সংসদে আ.লীগ আমলে অর্থনীতি ধ্বংসের যে চিত্র তুলে ধরলেন অর্থমন্ত্রী

আওয়ামী লীগ সরকারের ১৬ বছরের শাসনামলে সীমাহীন দুর্নীতি ও লুটপাটের কারণে অর্থনীতি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছিল বলে অভিযোগ করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
বিজ্ঞাপন
শুক্রবার (১০ এপ্রিল) জাতীয় সংসদে ৩০০ বিধির আলোচনায় বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এ মন্তব্য করেন। একই সঙ্গে তিনি বিভিন্ন সময়ের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সূচকের তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরেন।
আরও পড়ুন: আজকের মুদ্রার দর : ১০ এপ্রিল ২০২৬
অর্থমন্ত্রী বলেন, বর্তমান বিএনপি সরকার অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেছে এবং পূর্ববর্তী সরকারের কাঠামোগত ব্যর্থতা থেকে অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
তিনি জানান, সংসদে বিএনপির সর্বশেষ ২০০৫-০৬ অর্থবছর, আওয়ামী লীগের ২০২৩-২৪ অর্থবছর এবং অন্তর্বর্তী সরকারের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বিভিন্ন অর্থনৈতিক সূচক বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা হয়।
অর্থনীতিতে ‘ধ্বংসাত্মক প্রভাব’ ও নীতিগত ব্যর্থতা : দীর্ঘ ১৬ বছরে ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়ন্ত্রিত লুটপাটের ফলে অর্থনীতি, সামাজিক কাঠামো ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে। তার ভাষায়, বিএনপির সময়ে গৃহীত জনকল্যাণমুখী নীতির ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়ে অর্থনীতি ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যায়।
সামষ্টিক অর্থনীতির তুলনা : ২০০৫-০৬ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ১৭ শতাংশ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি কমে ৪ দশমিক ২২ শতাংশে নেমে আসে, আর মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়ায় ৯ দশমিক ৭৩ শতাংশে।
বিজ্ঞাপন
তার দেওয়া তথ্যে বলা হয়, একই সময়ে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি ১০ দশমিক ৬৬ শতাংশ থেকে ৩ দশমিক ৫১ শতাংশে এবং কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ৭৭ শতাংশ থেকে ৩ দশমিক ৩০ শতাংশে নেমে আসে।
কর্মসংস্থান ও কাঠামোগত সংকট : শিল্প ও সেবা খাতে কর্মসংস্থান না বাড়ায় শ্রমশক্তি কৃষি খাতে অতিরিক্তভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এতে ‘ছদ্ম বেকারত্ব’ বৃদ্ধি পায় এবং উৎপাদনশীলতা কমে যায়।
তার মতে, কৃষি খাত বর্তমানে মোট মূল্য সংযোজনের ১১ দশমিক ৬ শতাংশ হলেও মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৪১ শতাংশ সেখানে যুক্ত—যা শ্রমবাজারের কাঠামোগত দুর্বলতার প্রতিফলন।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন: এলএনজি-এলপিজি নিয়ে দেশে আসছে আরও ৫ জাহাজ
সঞ্চয়–বিনিয়োগ ও বহিঃখাত চাপ : ২০০১-০৬ সালে সঞ্চয় ছিল জিডিপির ২৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ এবং বিনিয়োগ ২৮ দশমিক ৭৫ শতাংশ। ২০২৩-২৪ সালে বিনিয়োগ বেড়ে ৩০ দশমিক ৭০ শতাংশ হলেও সঞ্চয় কমে ২৮ দশমিক ৪২ শতাংশে নামে। ফলে ঘাটতি পূরণে বৈদেশিক উৎসের ওপর নির্ভরতা বাড়ে বলে জানান তিনি।
টাকার মান ও মূল্যস্ফীতি : ২০০৫-০৬ সালে ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার ছিল ৬৭ দশমিক ২ টাকা। ২০২৩-২৪ সালে তা বেড়ে ১১১ টাকা এবং ২০২৪-২৫ সালে ১২১ টাকায় পৌঁছায়। এতে আমদানি ব্যয় বেড়ে মূল্যস্ফীতিও তীব্র হয়।
বিজ্ঞাপন
ব্যাংকিং ও ঋণ পরিস্থিতি : ২০০৫ সালে খেলাপি ঋণ ছিল ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ, যা ২০২৪ সালে বেড়ে ২০ দশমিক ২০ শতাংশে পৌঁছায়। একই সময়ে মূলধন পর্যাপ্ততার হার ৭ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে কমে ৩ দশমিক ০৮ শতাংশে নেমে আসে।
তার ভাষায়, এটি ব্যাংকিং খাতের গভীর সংকট এবং দুর্বল ব্যবস্থাপনার ফল।
রাজস্ব, ঋণ ও বাজেট ঘাটতি : ২০০৫-০৬ সালে বাজেট ঘাটতি ছিল জিডিপির ২ দশমিক ৯ শতাংশ, যা ২০২৩-২৪ সালে বেড়ে ৪ দশমিক ০৫ শতাংশে দাঁড়ায়। একই সঙ্গে সুদ পরিশোধ ৮৫ বিলিয়ন টাকা থেকে বেড়ে ১ হাজার ১৪৭ বিলিয়ন টাকায় পৌঁছায়।
বিজ্ঞাপন
বৈষম্য ও সামাজিক সূচক : আয় বৈষম্য উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। জিনি কোফিশিয়েন্ট ২০০৫ সালের ০ দশমিক ৪৬৭ থেকে ২০২২ সালে ০ দশমিক ৪৯৯-এ পৌঁছায়। ধনী-দরিদ্রের আয়ের ব্যবধানও বহুগুণ বেড়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সামাজিক সুরক্ষা ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা : সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে দলীয়করণ ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে পড়ায় সুশাসন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
রিজার্ভ ও বৈদেশিক খাত : ২০০৫-০৬ সালে রিজার্ভ ছিল ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। ২০২৩-২৪ সালে তা কমে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে রেমিট্যান্স বৃদ্ধির ফলে রিজার্ভ ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৩৩ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে।








