

নিহতের পরিবারকে অর্থ দেওয়া এবং ফৌজদারি মামলা নিষ্পত্তি—দুটি আলাদা বিষয়। ৯ লাখ টাকা দেওয়া হয়ে থাকলে সেটি পরিবারকে আর্থিক সহায়তা বা ক্ষতিপূরণের একটি ব্যবস্থা হতে পারে। কিন্তু কোনো পক্ষ নিজেদের মধ্যে একটি চুক্তিকে ‘আপস’ বললেই সেটি ফৌজদারি কার্যবিধির অর্থে আপসযোগ্য মামলায় রূপ নেয় না।

বিজ্ঞাপন

এ ঘটনায় মেহেদীর পরিবারের সঙ্গে সমঝোতার দাবি থাকলেও, মামলার তদন্ত ও আদালতের কার্যক্রম যে আলাদাভাবে চলতে পারে, সেটিই বর্তমানে সংশ্লিষ্ট পুলিশ ও রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD