Logo

আয়কর রিটার্নে আয়-ব্যয়ের গরমিল মিললেই ঝুঁকিতে করদাতা

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১৮:০২
আয়কর রিটার্নে আয়-ব্যয়ের গরমিল মিললেই ঝুঁকিতে করদাতা
ছবি: সংগৃহীত

আয়কর রিটার্নে কম আয় দেখিয়ে বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেন, সম্পদ কেনা কিংবা বিলাসী জীবনযাপনের তথ্য গোপন করা কঠিন হয়ে আসছে। করদাতার ঘোষিত আয়, ব্যয় ও সম্পদের সঙ্গে ব্যাংক লেনদেনসহ বিভিন্ন উৎসের তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে মিলিয়ে দেখার উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।

বিজ্ঞাপন

নতুন ব্যবস্থায় কোনো করদাতা বছরে ১২ লাখ টাকা আয় দেখালেও যদি একই সময়ে তাঁর ব্যাংক হিসাবে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা লেনদেন হয়, ৫০ লাখ টাকার গাড়ি ও ১ কোটি টাকার জমি কেনা হয় কিংবা বছরে একাধিকবার বিদেশ ভ্রমণের তথ্য পাওয়া যায়, তাহলে এসব তথ্যের মধ্যে থাকা অসামঞ্জস্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করা হবে।

এনবিআর সূত্র জানায়, ব্যাংক হিসাব ও বড় অঙ্কের লেনদেনের পাশাপাশি ক্রেডিট কার্ডের ব্যয়, বিদেশ ভ্রমণ, গাড়ি কেনা, জমি-বাড়ি-ফ্ল্যাটের লেনদেন, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ, শিক্ষা ও চিকিৎসায় বড় ব্যয় এবং অন্যান্য সম্পদের তথ্য রিটার্নের সঙ্গে সমন্বয় করে দেখা হবে।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

কোনো করদাতার ঘোষিত আয় ও আর্থিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে অস্বাভাবিক পার্থক্য ধরা পড়লে তাঁকে উচ্চঝুঁকির করদাতা হিসেবে চিহ্নিত করা হতে পারে। পরবর্তী সময়ে ঝুঁকির মাত্রা অনুযায়ী নিরীক্ষা ও কর নির্ধারণের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

এক প্ল্যাটফর্মে আসবে বিভিন্ন আর্থিক তথ্য

বিজ্ঞাপন

করহার বাড়ানোর পরিবর্তে করের আওতা বাড়ানো, প্রকৃত আয় ও সম্পদের তথ্য শনাক্ত করা এবং কর ফাঁকি কমানোর লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে স্বেচ্ছায় কর পরিশোধের প্রবণতা বাড়ানো এবং প্রযুক্তিনির্ভর আয়কর প্রশাসন গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে এনবিআরের।

সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির বৈঠকে এনবিআরের আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমস বিভাগের কর্মকর্তারা রাজস্ব বাড়ানোর বিভিন্ন পরিকল্পনা তুলে ধরেন। বৈঠকের কার্যপত্রে করদাতাদের সমন্বিত প্রোফাইল তৈরি, তৃতীয় পক্ষের তথ্যের সঙ্গে রিটার্নের তথ্য যাচাই এবং ঝুঁকিভিত্তিক অডিটের বিষয়টি উঠে আসে।

এনবিআরের পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ ‘ন্যাশনাল ইনকাম ট্যাক্স ডাটা ম্যাচিং সিস্টেম’। এর মাধ্যমে করদাতার রিটার্নে দেওয়া তথ্যের সঙ্গে সরকারি ও তৃতীয় পক্ষের বিভিন্ন উৎস থেকে পাওয়া তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে তুলনা করার ব্যবস্থা করা হবে।

বিজ্ঞাপন

এই ব্যবস্থায় ব্যাংক হিসাব, বড় অঙ্কের আর্থিক লেনদেন, জমি ও ফ্ল্যাট কেনাবেচা, গাড়ির মালিকানা, ব্যবসায়িক লাইসেন্স, আমদানি-রপ্তানি, ক্রেডিট কার্ড ব্যয়, বিদেশ ভ্রমণ, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ, সরকারি ক্রয়, উচ্চমূল্যের ইউটিলিটি সংযোগ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বড় ব্যয়, ডিজিটাল ব্যবসা, ই-কমার্স, পেশাজীবীদের আয় এবং ভাড়া থেকে অর্জিত আয়ের মতো তথ্য যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

এর ফলে টিআইএন না থাকলেও করযোগ্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা সম্ভব হবে। একইভাবে টিআইএন থাকার পরও যারা নিয়মিত রিটার্ন জমা দেন না, তাদেরও আলাদা করে চিহ্নিত করা যাবে।

