দোকানভেদে ফলের দামে আকাশ-পাতাল তফাত, নেই কোনো মূল্যতালিকা

পুরান ঢাকার বাদামতলী ফলের বাজারে একই ফল কিনতে গিয়ে দোকানভেদে দামের ভিন্নতার মুখে পড়ছেন ক্রেতারা। এক দোকানে যে দামে ফল বিক্রি হচ্ছে, পাশের দোকানেই সেই ফলের দাম পাওয়া যাচ্ছে কম কিংবা বেশি। কোথাও কোথাও কেজিপ্রতি ৪০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত ব্যবধান দেখা যাচ্ছে। অথচ বাজারের অধিকাংশ দোকানেই নেই দৃশ্যমান মূল্য তালিকা। ফলে ন্যায্য দাম যাচাই করতে এক দোকান থেকে অন্য দোকানে ঘুরতে হচ্ছে ক্রেতাদের।
বিজ্ঞাপন
সম্প্রতি ফল কিনতে বাদামতলী বাজারে গিয়ে এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন আইনজীবী এহসানুল হক। মাল্টা, আঙুর ও কমলার দাম জানতে কয়েকটি দোকানে ঘুরে দেখেন তিনি। কিন্তু প্রতিটি দোকানেই একই ফলের আলাদা দাম শুনতে হয় তাকে। এতে কিছুটা বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন এই ক্রেতা।
পুরান ঢাকার বাদামতলী দেশের অন্যতম বড় পাইকারি ফলের বাজার হিসেবে পরিচিত। প্রতিদিন ভোর থেকেই এখানে শুরু হয় ফলের বেচাকেনা। তবে সকাল গড়ানোর পর বিভিন্ন আড়তের সামনে এবং সদরঘাটসংলগ্ন এলাকায় পাইকারি বাজার থেকে ফল এনে খুচরা দামে বিক্রি করেন অনেক ব্যবসায়ী। এসব দোকান থেকেই ফল কিনতে আসেন আশপাশের এলাকার সাধারণ ক্রেতারা।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
বুধবার (৪ নভেম্বর) আইনজীবী এহসানুল হক বলেন, ‘একই ফলের দাম একেক দোকানে একেক রকম। কোন দোকানে কত দামে বিক্রি হচ্ছে, তা জানতে কয়েকটি দোকানে ঘুরতে হচ্ছে। বাজারে যদি মূল্য তালিকা থাকতো, তাহলে ক্রেতারা সহজেই দাম যাচাই করে ফল কিনতে পারতেন। বিশেষ করে পাইকারি ও খুচরা দামের পার্থক্য সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকাও জরুরি।’
শুধু এহসানুল হক নন, বাদামতলী বাজারে ফল কিনতে আসা অনেক ক্রেতাকেই একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। দেশি-বিদেশি নানা জাতের ফল দোকানগুলোতে সাজিয়ে রাখা হলেও অধিকাংশ বিক্রয়কেন্দ্রে পণ্যের দাম উল্লেখ করে কোনো তালিকা টাঙানো নেই। ফলে ক্রেতাদের প্রতিবার বিক্রেতার কাছে দাম জানতে হচ্ছে। একই সঙ্গে দরদাম করে পছন্দের ফল কেনার চেষ্টা করছেন তারা।
বিজ্ঞাপন
খুচরা বাজারে কেজিতে ৪০-৫০ টাকা বেশি
বাদামতলী ও আশপাশের ফলের বাজার ঘুরে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে ফলের দামে উল্লেখযোগ্য ব্যবধান রয়েছে। সাধারণত পাইকারি দরের তুলনায় খুচরা বাজারে কেজিপ্রতি ৪০ থেকে ৫০ টাকা বেশি দামে ফল বিক্রি হচ্ছে। তবে ফলের আকার, গুণগত মান ও গ্রেড অনুযায়ী এই ব্যবধান পরিবর্তিত হয়।
পুরান ঢাকার বিভিন্ন খুচরা বাজারে বর্তমানে মাল্টা বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ৩০০ থেকে ৩২০ টাকা। আঙুরের দাম ৩২০ থেকে ৪২০ টাকা, কমলা ৩০০ থেকে ৩২০ টাকা, পেয়ারা ৮০ থেকে ১০০ টাকা এবং ড্রাগন ফল ১২০ থেকে ১৫০ টাকা।
বিজ্ঞাপন
এ ছাড়া কাটিমন আম কেজিপ্রতি ৩০০ থেকে ৩২০ টাকা এবং ডালিম ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আকার ও মান অনুযায়ী প্রতিটি নারকেলের দাম রাখা হচ্ছে ৯০ থেকে ১২০ টাকা।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য অনুযায়ী, পাইকারি বাজারে এসব ফলের দাম খুচরা দরের তুলনায় কেজিপ্রতি প্রায় ৪০ থেকে ৫০ টাকা কম। তবে সব ধরনের ফলের ক্ষেত্রে একই ব্যবধান থাকে না। আমদানিমূল্য, সরবরাহ পরিস্থিতি এবং ফলের গুণগত মানের ওপর নির্ভর করে পাইকারি দর নির্ধারিত হয়।
এসব ফলের পাশাপাশি বাজারে পেঁপে, জাম্বুরা, কলা ও আমলকিসহ বিভিন্ন ধরনের ফল পাওয়া যাচ্ছে। মৌসুমি ফলের পাশাপাশি আমদানি করা ফলেরও রয়েছে ক্রেতাদের কাছে চাহিদা।
বিজ্ঞাপন
খেজুরের বাজারেও দামের ভিন্নতা
বাদামতলী বাজারে ফলের পাশাপাশি খেজুরেরও উল্লেখযোগ্য বেচাকেনা রয়েছে। বর্তমানে তিন কেজির সুক্কারি খেজুরের প্যাকেট বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৯৫০ টাকায়। পাঁচ কেজির কালমি খেজুরের দাম রাখা হচ্ছে ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকা। অন্যদিকে পাঁচ কেজির সুগাই খেজুর বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ১০০ টাকায়।
বাদামতলী ফল আড়তদার তাওয়াক্কুল এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘মূলত এই তিন ধরনের খেজুরই আমাদের বাজারে বেশি চলে। আমরা সাধারণত রমজান মাসকে কেন্দ্র করে একবারেই খেজুর আমদানি করি। এরপর সেগুলো সংরক্ষণ করে ক্রেতাদের কাছে সরবরাহ করা হয়। আমরা পাইকারি বিক্রি করি। খুচরা বাজারে কেজিপ্রতি ১০০ থেকে ২০০ টাকা বেশি দাম নিতে পারেন ব্যবসায়ীরা।’
বিজ্ঞাপন
বাজারের অধিকাংশ দোকানে মূল্য তালিকা দেখা না গেলেও তাওয়াক্কুল এন্টারপ্রাইজে পণ্যের দাম উল্লেখ করে তালিকা টাঙানো রয়েছে। এতে ক্রেতারা তুলনামূলক সহজে পণ্যের দাম সম্পর্কে ধারণা নিতে পারছেন।
দাম নির্ধারণে প্রভাব ফেলছে যেসব বিষয়
ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ফলের বিক্রয়মূল্য নির্ধারণে আমদানির খরচ, পরিবহন ব্যয়, সংরক্ষণ খরচ এবং পণ্যের মান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একই জাতের ফল হলেও আকার ও গ্রেডের পার্থক্যের কারণে দামেও ভিন্নতা থাকে।
বিজ্ঞাপন
এ ছাড়া পাইকারি বাজার থেকে ফল খুচরা বিক্রেতার দোকান পর্যন্ত পৌঁছাতে পরিবহনসহ বিভিন্ন ধরনের অতিরিক্ত ব্যয় যুক্ত হয়। এসব খরচের প্রভাব পড়ে চূড়ান্ত বিক্রয়মূল্যে। তবে দোকানভেদে দামের পার্থক্যের কারণে ক্রেতাদের পক্ষে প্রকৃত বাজারদর সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
বাদামতলী ফল ব্যবসায়ী সমিতির সদস্য রিফাত হাসান বলেন, ‘সঠিক মূল্য তালিকা প্রদর্শনে ব্যবসায়ীদের কিছুটা অনীহা রয়েছে। মূল্য তালিকা সামনে রাখা হলে ক্রেতারা উপকৃত হন। নানা সীমাবদ্ধতার কারণে ব্যবসায়ীরা সব সময় এটি মেনে চলতে পারেন না। তবে রমজান মাসে ব্যবসায়ী সমিতির উদ্যোগে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হওয়ায় সে সময় দোকানে মূল্য তালিকা প্রদর্শন করা হয়।’
ফলের দাম ওঠানামার কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘ফলের ক্যাটাগরি ও গ্রেডভেদে দামের পার্থক্য থাকে। এ কারণে দাম সব সময় ওঠানামা করে। সামনে শীত আসায় বাজারে ফলের সরবরাহ বেড়েছে। ফলে ধীরে ধীরে দাম কমে আসতে পারে।’
মূল্য তালিকা প্রদর্শনের দাবি ক্রেতাদের
বিজ্ঞাপন
বাদামতলী বাজারে ফলের পর্যাপ্ত সরবরাহ ও বৈচিত্র্য থাকলেও বিক্রয়মূল্যের স্বচ্ছতা নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে ক্রেতাদের মধ্যে। তাদের মতে, প্রতিটি দোকানে দৃশ্যমান মূল্য তালিকা থাকলে একই পণ্যের দাম সহজেই তুলনা করা সম্ভব হবে।
এতে একদিকে যেমন কেনাকাটার সময় ও ভোগান্তি কমবে, অন্যদিকে অযৌক্তিক দামে ফল বিক্রির প্রবণতাও নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হবে। ক্রেতাদের প্রত্যাশা, বাজার ব্যবস্থাপনায় নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি প্রতিটি দোকানে নিয়মিত মূল্য তালিকা প্রদর্শন নিশ্চিত করা হবে। এতে পাইকারি ও খুচরা দরের পার্থক্য সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাবেন সাধারণ মানুষ এবং ফল কেনাবেচায় বাড়বে স্বচ্ছতা।








