বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের প্রায় ২৯ শতাংশ বেকার: আইএমএফ

বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার প্রায় ২৯ শতাংশে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে উচ্চশিক্ষিত কর্মীদের প্রায় অর্ধেক এমন পেশায় কাজ করছেন, যেখানে তাঁদের শিক্ষাগত যোগ্যতা পুরোপুরি কাজে লাগছে না। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) অক্টোবর ২০২৬-এর এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের শ্রমবাজারের এই চিত্র উঠে এসেছে।
বিজ্ঞাপন
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককের কুইন সিরিকিত ন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে ‘রিজিওনাল ইকোনমিক আউটলুক: এশিয়া অ্যান্ড প্যাসিফিক’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। এতে এশিয়ার শ্রমবাজারের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) প্রভাব বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে তরুণদের সামগ্রিক বেকারত্বের হার ১২ থেকে ১৩ শতাংশের মধ্যে। তবে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের ক্ষেত্রে তা বেড়ে প্রায় ২৮ থেকে ২৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ, উচ্চশিক্ষা অর্জনের পরও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক তরুণ চাকরি পাচ্ছেন না। আবার কর্মসংস্থানে যুক্তদের অনেকেই নিজেদের যোগ্যতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কাজের সুযোগ পাচ্ছেন না।
শিক্ষাগত যোগ্যতার সঙ্গে কাজের অসামঞ্জস্য
বিজ্ঞাপন
আইএমএফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষিত কর্মীদের প্রায় ৫০ শতাংশ এমন কাজে নিয়োজিত, যেখানে তাঁদের শিক্ষাগত যোগ্যতার পূর্ণ ব্যবহার হচ্ছে না। ফলে অনেককে নিজেদের যোগ্যতার তুলনায় নিম্নস্তরের কাজে যুক্ত হতে হচ্ছে।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
শিক্ষাব্যবস্থায় অর্জিত দক্ষতা এবং নিয়োগদাতাদের চাহিদার মধ্যে ব্যবধান এ সমস্যার অন্যতম কারণ। কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দক্ষতার ঘাটতির কারণে অনেক তরুণকে উপযুক্ত চাকরির জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। একপর্যায়ে তাঁদের কেউ কেউ শিক্ষাগত যোগ্যতার সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন পেশা বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছেন।
এ পরিস্থিতি শুধু শিক্ষিত তরুণদের কর্মসংস্থানের সংকট নয়, দেশের মানবসম্পদের যথাযথ ব্যবহার নিয়েও প্রশ্ন তুলছে। উচ্চশিক্ষায় বিনিয়োগের পরও কর্মীদের দক্ষতা উৎপাদনশীল কাজে কাজে না লাগলে অর্থনীতিতে সেই বিনিয়োগের সুফল সীমিত হয়ে পড়ে।
বিজ্ঞাপন
অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মসংস্থানের আধিক্য
বাংলাদেশের শ্রমবাজারে অনানুষ্ঠানিক খাতের আধিপত্যও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কৃষিসহ বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক কর্মকাণ্ডে বিপুলসংখ্যক মানুষ কাজ করছেন। এসব ক্ষেত্রে নিয়মিত চাকরির চুক্তি, কর্মসংস্থানের নিরাপত্তা এবং পেশাগত উন্নতির সুযোগ অনেক সময় সীমিত থাকে।
ফলে কর্মরত থাকলেও অনেক শ্রমিকের আয় ও কর্মপরিবেশ অনিশ্চিত থেকে যায়। শুধু বেকারত্বের হার দিয়ে শ্রমবাজারের পুরো পরিস্থিতি বোঝা সম্ভব নয়। কারণ, কোনো কাজে যুক্ত থাকলেই যে একজন কর্মী নিজের যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ করছেন বা নিরাপদ কর্মসংস্থান পেয়েছেন, তা নয়।
বিজ্ঞাপন
বাড়বে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী
আইএমএফের প্রতিবেদনের প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০২৫ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশে ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সী কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী প্রায় ১০ থেকে ১২ শতাংশ বাড়বে।
এই বিপুল জনগোষ্ঠীকে উৎপাদনশীল কাজে যুক্ত করা গেলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের সুযোগ তৈরি হবে। বিশেষ করে উৎপাদনশিল্প ও সেবা খাতে উচ্চ উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান বাড়াতে পারলে জনমিতিক এই সুবিধা দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
তবে বিপুলসংখ্যক তরুণের জন্য সময়মতো মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা না গেলে এই সম্ভাবনা কাজে লাগানো কঠিন হবে। দক্ষতার ঘাটতি ও উপযুক্ত চাকরির সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে তরুণদের হতাশা বাড়তে পারে। পাশাপাশি অর্থনীতির উৎপাদনশীলতা ও প্রবৃদ্ধিও বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এআইয়ের প্রভাবে বদলাচ্ছে শ্রমবাজার
এশিয়ার শ্রমবাজারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তার কর্মসংস্থানের ধরন ও প্রয়োজনীয় দক্ষতায় পরিবর্তন আনছে। আইএমএফের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এআইয়ের প্রভাব বেশি এমন পেশাগুলোতে নিয়োগের চাহিদা তুলনামূলক কম প্রভাবিত পেশাগুলোর তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে, এআই-সম্পর্কিত দক্ষতাসম্পন্ন কর্মীদের চাহিদা বাড়ছে।
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশের মতো তরুণ জনগোষ্ঠীনির্ভর অর্থনীতির জন্য এই পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ। প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে কর্মীদের দক্ষতা সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলে বিদ্যমান কর্মসংস্থান সংকট আরও জটিল হতে পারে। বিপরীতে, প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জন করতে পারলে নতুন ধরনের কাজের সুযোগও তৈরি হতে পারে।
প্রতিবেদনে এশিয়ার শ্রমবাজারের ভবিষ্যৎ নিয়ে কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র তৈরি, প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন এবং এআইনির্ভর পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার বিষয়গুলোকে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য একই সঙ্গে তরুণদের মানসম্মত কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা এবং উচ্চশিক্ষিত কর্মীদের যোগ্যতা ও দক্ষতার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি। কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী বৃদ্ধির সম্ভাবনাকে অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে রূপ দিতে শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।