করদাতাদের হবে আলাদা শ্রেণিবিন্যাস

বিজ্ঞাপন

টিআইএন ডাটাবেজ পরিশোধনের পাশাপাশি করদাতাদের কর্মকাণ্ডের ভিত্তিতে শ্রেণিবিন্যাসের পরিকল্পনা রয়েছে। নিয়মিত রিটার্ন জমা ও কর পরিশোধকারীরা ‘অ্যাকটিভ ট্যাক্সপেয়ার’ হিসেবে চিহ্নিত হবেন।

রিটার্ন জমা দিলেও যাদের করযোগ্য আয় নেই, তাদের রাখা হবে ‘রিটার্ন ফাইলার বাট নো ট্যাক্স’ শ্রেণিতে। টিআইএন থাকলেও রিটার্ন জমা না দেওয়া ব্যক্তিরা হবেন ‘নন-ফাইলার’। দীর্ঘদিন কোনো কার্যক্রম না থাকা টিআইএনকে ‘ডরম্যান্ট’ হিসেবে চিহ্নিত করা হবে।

অন্যদিকে টিআইএন না থাকলেও যাদের করযোগ্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড রয়েছে, তাদের ‘পটেনশিয়াল ট্যাক্সপেয়ার’ হিসেবে শনাক্ত করার পরিকল্পনা করেছে এনবিআর।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

প্রতিটি করদাতার জন্য একটি সমন্বিত প্রোফাইল তৈরির উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এতে ঘোষিত আয়, পরিশোধিত কর, ব্যাংক লেনদেন, স্থাবর সম্পত্তি, গাড়ি, কোম্পানির মালিকানা, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ, আমদানি-রপ্তানি, উৎসে কর, বিদেশ ভ্রমণসহ বড় ব্যয় ও সম্পদের তথ্য এক জায়গায় রাখা হবে।

বিজ্ঞাপন

ফলে একজন করদাতার আয়, ব্যয় ও সম্পদ অর্জনের মধ্যে বাস্তবসম্মত সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা সহজে যাচাই করা সম্ভব হবে।

উচ্চ সম্পদশালীদের ওপর আলাদা নজর

উচ্চ-নিট-মূল্য বা উচ্চ সম্পদশালী ব্যক্তিদের জন্য পৃথক প্রোফাইল তৈরির উদ্যোগও রয়েছে। শুধু রিটার্নে দেখানো আয় নয়, সম্পদ বৃদ্ধির হার, জীবনযাপনের ব্যয় এবং আর্থিক সক্ষমতার সঙ্গে পরিশোধিত করের সামঞ্জস্যও বিশ্লেষণ করা হবে।

বিজ্ঞাপন

ঘোষিত আয় ও সম্পদ বৃদ্ধির মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে উচ্চঝুঁকির শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত করে নিরীক্ষার আওতায় আনা হতে পারে।

করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রেও একই ধরনের ঝুঁকিভিত্তিক বিশ্লেষণের পরিকল্পনা রয়েছে। কোম্পানির মোট লেনদেনের বিপরীতে ঘোষিত মুনাফা, মোট মুনাফার হার, সংশ্লিষ্ট পক্ষের সঙ্গে লেনদেন, সুদের ব্যয়, ব্যবস্থাপনা ফি, রয়্যালটি, কমিশন, অবচয়, মন্দঋণ, সংশ্লিষ্ট পক্ষকে দেওয়া ঋণ এবং পরিচালকদের সম্মানীর মতো আর্থিক সূচক বিশ্লেষণ করা হবে।

আমদানির ক্ষেত্রেও পণ্যের ঘোষিত মূল্য, স্থানীয় বাজারে বিক্রির তথ্য এবং ভ্যাট ও আয়কর রিটার্নে দেখানো লেনদেনের মধ্যে কোনো অসামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা যাচাই করা হবে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে উচ্চঝুঁকির কোম্পানি চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বড় চ্যালেঞ্জ

চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। আগের অর্থবছরের আদায়ের তুলনায় এ লক্ষ্য প্রায় ৪৬ শতাংশ বেশি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব আদায় হয়েছিল ৪ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা।

এর মধ্যে আয়কর বিভাগকে ২ লাখ ২৩ হাজার ৪৮০ কোটি, ভ্যাট বিভাগকে ২ লাখ ২৩ হাজার ৪৮০ কোটি এবং শুল্ক বিভাগকে ১ লাখ ৫৭ হাজার ৪০ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য দেওয়া হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

এনবিআরের এক কর্মকর্তা বলেন, এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সহজ হবে না। তাঁর মতে, রাজস্ব আদায়ের পুরো প্রক্রিয়াকে অটোমেশনের আওতায় আনা হলে করজাল সম্প্রসারণের পাশাপাশি কর ফাঁকি কমানো সম্ভব হবে।

