Logo

ফ্যামিলি-কৃষক কার্ডকে কার্যকরী পদক্ষেপ বলছে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
১৬ অক্টোবর, ২০২৬, ১৩:৫৯
ফ্যামিলি-কৃষক কার্ডকে কার্যকরী পদক্ষেপ বলছে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক
ছবি: সংগৃহীত

বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি ও কর্মসংস্থানের সংকট মোকাবিলায় সরকারের ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচিকে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। এসব কর্মসূচির মাধ্যমে নিম্নআয়ের মানুষের আর্থিক সুরক্ষা, কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এবং দারিদ্র্য হ্রাসের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে বিএনপি সরকার।

বিজ্ঞাপন

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংক এ ধরনের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিকে কার্যকর পদ্ধতি হিসেবে বিবেচনা করছে বলে দাবি করেছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।

শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে এসব বিষয় উঠে আসে। ব্যাংককের কুইন সিরিকিত ন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে অনুষ্ঠিত আলোচনায় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব আহরণ, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির কৌশল নিয়ে আলোচনা হয়।

বৈঠকে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মাধ্যমে সামাজিক সুরক্ষা জোরদারের বিষয়টি তুলে ধরা হয়। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে নিম্নআয়ের পরিবারকে সহায়তা এবং কৃষক কার্ডের মাধ্যমে কৃষকদের ভর্তুকি, সহজ শর্তে ঋণ, কৃষি বিমা ও বাজারজাতকরণে সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতির কারণে দরিদ্র হয়ে পড়া মানুষের দুর্ভোগ কমাতে এসব কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। স্বাধীন গবেষণা সংস্থাগুলোর প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে দারিদ্র্যের হার ৫ শতাংশ কমতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন। আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকও এ ধরনের কর্মসূচিকে কার্যকর পদ্ধতি হিসেবে দেখে বলে দাবি করেন তিনি।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং দীর্ঘদিনের মূল্যস্ফীতি বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়াচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিতুমীর। তাঁর ভাষ্য, এসব পরিস্থিতির প্রভাব বিশেষ করে নিম্নআয়ের পরিবার ও শ্রমজীবী মানুষের ওপর বেশি পড়ছে। এ কারণে সরকারের অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও দাবি করেন, অতীতের সরকারের সময় প্রায় ৮০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছেন। আগের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে উপকারভোগী নির্বাচনের ক্ষেত্রে ত্রুটি থাকায় প্রকৃত সুবিধাভোগীদের অনেকে সহায়তা পাননি। আবার অযোগ্য ব্যক্তিরাও তালিকায় স্থান পেয়েছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।

তিতুমীরের মতে, ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মাধ্যমে এই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতির চাপে নতুন করে মানুষের দরিদ্র হয়ে পড়ার ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করছে সরকার। জ্বালানি ও বিদ্যুতের মূল্য সমন্বয়ের ক্ষেত্রেও সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ এড়াতে সরকার সতর্ক অবস্থান নিয়েছে বলে জানান তিনি।

বিজ্ঞাপন

রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং কর-জিডিপি অনুপাত উন্নত করার বিষয়ে আইএমএফের পরামর্শের প্রসঙ্গেও কথা বলেন অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা। তাঁর দাবি, অতীতে কর অব্যাহতি, কর ফাঁকি এবং পৃষ্ঠপোষকতার সংস্কৃতির কারণে রাজস্ব আয় প্রত্যাশিত হারে বাড়েনি।

তিতুমীর জানান, এসব সমস্যা মোকাবিলায় সরকার টাস্কফোর্স গঠন করেছে। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গত অর্থবছরে রাজস্ব আয়ে প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ শতাংশ। বর্তমান সরকার ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি দায়িত্ব নেওয়ার পর ৩০ জুন পর্যন্ত রাজস্ব আয়ে প্রবৃদ্ধি বেড়ে ১২ থেকে ১৩ শতাংশে পৌঁছেছে।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, ‘আমরা পৃষ্ঠপোষকতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসছি। কর ফাঁকি ও কর জালিয়াতি থেকে বেরিয়ে আসছি। আস্থা হয় কাজের মাধ্যমে।’

আগের সরকার আইএমএফের কর্মসূচিতে যুক্ত থাকলেও কার্যকর সংস্কার বাস্তবায়নে যথেষ্ট পদক্ষেপ নেয়নি বলে অভিযোগ করেন তিতুমীর। তাঁর দাবি, তখন দেশের কর-জিডিপি অনুপাত ছিল মাত্র ৬ দশমিক ৭ শতাংশ। বর্তমান সরকার রাজস্ব আহরণ বাড়াতে কাজ করছে এবং এর ইতিবাচক ফল পাওয়া যাচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে আইএমএফের পূর্বাভাসের ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, সংস্কার বাস্তবায়িত না হলে অর্থনীতি যে পরিস্থিতির মুখে পড়তে পারে, সেই প্রেক্ষাপটে পূর্বাভাসগুলো বিবেচনা করা উচিত। তাঁর দাবি, আইএমএফের আর্টিকেল ফোর মিশনের প্রক্ষেপণে ৪ দশমিক ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির কথাও উল্লেখ রয়েছে।

সরকারি আর্থিক হিসাবের স্বচ্ছতা ও যাচাইযোগ্যতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিতুমীর বলেন, আইবাসসহ সরকারি ব্যবস্থায় সংরক্ষিত তথ্য যাচাই করা সম্ভব। তাঁর মতে, অর্থনৈতিক সংস্কারের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রতিষ্ঠা করতে হলে শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তব অগ্রগতিও দেখাতে হবে।

ব্যাংকিং খাতের সংকট মোকাবিলাকে সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেন তিতুমীর। তাঁর দাবি, অতীতে ব্যাংক থেকে অর্থ লুটপাটের কারণে সৃষ্ট সংকট মোকাবিলায় প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হতে পারে। এ ধরনের অনিয়মের আর্থিক বোঝা সাধারণ মানুষের ওপর কেন পড়বে, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে আমানতকারীরা তাঁদের প্রাপ্য অর্থ উত্তোলনের সুযোগ পাচ্ছেন। তাঁর দাবি, পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় অতিরিক্ত অর্থ উত্তোলনের চাপ কমেছে এবং অনেকে নতুন করে আমানত রাখছেন।

অন্যান্য ব্যাংকে অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ মোকাবিলায় রেজল্যুশন অ্যাক্টের আওতায় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি। ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম স্বাভাবিক করা এবং আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা করাকে সরকারের সংস্কার পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে তুলে ধরেন তিতুমীর।

তিনি আরও দাবি করেন, ট্রেজারি বন্ডের সুদের হার কমে আসা ব্যাংকিং খাতের স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফেরার একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত।

বিজ্ঞাপন

দারিদ্র্য হ্রাস ও ব্যাংকিং খাতের সংস্কারের পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি সরকারের অর্থনৈতিক কৌশলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য বলে জানান তিতুমীর। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী উৎপাদনভিত্তিক শিল্পকেন্দ্র বা ম্যানুফ্যাকচারিং হাব এবং রপ্তানি সম্প্রসারণের জন্য এক্সপোর্ট গেটওয়ে গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা বলেছেন।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

এই উদ্যোগের মাধ্যমে দেশে উৎপাদন বৃদ্ধি, রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে দরিদ্র পরিবারকে সহায়তা, কৃষক কার্ডের মাধ্যমে কৃষি খাতকে শক্তিশালী করা এবং শিল্প উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনাকে একই অর্থনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন তিনি।

মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে জ্বালানি, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও সার আমদানির ব্যয় বাড়ার আশঙ্কার কথাও তুলে ধরেন তিতুমীর। এসব পরিস্থিতিতে কৃষক ও পরিবহন খাতের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনা করে অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।

তিনি বলেন, ‘আমাদের মনে রাখতে হবে, আর কোনো মানুষ যেন দারিদ্র্যসীমার নিচে না চলে যায়।’

বিজ্ঞাপন

তিতুমীরের দাবি, অতীতের অর্থনৈতিক সংকট ও ব্যাংকিং খাতের ক্ষতির দায় বর্তমান সরকারের তৈরি না হলেও জনগণের স্বার্থে এসব সমস্যা মোকাবিলা করা হচ্ছে। সরকারের লক্ষ্য হলো সামাজিক সুরক্ষা জোরদার, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়িয়ে অর্থনীতিকে গতিশীল করা।

তবে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মাধ্যমে দারিদ্র্য হ্রাস এবং মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবিলায় কতটা সাফল্য আসবে, তা কর্মসূচির বাস্তবায়ন, উপকারভোগী নির্বাচনের স্বচ্ছতা এবং আর্থিক সহায়তার কার্যকারিতার ওপর নির্ভর করবে।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD