আমরা অনেক প্ল্যান করি, বাস্তবায়ন করি না: বিডা চেয়ারম্যান

দেশে বিনিয়োগ প্রবাহ বাড়াতে এখনই নীতিগত ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে বড় ধরনের গতি পরিবর্তন প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী। তিনি বলেন, আমরা অনেক প্ল্যান করি, অনেক কথা বলি, অনেক সুন্দর সুন্দর রিপোর্ট বের হয় এবং সেই রিপোর্টের সঙ্গে আমরা একমত পোষণ করি। একমত পোষণ করার পর গিয়ে দেখা যায় যে, আমরা আসলে ওই রিপোর্টে যেই কথাগুলো বলা হয়েছে ওগুলো বাস্তবায়ন করি না।
বিজ্ঞাপন
সোমবার (২৭ এপ্রিল) সকালে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিডা ভবনে আয়োজিত ‘আঙ্কটাড ইনভেস্টমেন্ট পলিসি রিভিউ ইমপ্লিমেন্টেশন রিপোর্ট ফর বাংলাদেশ’ প্রকাশ অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে আশিক চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়াতে কেবল নতুন পরিকল্পনা করলেই হবে না, বাস্তবে তা কার্যকর করার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। তিনি বলেন, দেশে নিয়মিত নানা পরিকল্পনা নেওয়া হয়, বিস্তৃত আলোচনা হয়, মানসম্মত প্রতিবেদনও তৈরি হয়। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন বাস্তবায়নের পর্যায়ে গিয়ে দেখা যায় সুপারিশগুলোর বড় অংশ আর কার্যকর হয় না। তার ভাষায়, পরিকল্পনা ও বাস্তবতার এই ব্যবধানই বিনিয়োগ অগ্রগতির বড় বাধা।
আরও পড়ুন: আজকের মুদ্রার দর : ২৭ এপ্রিল ২০২৬
বিজ্ঞাপন
বিডা চেয়ারম্যান মনে করেন, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে বাংলাদেশকে এখন কাজের ধরণ বদলাতে হবে। তিনি বলেন, প্রতিযোগী দেশগুলো বাংলাদেশের তুলনায় দ্রুত সিদ্ধান্ত নিচ্ছে এবং দ্রুত বাস্তবায়নও করছে। ফলে তারা বিনিয়োগ আকর্ষণে এগিয়ে যাচ্ছে, আর বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ছে। এ অবস্থায় দেশের বিনিয়োগ কাঠামোয় ‘গিয়ার শিফট’ আনা জরুরি।
বিশ্ব অর্থনীতির অস্থিরতার প্রসঙ্গ টেনে আশিক চৌধুরী বলেন, বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি অত্যন্ত অনিশ্চয়তাপূর্ণ এবং জটিল। মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন অঞ্চলের সংঘাত, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বিশ্ববাজারে নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে। এর সরাসরি প্রভাব বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির ওপরও পড়ছে।
তিনি বলেন, বিনিয়োগ, প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের জন্য স্থিতিশীলতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলোর একটি। দেশি-বিদেশি—সব ধরনের বিনিয়োগের জন্যই স্থিতিশীল পরিবেশ অপরিহার্য।
বিজ্ঞাপন

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ বৈশ্বিক সংকট থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। ফলে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো বিদ্যমান বিনিয়োগ সুরক্ষিত রাখা, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখা এবং একই সঙ্গে নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্র তৈরি করা। বর্তমান বিনিয়োগ রক্ষা ও নতুন বিনিয়োগ আহরণ—দুই দিকেই সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
আশিক চৌধুরী বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে বিশেষ করে ২০১৩ সালের পর বাংলাদেশ বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত সূচকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। কিন্তু সেই উন্নয়ন বিনিয়োগ সূচকে প্রত্যাশিতভাবে প্রতিফলিত হয়নি। বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) এবং মোট বিনিয়োগের হার দীর্ঘ সময় ধরে প্রায় স্থির রয়েছে, যা দেশের বিনিয়োগ সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করছে।
বিজ্ঞাপন
বিনিয়োগ পরিস্থিতির ব্যাখ্যায় তিনি একটি ক্রীড়া উপমা তুলে ধরেন। আশিক চৌধুরী বলেন, ১৯৭৪ থেকে ১৯৭৮ সময়কালে নেদারল্যান্ডসের ফুটবল দল দারুণ পারফরম্যান্স করেও বিশ্বকাপ জিততে পারেনি। বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতিও অনেকটা তেমন—উদ্যোগ আছে, কাজও হচ্ছে, কিন্তু ফলাফল প্রত্যাশামতো আসছে না। এই অবস্থার মূল কারণ বাস্তবায়ন ঘাটতি, আর এই চক্র থেকে বেরিয়ে আসাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের জন্য এখন সংস্কারের দ্বিতীয় ধাপে প্রবেশের উপযুক্ত সময়। এই ধাপে শুধু পরিকল্পনা নয়, বরং লক্ষ্যভিত্তিক নীতি, শক্তিশালী বাস্তবায়ন এবং সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে।
গত পাঁচ বছরে বিনিয়োগ পরিবেশে যে অগ্রগতি হয়েছে, আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে সেই পরিবর্তনের গতি আরও বাড়ানোর আহ্বান জানান বিডা চেয়ারম্যান। তার মতে, দ্রুত ও কার্যকর সংস্কার নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে আরও শক্তভাবে সংযুক্ত হতে পারবে এবং দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নতুন গতি পাবে।
বিজ্ঞাপন
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বিডার নির্বাহী সদস্য নাহিয়ান রহমান রচি এবং ইউএনডিপির ডেপুটি রেসিডেন্ট রিপ্রেজেন্টেটিভ সোনালী দায়ারত্নে।








