Logo

মজুতের মধ্যেই লবণ আমদানির উদ্যোগ, দুশ্চিন্তায় উপকূলের চাষিরা

profile picture
জেলা প্রতিনিধি
কক্সবাজার
১ অক্টোবর, ২০২৬, ১৬:১৭
মজুতের মধ্যেই লবণ আমদানির উদ্যোগ, দুশ্চিন্তায় উপকূলের চাষিরা
ছবি: সংগৃহীত

বর্ষা পেরিয়ে শরৎও শেষের পথে। হেমন্ত শুরু হলেই কক্সবাজার উপকূলের লবণচাষিরা নতুন মৌসুমের মাঠে নামার প্রস্তুতি নেবেন। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে চাষ শুরুর ২০ থেকে ২৫ দিনের মধ্যেই নতুন লবণ বাজারে আসতে পারে। এমন সময়ে গত মৌসুমের প্রায় সাড়ে চার লাখ মেট্রিক টন লবণ মজুত থাকার পরও দেড় লাখ মেট্রিক টন অপরিশোধিত লবণ আমদানির উদ্যোগে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন চাষিরা।

বিজ্ঞাপন

চাষিদের আশঙ্কা, বিদেশি লবণ বাজারে এলে স্থানীয় লবণের দাম কমে যেতে পারে। এতে দীর্ঘদিন ধরে মজুত করে রাখা লবণের ন্যায্যমূল্য পাওয়া কঠিন হবে। বিশেষ করে গত মৌসুমে উৎপাদন খরচের তুলনায় কম দামে লবণ বিক্রি করতে হওয়ায় অনেক চাষি এখনো বিপুল পরিমাণ লবণ ধরে রেখেছেন।

কক্সবাজার সদরের চৌফলদন্ডীর লবণচাষি লেদু মিয়া বলেন, বাড়ির পাশে দুই একর জমিতে চাষ করে প্রায় দেড় হাজার মণ লবণ উৎপাদন করেছিলেন। উৎপাদনের সময় দাম কম থাকায় প্রায় ৫০০ মণ বিক্রি করে বাকি এক হাজার মণের মতো লবণ গর্তে সংরক্ষণ করেন। মাঠে নামার আগে দাম বাড়বে—এই প্রত্যাশায় মজুত রাখা লবণ নিয়ে এখন নতুন করে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তিনি।

লেদু মিয়ার ভাষ্য, বিদেশ থেকে দেড় লাখ মেট্রিক টন অপরিশোধিত লবণ আমদানি হলে বাজারদর কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে মজুত লবণের ন্যায্যমূল্য পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

ঈদগাঁওয়ের গোমাতলী, পোকখালী, নাপিতখালী ও খানঘোনাসহ বিভিন্ন এলাকার চাষিদের মধ্যেও একই ধরনের উদ্বেগ রয়েছে। তাদের হিসাবে, প্রতি একর লবণ মাঠের ইজারায় প্রায় এক লাখ ২৫ হাজার টাকা, পলিথিনে ১৫ হাজার টাকা এবং শ্রমিকের মজুরিতে প্রায় দেড় লাখ টাকা ব্যয় হয়।

বিজ্ঞাপন

চাষিরা জানান, গত মৌসুমের শুরুতে প্রতি মণ লবণের দাম ছিল ২০০ থেকে ২২০ টাকা। পরে তা বেড়ে ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত ওঠে। বর্তমানে ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা দরে বিক্রি হলেও মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে প্রতি মণে ৫০ থেকে ৬০ টাকা পর্যন্ত কমে যায়। তাদের আশঙ্কা, আমদানি করা লবণ বাজারে এলে দাম আবার ২০০ থেকে ২৫০ টাকার ঘরে নেমে যেতে পারে।

মহেশখালীর ধলঘাটার চাষি আনছারুল হক বলেন, বাপ-দাদার পেশা ধরে রাখতে অনেক চাষি ধারদেনা ও ঋণ নিয়ে লবণ উৎপাদনে নামেন। কিন্তু উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য না পেলে তাদের টিকে থাকা কঠিন। বিদেশ থেকে লবণ আমদানি হলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

হোয়ানকের লবণ ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলামের দাবি, বর্তমানে মাঠে যে পরিমাণ লবণ রয়েছে, তা দিয়ে নতুন মৌসুমের উৎপাদন বাজারে আসা পর্যন্ত দেশের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। আমদানির আগে মাঠে থাকা লবণের প্রকৃত মজুত যাচাই করার আহ্বান জানান তিনি।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) লবণ শিল্পের উন্নয়ন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ মৌসুমে লবণ উৎপাদনকারী চাষির সংখ্যা ছিল ৪১ হাজার ৫৩৩ জন এবং ৬৯ হাজার ১৯৮ একর জমিতে চাষ হয়েছিল। ২০২৫-২৬ মৌসুমে চাষির সংখ্যা কমে ৪০ হাজার ১৫০ জন এবং চাষের জমি ৬৭ হাজার ৭৫৭ একরে দাঁড়ায়। দেশের মোট লবণের প্রায় ৮৭ শতাংশ কক্সবাজারে উৎপাদিত হয়।