তবে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং আমদানি-রপ্তানি কমে যাওয়ায় রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে চাপ রয়েছে। বেশি আমদানি শুল্ক পাওয়া যায়—এমন পণ্যের আমদানিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

বিদেশে কাস্টমস অ্যাটাশে নিয়োগের পরিকল্পনা

বাণিজ্যিক জালিয়াতি, রাজস্ব ফাঁকি ও বাণিজ্যের আড়ালে অর্থপাচার ঠেকাতে বাংলাদেশের প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার দেশগুলোতে কাস্টমস অ্যাটাশে নিয়োগের প্রস্তাবও রয়েছে।

এসব কর্মকর্তা আমদানিপণ্যের উৎস, বিদেশি রপ্তানিকারক, বাণিজ্যিক লেনদেন এবং সংশ্লিষ্ট বিদেশি কোম্পানির বিষয়ে তথ্য সংগ্রহে ভূমিকা রাখবেন।

জেলা ও বিভাগীয় শহরগুলোতেও সম্পত্তিভিত্তিক আয়কর পরিপালন কর্মসূচি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এর আওতায় বাড়ি, ফ্ল্যাট ও বাণিজ্যিক সম্পত্তি থেকে অর্জিত আয় এবং সম্পত্তির মালিকদের কর পরিপালন যাচাই করা হবে। একই সঙ্গে বকেয়া আয়কর আদায়েও নতুন ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

ধাপে ধাপে পুরো ব্যবস্থা হবে ডিজিটাল

করদাতা ও কর কর্মকর্তার অপ্রয়োজনীয় সরাসরি যোগাযোগ কমাতে আয়কর প্রশাসনকে ধীরে ধীরে ডিজিটাল, ফেসলেস ও ডাটাভিত্তিক ব্যবস্থায় নেওয়ার উদ্যোগ রয়েছে।

অনলাইনভিত্তিক কর নির্ধারণ ও নিরীক্ষার পাশাপাশি ইলেকট্রনিক অডিট নির্বাচন, স্বয়ংক্রিয় উৎসে কর কর্তনের হিসাব এবং ভবিষ্যতে স্বয়ংক্রিয় কর ফেরত ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী তিন মাসে টিআইএন ডাটাবেজ পরিশোধন ও শ্রেণিবিন্যাস করা হবে। একই সময়ে শীর্ষ বকেয়া করদাতা, উচ্চঝুঁকির কোম্পানি ও উচ্চ সম্পদশালী ব্যক্তিদের শনাক্ত করা হবে।

আরও পড়ুন

তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে উচ্চ সম্পদশালী করদাতাদের জন্য পৃথক ইউনিট কার্যকর এবং কেন্দ্রীয় ঝুঁকিভিত্তিক অডিট ব্যবস্থা পরীক্ষামূলকভাবে চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।

ছয় থেকে ১২ মাসের মধ্যে করদাতাদের ব্যাংক হিসাব, সম্পত্তি, যানবাহন ও কোম্পানিসংক্রান্ত তথ্য কেন্দ্রীয়ভাবে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। একই সময়ে স্বয়ংক্রিয় আয় ও সম্পদ প্রোফাইল তৈরির পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু হতে পারে।

এক থেকে দুই বছরের মধ্যে অনলাইনভিত্তিক কর নির্ধারণ, দেশব্যাপী ঝুঁকিভিত্তিক অডিট এবং স্বয়ংক্রিয় কর ফেরত ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে করদাতাদের সমন্বিত প্রোফাইল ও শক্তিশালী আয়কর উপাত্তভান্ডার তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

বর্তমানে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত ৬ দশমিক ৮ শতাংশ। স্বল্পমেয়াদে এটি আরও ২ শতাংশীয় পয়েন্ট বাড়িয়ে মধ্যমেয়াদে ১০ শতাংশ এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে ১৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে।

এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, এ ধরনের উদ্যোগ নিয়ে দীর্ঘদিন আলোচনা হলেও কার্যকর বাস্তবায়ন দেখা যায়নি। তাঁর মতে, রাজস্ব সংস্কার কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন করা গেলে রাজস্ব ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।

অর্থনীতিবিদ ড. সেলিম রায়হানের মতে, রাজস্ব খাত সংস্কার করা বড় চ্যালেঞ্জ। তাঁর ভাষ্য, কর-জিডিপি অনুপাত এখনো ৭ শতাংশের নিচে, যা সমমানের অনেক দেশের তুলনায় কম। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো ও সামাজিক সুরক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে করভিত্তি সম্প্রসারণ এবং কর প্রশাসনের দক্ষতা বাড়ানো জরুরি।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD