Logo

মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামানোর লক্ষ্য কতটা বাস্তবসম্মত?

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
১৩ জুন, ২০২৬, ১৪:৩২
মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামানোর লক্ষ্য কতটা বাস্তবসম্মত?
ছবি : জনবাণী গ্রাফিক্স

নতুন অর্থবছরের বাজেটে মূল্যস্ফীতি কমিয়ে ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। দীর্ঘদিন ধরে নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতি, জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান খরচে বিপর্যস্ত সাধারণ মানুষের জন্য এটি অবশ্যই আশাব্যঞ্জক একটি ঘোষণা। তবে অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও বাজার সংশ্লিষ্টদের বড় একটি অংশ মনে করছেন, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এই লক্ষ্য অর্জন মোটেও সহজ হবে না।

বিজ্ঞাপন

দেশের অর্থনীতি কয়েক বছর ধরেই উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে রয়েছে। আয় বৃদ্ধির তুলনায় পণ্যমূল্য ও সেবার খরচ দ্রুত বাড়তে থাকায় মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে উঠেছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকার মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনার প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় কাটছে না।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত মে মাসে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ। অর্থাৎ সরকারের নির্ধারিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতির হার প্রায় দুই শতাংশ পয়েন্ট কমিয়ে আনতে হবে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি অর্জন করতে হলে শুধু মুদ্রানীতি নয়, উৎপাদন, সরবরাহ, বাজার ব্যবস্থাপনা এবং জ্বালানি খাতেও কার্যকর সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন।

বিজ্ঞাপন

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সম্প্রতি জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের মূল্য সমন্বয়ের ফলে শিল্প ও কৃষি খাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পেলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে বাজারে খাদ্যপণ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে। ফলে মূল্যস্ফীতি কমানোর পথে নতুন বাধা সৃষ্টি হতে পারে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, জ্বালানি ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে না দেখা গেলেও ধীরে ধীরে তা বাজারব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে পড়ে। উৎপাদন ব্যয় বাড়লে ব্যবসায়ীরা সেই অতিরিক্ত খরচ শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপর চাপিয়ে দেন। ফলে মূল্যস্ফীতি দীর্ঘমেয়াদে আরও স্থায়ী হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

বিজ্ঞাপন

দেশীয় চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও মূল্যস্ফীতিকে প্রভাবিত করছে। বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের দামের ওঠানামা, ডলারের বিনিময় হার, আমদানি ব্যয়ের বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ দেশের বাজারকে অস্থিতিশীল করে তুলছে। ফলে শুধুমাত্র অভ্যন্তরীণ নীতির মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন মনে করেন, মূল্যস্ফীতিকে ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনতে হলে খাদ্য ও জ্বালানির সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি বাস্তবভিত্তিক ও কার্যকর মুদ্রানীতি অনুসরণ করতে হবে। তার মতে, বর্তমানে যে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করা হচ্ছে, সেটি আরও কিছু সময় অব্যাহত রাখার প্রয়োজন হতে পারে।

তিনি সতর্ক করে বলেন, সরকারের ব্যয় যদি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বিনিয়োগ সম্প্রসারণে প্রত্যাশিত অবদান রাখতে না পারে, তাহলে তা মূল্যস্ফীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে। ফলে লক্ষ্য অর্জন আরও কঠিন হয়ে পড়বে।

বিজ্ঞাপন

অন্যদিকে ব্যবসায়ী মহলেরও একই ধরনের উদ্বেগ রয়েছে। একটি শীর্ষস্থানীয় ভোগ্যপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বাজেটে রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ থাকলেও মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা বর্তমান বাস্তবতায় বেশ উচ্চাভিলাষী। জ্বালানি ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি উৎপাদন ব্যয় বাড়াবে এবং এর প্রভাব বাজারমূল্যে পড়বে।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে নানা ধরনের অনানুষ্ঠানিক ব্যয়ও বেড়েছে। পরিবহন, সরবরাহ এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন পর্যায়ে অতিরিক্ত খরচ ব্যবসার ওপর চাপ তৈরি করছে, যা শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামে যুক্ত হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

বাজার পর্যায়েও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। রাজধানীর একটি বড় কাঁচাবাজারের ব্যবসায়ীরা বলছেন, পণ্য পরিবহনের পথে বিভিন্ন স্থানে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হয়। এসব ব্যয় শেষ পর্যন্ত ভোক্তার কাছ থেকেই আদায় করা হয়। ফলে উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত পুরো সরবরাহ চেইনে খরচ বাড়ছে।

পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাসরুর রিয়াজ মনে করেন, মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য উচ্চাভিলাষী হলেও পুরোপুরি অবাস্তব নয়। তবে এর জন্য অত্যন্ত কার্যকর, সমন্বিত এবং ধারাবাহিক নীতি বাস্তবায়ন প্রয়োজন। তিনি বলেন, বাজেটে টাকার অবমূল্যায়ন, আমদানি নির্ভরতা এবং বৈশ্বিক মূল্যচাপের বিষয়গুলো স্বীকার করা ইতিবাচক দিক।

তার মতে, শুধু মুদ্রানীতির ওপর নির্ভর করলে চলবে না। উৎপাদন ব্যয় কমানো, সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ানোর মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পথ তৈরি করতে হবে।

বিজ্ঞাপন

গত দুই অর্থবছরের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মূল্যস্ফীতি এখনও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের মূল্যস্ফীতি বেশিরভাগ সময়ই দুই অঙ্কের কাছাকাছি ছিল। বছরের শুরুতে তা ১১ শতাংশেরও বেশি ছিল এবং নভেম্বর মাসে সর্বোচ্চ ১১ দশমিক ৩৮ শতাংশে পৌঁছায়। পরে কিছুটা কমলেও বছরের শেষভাগ পর্যন্ত উচ্চ পর্যায়েই অবস্থান করে।

পরবর্তী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতির হার তুলনামূলকভাবে কম থাকলেও তা ধারাবাহিকভাবে নিচের দিকে নামেনি। বছরের মাঝামাঝি সময়ে কিছুটা কমার পর এপ্রিল ও মে মাসে আবার ৯ শতাংশের ওপরে উঠে যায়। ফলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে বাজারে এখনও চাপ বিদ্যমান। জ্বালানি, খাদ্য ও পরিবহন খরচ নিয়ন্ত্রণে না এলে আগামী অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হয়ে যেতে পারে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কয়েকটি বিষয়ে একযোগে কাজ করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে— খাদ্য ও কৃষিপণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধি, সরবরাহ ব্যবস্থার দক্ষতা উন্নয়ন, বাজারে কৃত্রিম সংকট ও মজুতদারি প্রতিরোধ, বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় যৌক্তিক পর্যায়ে রাখা এবং নিম্নআয়ের মানুষের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণ।

সরকার আশা করছে, কঠোর মুদ্রানীতি, বাজার তদারকি বৃদ্ধি, কৃষি উৎপাদন বাড়ানো এবং সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে ধীরে ধীরে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে। তবে এসব উদ্যোগের ফল পেতে সময় লাগবে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিজ্ঞাপন

সব মিলিয়ে প্রশ্নটি এখনো উন্মুক্ত রয়ে গেছে—বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় সরকার কি সত্যিই মূল্যস্ফীতিকে ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনতে পারবে, নাকি এটি শেষ পর্যন্ত বাজেটের একটি আশাবাদী লক্ষ্য হিসেবেই থেকে যাবে? উত্তর মিলবে আগামী অর্থবছরের বাস্তব অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও নীতির কার্যকারিতার ওপর।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD