কিছু ব্যাংকের এক-তৃতীয়াংশ আমানত টাকা চুরি হয়ে গেছে: গভর্নর

দেশের ব্যাংকিং খাতের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এখনও সংকটের মধ্যে রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। তিনি বলেন, কিছু ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ বেরিয়ে গেছে। এক-তৃতীয়াংশ ডিপোজিট চুরি হয়ে গেছে। একটি ব্যাংকিং সিস্টেমকে স্থিতিশীল করতে সবাইকে ধৈর্য ধরতে হবে।
বিজ্ঞাপন
শুক্রবার (১২ জুন) রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে অর্থ মন্ত্রণালয় আয়োজিত বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন গভর্নর।
তিনি বলেন, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি-সহ কয়েকটি দুর্বল ব্যাংককে স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে। দীর্ঘ সময় ধরে যেসব আমানতকারী নিজেদের অর্থ উত্তোলন করতে পারছিলেন না, তারা এখন ধীরে ধীরে টাকা ফেরত পেতে শুরু করেছেন।
বিজ্ঞাপন
গভর্নর জানান, ইসলামী ব্যাংকের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ধারাবাহিকভাবে সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। ব্যাংকটির আর্থিক অবস্থার উন্নয়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপও দ্রুত গ্রহণ করা হয়েছে।
ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নিয়োগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, গত ২৫ মার্চ আবেদন গ্রহণের সময়সীমা শেষ হওয়ার পর বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদন সংগ্রহ, যাচাই-বাছাই ও সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে মে মাসে নতুন এমডি নির্বাচন করা হয়। পরবর্তীতে অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন কমিটি এবং প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের মাধ্যমে পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
আরও পড়ুন: বাজেটের পরও স্থিতিশীল সবজির বাজার
বিজ্ঞাপন
তিনি আরও জানান, একই সময়ে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকগুলোর বোর্ড পুনর্গঠনের কাজও চলছিল, যার কারণে কিছুটা সময় লেগেছে। নতুন চেয়ারম্যান দায়িত্ব গ্রহণের পর সম্প্রতি প্রথম বোর্ড সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
মোস্তাকুর রহমান বলেন, বর্তমানে পাঁচটি ইসলামী ব্যাংকের কোর ব্যাংকিং সফটওয়্যার (সিবিএস) সমন্বয় করা অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগ কাজ করছে এবং আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এ কার্যক্রমে দৃশ্যমান অগ্রগতি পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ইসলামী ব্যাংকের কার্যক্রমে সরকারের অবৈধ হস্তক্ষেপের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে গভর্নর বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক কোনো ব্যাংককে নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে ঋণ দেওয়ার নির্দেশ দেয় না। একইভাবে বদলি বা পদোন্নতির বিষয়েও কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয় না। এ ধরনের অভিযোগের বাস্তব ভিত্তি নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বিজ্ঞাপন
তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গঠিত পাঁচ সদস্যের বোর্ডের একজন সদস্যের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় গত ১৬ মার্চ তাকে পরিবর্তন করা হয়। এর বাইরে বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করেনি।
ঈদের আগে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যানের পদত্যাগকে কেন্দ্র করে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা হয়েছিল বলেও উল্লেখ করেন গভর্নর। তিনি বলেন, এটি দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ সিস্টেমিক ব্যাংক। তাই পরিচালনা পর্ষদে প্রয়োজনীয় সদস্যসংখ্যা নিশ্চিত করতে দ্রুত নতুন সদস্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
মোস্তাকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের হাতে পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য প্রয়োজনীয় কিছু উপায় ও নীতিগত ব্যবস্থা রয়েছে। প্রয়োজন হলে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে সেগুলো প্রয়োগ করা হবে। আমানতকারীদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই; তারা প্রয়োজন অনুযায়ী যে কোনো সময় অর্থ উত্তোলন করতে পারবেন।
তিনি আরও জানান, ২০২৪ সালের জুলাই মাসে ইসলামী ব্যাংকের এডি (অ্যাডভান্স-ডিপোজিট) রেশিও ছিল প্রায় ৯৩ শতাংশ। কিন্তু চলতি বছরের মার্চে তা বেড়ে ৯৭ থেকে ৯৮ শতাংশে পৌঁছে যায়, যা ব্যাংকিং খাতের জন্য অস্বাভাবিক। এ কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংকটিকে এ হার কমিয়ে আনার নির্দেশনা দিয়েছে।
বিজ্ঞাপন
গভর্নর বলেন, ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে সামনে বড় ধরনের কোনো সংকট তৈরি হবে বলে তিনি মনে করেন না। ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। প্রয়োজন হলে বাংলাদেশ ব্যাংক জরুরি তারল্য সহায়তাও প্রদান করবে।
একই সঙ্গে তিনি জানান, দীর্ঘদিন ধরে সংকটে থাকা কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের (এনবিএফআই) সমস্যার সমাধান প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। যেসব গ্রাহক ১০ থেকে ১২ বছর ধরে নিজেদের অর্থ ফেরত পাননি, তাদের জন্য আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে কার্যক্রম শুরু করা হবে।
সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ, মৎস্য ও কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন-উর-রশিদ, শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন, অর্থ সচিব, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যানসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।
বিজ্ঞাপন
উল্লেখ্য, বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এ বাজেট দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় জাতীয় বাজেট। এটি বিএনপি সরকারের ১৭তম বাজেট এবং অর্থমন্ত্রী হিসেবে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর প্রথম বাজেট।








