মিরাকল এক সাস্থ্য কেন্দ্রের নাম ‘ফটিকছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স’

দেশের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর একটি জগতের নাম- হাসপাতাল, স্বাস্থ্য কেন্দ্র এবং বেসরকারি ক্লিনিক। সরকারি হাসপাতাল থেকে বেসরকারি ক্লিনিকের অধিকাংশই জনবান্ধব বা সেবামূলক নয়। জন্মগতভাবেই যেন একেকটি কসাইখানা।
বিজ্ঞাপন
সবখানেই আষ্টেপিষ্টে জড়িয়ে আছে অবহেলা, চরম হয়রানি, অপারেশনের নামে বাইরে থেকে দফায় দফায় ওষুধ কিনে আনার জন্য স্লিপ ধরিয়ে দেয়া, টেষ্টের নামে অযাচিত ব্যয় করানোর নির্মমতা। সরকারি হাসপাতালে সময়মত ডাক্তার না আসা এ যেন এক চিরাচরিত প্রথা।
কৈফিয়ত নেওয়ার জন্য আরএমও, পরিচালক প্রভৃতি থাকলেও তাহারা যেন নির্জীব একেকটি জড় পদার্থ। মন্ত্রী, এমপি মাঝে মধ্যে অভিযান চালান এবং বলেন-‘ঠিকমত অফিস না করলে কারো চাকরি থাকবে না‘। এমন গর্জন শুনে সরকারি ডাক্তার স্যার ও ম্যাডামেরা মুচকি হেসে বলেন-‘ তোরা যে যা বলিস বল, মোরা কান করেছি ঢোল’।
সরকারি হাসপাতাল মানে নিপীড়নের এক মহাকেন্দ্র। নার্স, স্টুয়ার্ডদের দূর্ব্যবহার সহ্য করার মত নয়। তাদের ব্যবহার দেখে মনে হয় তারা এসেছেন কোন নিচু পরিবার বা নিকৃষ্ট কোন পরিবার থেকে। তারা জানেই না ভাল ব্যবহার কাকে বলে। সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ৭ নং ব্লকের ওটিতে দায়িত্ব পালন কারি সিনিয়র জনৈক নার্সকে এক ভদ্র লোক বলেই ফেললেন-‘ আপনি এক নিচু পরিবারের সন্তান, ব্যবহার ভাল করবেন, কারণ আপনি পাবলিকের কর্মচারি (বিগত ১৫/৬/২০২৬ ইং তারিখের ঘটনা)।
বিজ্ঞাপন
নার্সদের দূর্ব্যবহারে প্রতিদিন শত শত রোগী ও অভিবাবক হচ্ছেন নির্যাতিত। পরিচ্ছন্ন কর্মী ও আয়াদের ব্যবহার দেখলে মনে হয় তারা হাসপাতালের মালিক আর রোগী এবং রোগীর সাথে আসা লোকজন তার বাড়ির চাকর বাকর বা ক্ষয়রাতি। আপসোস স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরেও আমাদের হাসপাতাল রয়েই গেল কসাইখানা হিসেবে। সরকার আসে সরকার যায় কিন্তু হাসপাতালকে তৈরি করতে পারেনি জনপ্রিয় সেবামূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে।
অথচ এমপি, মন্ত্রী চলে যাচ্ছেন জনগণের টাকা খরচ করে চিকিৎসা নিতে বিদেশের মাটিতে। সরকারি হাসপাতালের ডাক্তার, নার্স এবং চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারিদের ধমকের সুরে কথা বলা এবং রূঢ় আচরণের কথা এমপি, মন্ত্রীরা সকলেই ভাল জানেন কিন্তু ক্ষমতায় যেয়ে ভুলে যায়।
নেয় না কারো বিরুদ্ধে এ্যাকশান। কারণ কথায় বলে ‘যে যায় লঙ্কায় সেই হয় রাবন‘। সরকারি হাসপাতালের অনিয়ম দূর্নীতির কথা বলে শেষ করার নয়। সেখানে সরকারি হুইল চেয়ারগুলো দখল করে ভাড়া দেয় দালাল চক্র। রোগি দিয়ে আসবে ১০০/= টাকা। রোগী নিচে দিয়ে যাবে ১০০/=। রোগী পরিবহনের জন্য ট্রলি খুঁজে পাওয়া যায় না। টাকা দিলে ট্রলি, ট্রেসার বেরিয়ে আসে। কি আজব আমাদের সরকারি হাসপাতাল গুলো! ড্রেসিং করাতে হলে টেপ এবং হ্যান্ড গ্লোবস কিনে না দিলে ড্রেসিং হয়না। জানি না সরকার দেয় কিনা তবে সহজ সংলাপ সাপ্লায় নেই কিনে আনুন।
বিজ্ঞাপন
জানি না দেশ কবে উন্নত হবে, স্বাস্থ্যখাত উন্নত হবে? প্রতিবছর জনগণের টাকায় হাজার কোটি টাকা বেতন দেওয়া হচ্ছে স্বাস্থ্যখাতের কর্মীদের অথচ সেবার নামে চলছে ভাওতাবাজী। ভাওতাবাজীর হাত থেকে বাঁচার জন্য প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ রোগী চলে যাচ্ছে দেশের বাইরে। রেখে আসছে গড়ে দুই হাজার কোটি টাকা।
খ) সরকারি বেসরকারি যে কোন হাসপাতাল হচ্ছে প্রসূতি মায়েদের জন্য এক মহাফাঁদ। প্রসূতি রোগি এলেই একটিই চিরাচরিত সংলাপ-‘রোগীর অবস্থা ভাল না, সিজার করতে হবে’। রোগী টাকা খরচ করতে পারবে কি না সে দিকে দেখার কোন ডাক্তার বা মালিক নেই। কোন কিুল কিনারা না পেয়ে অবশেষে রাজী হয়ে যায় প্রসূতির অভিবাবক। সিজারের টাকা জোগাতে হাজার হাজার অভিভাবক হয়ে পড়ে সর্বশান্ত। এখানেই শেষ নয় সিজার করার পরেও এদেশে হাজার হাজার প্রসূতিকে মেরে ফেলা হয়েছে। পরিনামে দেখা যায় হাসপাতাল ভাংচুর, ডাক্তার হয় লাঞ্চিত। অবশেষে দেখা যায় ডাক্তারদের ধর্মঘট। পরিশেষে জিতে যায় ডাক্তার। হেরে যায় সরকার এবং ক্ষতিগ্রস্থ্য রোগীর পরিবার। প্রিয় পাঠক, এত আফসোস এবং হতাশার মধ্যে থেকেও শোনাবো মিরাকল এক স্বাস্থ্য কেন্দ্রের অভূতপূর্ব গল্প্ যা রূপকথাকেও যেন হার মানিয়েছে এই সরকারি সেবামূলক প্রতিষ্ঠান। ব্যতিক্রমধর্মী এই চিকিৎসা কেন্দ্রের নাম ‘ফটিকছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স’। এখানে বিগত ১০ দিনে (৩/৬/২৬ থেকে ১৩/৬/২৬) স্বাভাবিক প্রসবের মাধ্যমে জন্ম নিয়েছে ৮৭ জন নবজাতক। তাছাড়া মা ও শিশু সকলেই সুস্থ্য। দেশ জুড়ে যখন সিজারিয়ান প্রসবের ক্রমবর্ধমান হার নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে তখন ফটিকছড়ির এই স্বাস্থ্য কেন্দ্র গড়ে তুলেছে এক ভিন্ন বাস্তবতা। হাসপাতালের নথি ঘেটে দেখা যায় ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত ৩ মাসে জন্ম নিয়েছে ৮২৮টি শিশু। ২০২৫ সালে এ সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৯৩১টি । বিগত পাঁচ বছরে ফটিকছড়ি স্বাস্থ্য কেন্দ্রে আলোর মুখ দেখেছে ১৯ হাজার সন্তান। মা ও শিশুর মৃত্যুর হার শূণ্য পারসেন্ট। এখানে সেবার মান বিদেশের মত। নেই কোন হয়রানী নেই কোন বিড়ম্বনা নেই কোন দূর্ব্যবহার। এ যেন এক মিরাকল ব্যাপার!! প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য উপদেষ্টা ডা. জায়েদ উর রহমান বলেছেন-‘স্বাস্থ্যখাতে অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে। স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে নিয়োজিত সকলকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা হবে’। এহেন বক্তব্য প্রয়োগ হোক, দুর্নীতিবাজদের শাস্তি হোক এটায় কামনা করে এ দেশের ভুক্তভোগিরা।








