Logo

যমুনা ভাঙনে ষষ্ঠবার বিলীন শতবর্ষী স্কুল, বাঁধেই চলছে পাঠদান

profile picture
জেলা প্রতিনিধি
বগুড়া
২৬ জুন, ২০২৬, ১৪:৩৯
যমুনা ভাঙনে ষষ্ঠবার বিলীন শতবর্ষী স্কুল, বাঁধেই চলছে পাঠদান
ছবি: সংগৃহীত

যমুনা নদীর অব্যাহত ভাঙনে আবারও বিলীন হয়েছে বগুড়ার শতবর্ষী চকরতিনাথ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠার ১০৭ বছর পর বিদ্যালয়টি এ নিয়ে ষষ্ঠবারের মতো নদীগর্ভে হারিয়ে গেলেও শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রম থেমে নেই। বিদ্যালয় ভবন না থাকায় বর্তমানে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ওপর অস্থায়ী টিনের ছাউনির নিচে চলছে পাঠদান।

বিজ্ঞাপন

গত ১৬ মে যমুনার তীব্র ভাঙনে বিদ্যালয় ভবনটি সম্পূর্ণ নদীগর্ভে চলে যায়। এরপর শিক্ষকদের উদ্যোগে বাঁধের ওপর টিনের ছাউনি নির্মাণ করে শ্রেণিকক্ষের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে এই অস্থায়ী ব্যবস্থায় শিক্ষাদান করতে গিয়ে নানা প্রতিকূলতার মুখে পড়তে হচ্ছে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের। বৃষ্টি হলে টিনের চালা দিয়ে পানি পড়ে বই-খাতা ভিজে যায়, আর দমকা বাতাস শুরু হলে শিক্ষার্থীদের গা ঘেঁষাঘেঁষি করে বসে ক্লাস করতে হয়।

১৯১৯ সালে প্রতিষ্ঠিত চকরতিনাথ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় একসময় এ অঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল। তখন বিদ্যালয়টিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৪৮২ জন। কিন্তু দীর্ঘদিনের নদীভাঙনে গ্রাম ও বসতি হারিয়ে বহু পরিবার অন্যত্র চলে যাওয়ায় বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। বর্তমানে এখানে মাত্র ৭৪ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে।

বিজ্ঞাপন

বিদ্যালয়ে ছয়জন শিক্ষক কর্মরত থাকলেও বর্তমানে দুজন প্রশিক্ষণে থাকায় চারজন শিক্ষক সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেই শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।

বিদ্যালয়ে পৌঁছানোও শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতিদিনের কঠিন লড়াই। চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী দিপু বাবু প্রতিদিন সুজাতপুর চর থেকে প্রায় আধা ঘণ্টা হেঁটে নদীর ঘাটে আসে। এরপর নৌকায় নদী পার হয়ে আরও প্রায় ২০ মিনিট হাঁটার পর বিদ্যালয়ে পৌঁছাতে হয়। তার ভাষ্য, বিদ্যালয়টি নিরাপদ স্থানে থাকলে পড়াশোনা ও খেলাধুলা—দুই ক্ষেত্রেই আরও ভালো সুযোগ পাওয়া যেত।

একই ধরনের দুর্ভোগের কথা জানিয়েছে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী সামিয়া। প্রতিদিন দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে বিদ্যালয়ে যেতে হয় তাকে। খেয়া নৌকা না পেলে বা আবহাওয়া প্রতিকূল থাকলে অনেক সময় বিদ্যালয়ে পৌঁছানো সম্ভব হয় না।

বিজ্ঞাপন

বিদ্যালয় ভবন নদীতে বিলীন হওয়ার পর শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া বন্ধ না রাখতে শিক্ষকরা নিজেদের অর্থ ব্যয় করে অস্থায়ী টিনের ছাউনি নির্মাণ করেছেন। সেখানেই নিয়মিত ক্লাস নেওয়া হচ্ছে।

ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক জিন্নাহ আলম জানান, গত প্রায় এক দশকে তার চোখের সামনেই বিদ্যালয়টি পাঁচবার নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এবার সেটি ষষ্ঠবারের মতো হারিয়ে গেল। নতুন স্থানে বিদ্যালয় স্থানান্তরের জন্য মাটি ভরাট ও ভবন নির্মাণে সরকারি বরাদ্দ চাওয়া হলেও এখন পর্যন্ত কোনো অর্থ বরাদ্দ পাওয়া যায়নি। বিদ্যালয়টি নতুন স্থানে স্থানান্তরের জন্য প্রায় ৮০ হাজার টাকা প্রয়োজন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

সহকারী শিক্ষক আমিনুল ইসলাম বলেন, বৃষ্টি শুরু হলে টিনের ছাউনি দিয়ে পানি পড়তে থাকে। তখন শিক্ষার্থীদের পাশের কোনো বাড়িতে আশ্রয় নিতে হয়। বৃষ্টি থামলে আবার পাঠদান শুরু করা হয়।

বিজ্ঞাপন

শুধু চকরতিনাথ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নয়, যমুনা তীরবর্তী সারিয়াকান্দি ও সোনাতলা উপজেলার আরও কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নদীভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, কামালপুর, হাটশেরপুর, শিমুলতাইড়, হাসনাপাড়া, ইছামারা, দড়িপাড়া ও কর্নিবাড়িসহ প্রায় ৮ থেকে ১০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। এর ফলে নয়াপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও করমজাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ও হুমকির মুখে পড়েছে।

ইতোমধ্যে নয়াপাড়া, চকরতিনাথ ও দক্ষিণ হাটবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠদান বিকল্প স্থানে অস্থায়ীভাবে পরিচালিত হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

নদীভাঙনের কারণে শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পুরো জনপদ। হাটশেরপুর ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্য বকুল মিয়ার ভাষ্য, গত কয়েক বছরে চকরতিনাথ, করমজাপাড়া, ধনেরপাড়া, কর্নিবাড়ি ও শিমুলবাড়ি গ্রামের প্রায় দেড় হাজার পরিবার ভিটেমাটি হারিয়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থী সংখ্যার ওপরও।

সারিয়াকান্দি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুমাইয়া ফেরদৌস জানান, উপজেলার চারটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় বর্তমানে নদীভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। এর মধ্যে একটি বিদ্যালয় ইতোমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে এবং সেটি স্থানান্তরের কাজ চলমান। উপজেলা শিক্ষা অফিস প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করছে এবং প্রশাসন এ বিষয়ে সহযোগিতা অব্যাহত রেখেছে। পাশাপাশি ভাঙন প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে বিষয়টি জানানো হয়েছে।

এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বগুড়া সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আরিফুল ইসলাম জানান, জেলার প্রায় ১১ কিলোমিটার নদীতীর বর্তমানে ভাঙনের কবলে রয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জরুরি ভিত্তিতে জিওব্যাগ ও জিওটিউব ডাম্পিং কার্যক্রম শুরু হয়েছে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের লক্ষ্যে স্থায়ী নদীতীর সংরক্ষণ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD