হঠাৎ চড়া ডলারের দাম, বাড়ছে মুদ্রাবাজারের অস্থিরতা

দেশে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় ডলারের বাজারে আবারও চাপ তৈরি হয়েছে। এর প্রভাবে আন্তঃব্যাংক বাজার, বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং খোলা বাজার—সব ক্ষেত্রেই মার্কিন ডলারের দাম ঊর্ধ্বমুখী। বিশেষ করে জ্বালানি, সারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের আমদানি বিল পরিশোধে অতিরিক্ত ডলারের প্রয়োজন হওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে এই চাপ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ৩০ জুলাই আন্তঃব্যাংক বাজারে প্রতি মার্কিন ডলারের বিনিময় মূল্য দাঁড়িয়েছে ১২৩ টাকা ৮২ পয়সা। একই দিনে স্পট মার্কেটে প্রতি ডলার লেনদেন হয়েছে ১২৩ টাকা ৮৮ পয়সায়। অথচ মাত্র এক মাস আগে এই হার ছিল ১২২ টাকা ৮৫ পয়সা। তবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের দায় ও ঋণপত্র (এলসি) নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে কিছু বাণিজ্যিক ব্যাংককে প্রতি ডলার কিনতে ১২৩ টাকা ৯৫ পয়সা পর্যন্ত ব্যয় করতে হচ্ছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানা অর্থনৈতিক কারণ একসঙ্গে কাজ করায় ডলারের ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক উত্তেজনা এবং যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। এর ফলে জ্বালানি, সার ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ডলারের চাহিদাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
একই সময়ে দেশের আমদানি ব্যয় রপ্তানি আয়ের তুলনায় দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়াও পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে মে পর্যন্ত সময়ে দেশের মোট আমদানির পরিমাণ আগের বছরের তুলনায় ৬ দশমিক ২৬ শতাংশ বেড়ে প্রায় ৬৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। বিপরীতে একই সময়ে রপ্তানি আয় প্রায় ২ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৪০ বিলিয়ন ডলারে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহের তুলনায় বহির্গমন বেশি হওয়ায় বাজারে ডলারের সংকট আরও প্রকট হয়েছে।
এদিকে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম প্রধান উৎস প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্সের প্রবাহেও কিছুটা ধীরগতি দেখা দিয়েছে। গত অর্থবছরে রেকর্ড ৩৫ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এলেও ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার পর প্রবাসী আয়ের প্রবাহ কিছুটা কমেছে। টানা ছয় মাস ৩০০ কোটি ডলারের বেশি রেমিট্যান্স এলেও জুন ও জুলাই মাসে তা যথাক্রমে ২৮২ কোটি এবং ২৮৬ কোটি ডলারে নেমে আসে।
ডলারের বাড়তি চাহিদার কারণে ব্যাংকগুলোকে তুলনামূলক বেশি দামে বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহ করতে হচ্ছিল। এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে মৌখিকভাবে নির্দেশ দিয়েছে, যাতে আন্তঃব্যাংক বাজার কিংবা রেমিট্যান্স চ্যানেল—কোনো উৎস থেকেই ১২৩ টাকা ৮২ পয়সার বেশি দামে ডলার কেনা না হয়।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
ব্যাংকিং খাতের এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব খোলা বাজারেও পড়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন মানি এক্সচেঞ্জে বর্তমানে সাধারণ গ্রাহকদের কাছ থেকে প্রতি ডলার ১২৬ টাকা থেকে ১২৬ টাকা ৪০ পয়সা দরে কেনা হচ্ছে। অন্যদিকে বিক্রি করা হচ্ছে ১২৬ টাকা ৭০ পয়সা থেকে ১২৬ টাকা ৮০ পয়সায়। এক মাস আগেও একই বাজারে প্রতি ডলারের দাম ছিল ১২৫ টাকা থেকে ১২৫ টাকা ২০ পয়সার মধ্যে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বৈশ্বিক পরিস্থিতি, আমদানি ব্যয় এবং রপ্তানি-রেমিট্যান্স প্রবাহের ভারসাম্য দ্রুত স্বাভাবিক না হলে ডলারের বাজারে অস্থিরতা আরও কিছুদিন অব্যাহত থাকতে পারে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজরদারি এবং বাজার ব্যবস্থাপনা কার্যকর হলে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে।