বিসিকের হিসাবে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশে পরিশোধিত লবণের মোট চাহিদা প্রায় ২১ লাখ টন। এর মধ্যে ভোজ্য লবণের চাহিদা সাড়ে সাত লাখ টন, শিল্প খাতে সাড়ে নয় লাখ টন, মাছ চাষে ৩৭ হাজার টন এবং প্রাণিসম্পদ খাতে তিন লাখ ছয় হাজার টন। দেশে প্রতি মাসে প্রায় দুই লাখ টন লবণের প্রয়োজন হয়।

এদিকে সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৩ সেপ্টেম্বর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আমদানি ও রপ্তানি প্রধান নিয়ন্ত্রকের দপ্তর দেড় লাখ মেট্রিক টন অপরিশোধিত বোল্ডার লবণ আমদানির অনুমোদন প্রক্রিয়া শুরু করে। শিল্প মন্ত্রণালয়ের সুপারিশের ভিত্তিতে বিসিকের নিবন্ধিত ও চালু মিলগুলোর জন্য এ আমদানির সুপারিশ করা হয়েছে। প্রায় ২৫১টি প্রতিষ্ঠানকে ১ অক্টোবরের মধ্যে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ আবেদন করতে বলা হয়।

বিজ্ঞাপন

পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২৪৪টি মিলকে ৫৪৩ টন করে মোট এক লাখ ৩২ হাজার ৫০০ টন এবং ভ্যাকুয়াম পদ্ধতিতে লবণ উৎপাদনকারী সাত প্রতিষ্ঠানকে আড়াই হাজার টন করে মোট ১৭ হাজার ৫০০ টন অপরিশোধিত লবণ আমদানির সুযোগ দেওয়ার কথা রয়েছে।

তবে সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওই ২৪৪টি মিলের মধ্যে ৮৬টি গত বছরের জুলাই থেকে চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত কোনো ভোজ্য লবণ উৎপাদন করেনি।

চৌফলদন্ডীর ব্যবসায়ী হারুন রশিদ বলেন, বর্তমানে দেশে লবণ আমদানির প্রয়োজন নেই। মাঠে প্রকৃতপক্ষে কত লবণ মজুত রয়েছে, তা জানতে প্রয়োজনে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত করা উচিত। তার মতে, আমদানি হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়বেন প্রান্তিক চাষিরা।

বিজ্ঞাপন

ঈদগাঁওয়ের গোমাতলীর ব্যবসায়ী রিদুয়ানুল হক জানান, একজন চাষি সাধারণত অন্তত এক একর ২০ শতক জমিতে লবণ চাষ করেন। এতে প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা খরচ হয় এবং স্বাভাবিক মৌসুমে প্রায় ৯০০ মণ লবণ উৎপাদন হতে পারে। বর্তমান বাজারদরে বিক্রি করে খুব বেশি লাভ থাকে না। আমদানি অব্যাহত থাকলে আগামী মৌসুমে চাষিরা মাঠে নামার আগ্রহ হারাতে পারেন বলে আশঙ্কা তার।

ইসলামপুর লবণ মিল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মনজুর আলম বলেন, ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন মৌসুমের লবণ বাজারে আসার কথা। বিদেশ থেকে লবণ আমদানি করে দেশে এনে বাজারজাত করতেও সময় লাগবে। তাই আমদানির আগে বর্তমান মজুত দিয়ে চাহিদা মেটানো সম্ভব কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

কক্সবাজার লবণচাষি ও ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান চৌধুরী খোকন মিয়ার দাবি, প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে অনেক চাষি এতদিন মজুত লবণ বাজারজাত করতে পারেননি। চলতি মাসের শেষ দিকে এসব লবণ বাজারে আসতে শুরু করতে পারে। এর মধ্যে আমদানি হলে স্থানীয় বাজারে দামের ওপর চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অন্যদিকে, সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, গত মৌসুমে প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে লবণ উৎপাদন কিছুটা কম হয়েছিল। বর্তমান মজুত ডিসেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত চলতে পারে। তবে গত বছরের মৌসুমের প্রথম দুই মাসে উৎপাদন কম থাকায় সম্ভাব্য ২০ থেকে ২৫ দিনের সংকট মোকাবিলায় আমদানির সুপারিশ করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

বিসিক কক্সবাজার লবণ শিল্পের উন্নয়ন কার্যালয়ের উপমহাব্যবস্থাপক মো. জাফর ইকবাল ভূঁইয়া বলেন, হালনাগাদ হিসাবে মাঠে প্রায় পাঁচ লাখ মেট্রিক টন লবণ মজুত রয়েছে। দেশে প্রতি মাসে প্রায় দুই লাখ টন লবণের প্রয়োজন হওয়ায় বর্তমান মজুত দিয়ে প্রায় আড়াই মাসের চাহিদা পূরণ সম্ভব। তবে আমদানির অনুমতি দেওয়ার বিষয়ে কোনো কাগজপত্র তিনি হাতে পাননি বলে জানান।

তিনি আরও বলেন, প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে গত মৌসুমটি চাষিদের জন্য কঠিন ছিল। আগামী মৌসুমে অক্টোবরের শেষ দিকে চাষিরা মাঠে নামবেন বলে জানান তিনি।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD