Logo

বৈশ্বিক চাপ ও অভ্যন্তরীণ সংকটে কমছে পোশাক রপ্তানি

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
১১ এপ্রিল, ২০২৬, ১৯:১৬
বৈশ্বিক চাপ ও অভ্যন্তরীণ সংকটে কমছে পোশাক রপ্তানি
ছবি: সংগৃহীত

দেশের তৈরি পোশাক খাত বর্তমানে এক কঠিন সময় পার করছে। প্রধান দুই রপ্তানি বাজার যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) উল্লেখযোগ্য হারে রপ্তানি কমে যাওয়ায় সামগ্রিক অর্থনীতিতেও তার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসের চিত্র বলছে, খাতটি একধরনের চাপে রয়েছে এবং সামনে টিকে থাকতে নতুন কৌশল গ্রহণ এখন সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিজ্ঞাপন

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়ে দেশের পোশাক রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৮.৫৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫.৫১ শতাংশ কম। এই পতন শুধু একটি খাতেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং দেশের সামগ্রিক পণ্য রপ্তানিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির সবচেয়ে বড় অংশ যায় ইউরোপীয় ইউনিয়নে, যা মোট রপ্তানির প্রায় অর্ধেক। তবে এই বাজারেই এবার বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। ইউরোপে রপ্তানি কমে দাঁড়িয়েছে ১৪.২ বিলিয়ন ডলারে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ইউরোপীয় দেশগুলোতে ভোক্তাদের ব্যয় সংকোচন এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তাই এর পেছনে প্রধান কারণ।

বিজ্ঞাপন

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র, যা বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাজার, সেখানেও রপ্তানি কমে ৫.৫৯ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। যদিও বাজারটি তুলনামূলক স্থিতিশীল, তবুও ক্রেতাদের চাহিদার ধরনে পরিবর্তনের ইঙ্গিত স্পষ্ট।

যুক্তরাজ্যের বাজারেও সামান্য পতন লক্ষ্য করা গেছে, যেখানে রপ্তানি কমেছে ১.৬১ শতাংশ। তবে কানাডার বাজারে পরিস্থিতি প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে।

শুধু প্রচলিত বাজার নয়, নতুন বা অপ্রচলিত বাজারেও রপ্তানি হ্রাস পেয়েছে। এই বাজারগুলোতে রপ্তানি কমেছে ৮.০৫ শতাংশ, যা বৈশ্বিক চাহিদার সামগ্রিক পরিবর্তনেরই প্রতিফলন।

বিজ্ঞাপন

পণ্যের ধরনেও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। নিটওয়্যার রপ্তানি কমেছে ৬.৪২ শতাংশ এবং ওভেন পণ্যে কমেছে ৪.৪৮ শতাংশ। এতে বোঝা যায়, বাজার এখন আগের মতো নয়—চাহিদা বদলাচ্ছে, আর সেই সঙ্গে বদলাতে হচ্ছে উৎপাদন কৌশলও।

বাংলাদেশের মোট পণ্য রপ্তানির ৮০ শতাংশের বেশি আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। ফলে এই খাতে যে কোনো পতন সরাসরি দেশের সামগ্রিক রপ্তানি আয়ে প্রভাব ফেলে।

চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে মোট পণ্য রপ্তানি হয়েছে ৩ হাজার ৫৩৯ কোটি ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪.৮৫ শতাংশ কম। গত বছর এই সময়ে রপ্তানি হয়েছিল ৩ হাজার ৭১৯ কোটি ডলারের পণ্য।

বিজ্ঞাপন

খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করছে। পবিত্র ঈদুল ফিতরের দীর্ঘ ছুটিতে কারখানাগুলো ৮ থেকে ১০ দিন বন্ধ থাকায় উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা যায়নি। এর প্রভাব পড়েছে রপ্তানি প্রক্রিয়ায়।

এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি এখনো পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা যায়নি। ট্রাম্প প্রশাসনের সময় শুরু হওয়া এই নীতির প্রভাব এখনো ক্রয়াদেশে পড়ছে। একই সঙ্গে ইউরোপীয় বাজারেও এর প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে।

চীনের আগ্রাসী মূল্য প্রতিযোগিতাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ শুল্ক এড়াতে চীন ইউরোপীয় বাজারে তুলনামূলক কম দামে পণ্য সরবরাহ করছে, ফলে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশ।

বিজ্ঞাপন

খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতি শুধু সংকট নয়, বরং পরিবর্তনেরও ইঙ্গিত দিচ্ছে। তাদের মতে, এখন আর শুধু কম দামে পণ্য সরবরাহ করলেই হবে না; বরং গুণগত মান, ডিজাইনের বৈচিত্র্য এবং টেকসই উৎপাদনের দিকে গুরুত্ব দিতে হবে।

জ্বালানি সংকট, বিশেষ করে ডিজেলের ঘাটতি, অনেক কারখানার উৎপাদন ব্যাহত করছে। তাই শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপর জোর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিজ্ঞাপন

একই সঙ্গে নতুন বাজার খোঁজা, উৎপাদনে প্রযুক্তি ব্যবহার বাড়ানো এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে সক্ষমতা বৃদ্ধি—এসব বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন তারা।

বর্তমান পরিস্থিতি নিঃসন্দেহে চ্যালেঞ্জিং। তবে খাত সংশ্লিষ্টদের বিশ্বাস, সঠিক পরিকল্পনা, বাজার বিশ্লেষণ এবং কার্যকর কৌশল গ্রহণ করতে পারলে তৈরি পোশাক শিল্প আবার ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হবে। বৈশ্বিক পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেদের রূপান্তর করতে পারলেই এই খাত আবারও দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে দৃঢ় অবস্থান ধরে রাখতে পারবে।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD