Logo

শিক্ষায় প্রযুক্তি ও এক্সেসিবিলিটি নিয়ে বিশ্বমঞ্চে তোরসা জহুর

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১৯:০৪
শিক্ষায় প্রযুক্তি ও এক্সেসিবিলিটি নিয়ে বিশ্বমঞ্চে তোরসা জহুর
ফাইল ছবি।

তথ্যপ্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির এই সময়ে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের মূলধারার শিক্ষায় অন্তর্ভুক্ত করা এবং ডিজিটাল বৈষম্য দূর করা বিশ্বজুড়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় গবেষণা, নেতৃত্ব ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সুনাম বাড়াচ্ছেন তরুণ গবেষক ও এক্সেসিবিলিটি বিশেষজ্ঞ তোরসা জহুর।

বিজ্ঞাপন

যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ডাকোটা অঙ্গরাজ্যে অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা, এক্সেসিবিলিটি ও লার্নিং ডিজএবিলিটি নিয়ে তাঁর কাজ ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্বীকৃতি পেয়েছে। সম্প্রতি ‘গ্রেটার গ্র্যান্ড ফোর্কস ইয়াং প্রফেশনালস’ কর্তৃক তিনি মর্যাদাপূর্ণ ‘২০২৬ ইয়াং প্রফেশনাল অব দ্য ইয়ার’ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। তরুণ পেশাজীবী হিসেবে তাঁর এই অর্জন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের তরুণ গবেষকদের সক্ষমতারও একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।

যুক্তরাষ্ট্রে এক্সেসিবিলিটি ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার ক্ষেত্রে দক্ষ শিক্ষকের সংকটের সময়ে তোরসা জহুরের গবেষণা ও পেশাগত কর্মকাণ্ড বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। তাঁর কাজের মূল লক্ষ্য হলো বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও সহজলভ্য, প্রযুক্তিনির্ভর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তোলা।

তোরসা জহুরের শিক্ষাজীবনের সূচনা দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষায়িত কমিউনিকেশন ডিজঅর্ডার্স বিভাগ থেকে তিনি স্নাতক এবং একই বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর শিক্ষাক্রমে মানব যোগাযোগ, ভাষা অর্জন, ভাষার স্নায়ুবিজ্ঞান, মনোভাষাবিজ্ঞান এবং শিশুদের ভাষাগত প্রতিবন্ধকতার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল।

বিজ্ঞাপন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক শিক্ষা শেষে তিনি বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ইন্টার্ন স্পিচ-ল্যাঙ্গুয়েজ প্যাথলজিস্ট হিসেবে কাজ করেন। পরে যুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক প্রকল্প ‘ক্লেফট ইউকে’ এবং লন্ডনের গ্রেট অরমন্ড স্ট্রিট হাসপাতালের প্লাস্টিক সার্জনদের যৌথ উদ্যোগে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে থেরাপিস্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

ক্লিনিক্যাল ক্ষেত্রে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের পর উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান তোরসা। বর্তমানে তিনি ইউনিভার্সিটি অব নর্থ ডাকোটায় টিচিং অ্যান্ড লিডারশিপ বিষয়ে পিএইচডি গবেষণা করছেন। ইতোমধ্যে তিনি কম্প্রিহেনসিভ পরীক্ষা সম্পন্ন করেছেন এবং পিএইচডি উপদেষ্টা কমিটির অধীনে শিক্ষকদের মাধ্যমে অন্তর্ভুক্তিমূলক শ্রেণিকক্ষ নিশ্চিত করার বিষয় নিয়ে গবেষণামূলক অভিসন্দর্ভের কাজ করছেন।

এর পাশাপাশি তিনি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কলেজ টিচিংয়ের ওপর বিশেষ গ্র্যাজুয়েট সার্টিফিকেট অর্জন করেছেন। ফলে গবেষণার পাশাপাশি উচ্চশিক্ষায় শিক্ষকতা ও নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও তাঁর দক্ষতা আরও বিস্তৃত হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় তোরসা জহুর শুধু একজন গবেষক হিসেবেই কাজ করছেন না, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমেও সক্রিয়ভাবে যুক্ত রয়েছেন। গ্র্যাজুয়েট টিচিং ইন্সট্রাক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ইউনিভার্সিটি অব নর্থ ডাকোটার কলেজ অব এডুকেশন অ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্টে এক্সেসিবিলিটি রিভিউয়ার হিসেবেও কাজ করেছেন তিনি।

এই দায়িত্বে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমে প্রকাশিত বিভিন্ন ডিজিটাল কনটেন্টকে আন্তর্জাতিক ওয়েব কনটেন্ট এক্সেসিবিলিটি গাইডলাইন এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিবন্ধী অধিকারবিষয়ক আইন অনুযায়ী আরও সহজলভ্য করার কাজে যুক্ত ছিলেন। স্ক্রিন রিডার উপযোগী কনটেন্ট তৈরি, ডিজিটাল কনটেন্টের ত্রুটি সংশোধন, ক্যাপশন তৈরি এবং নথির কাঠামোগত পরিমার্জনের মতো কাজেও তিনি ভূমিকা রেখেছেন।

শিক্ষা ও নেতৃত্বের স্বীকৃতি হিসেবে সম্প্রতি ইউনিভার্সিটি অব নর্থ ডাকোটার অ্যাসোসিয়েট ডিন সিলেকশন কমিটিতে একমাত্র গ্র্যাজুয়েট স্টুডেন্ট প্রতিনিধি হিসেবে মনোনীত হন তোরসা। একটি মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন একাডেমিক ডিন নির্বাচনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ায় তাঁর অন্তর্ভুক্তি প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্বে তাঁর গ্রহণযোগ্যতার বিষয়টি তুলে ধরে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেটের ডাইভারসিটি, ইকুইটি অ্যান্ড ইনক্লুশন কমিটির প্রতিনিধি হিসেবেও তিনি কাজ করছেন।

বিজ্ঞাপন

তোরসা জহুরের কাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিশেষ শিক্ষার সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়। তিনি এমন একটি প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগ বা প্ল্যাটফর্ম তৈরির কাজ করছেন, যেখানে ভার্চুয়াল বাস্তবতা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে শিক্ষকদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ মডিউল তৈরি করা হবে।

এই ব্যবস্থার মাধ্যমে শিক্ষকরা কৃত্রিম ত্রিমাত্রিক শ্রেণিকক্ষের পরিবেশে বাস্তবধর্মী সিমুলেশনের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ নিতে পারবেন। লিখন সমস্যা, ডিসলেক্সিয়া কিংবা বিভিন্ন ধরনের কথা বলার প্রতিবন্ধকতা রয়েছে—এমন শিক্ষার্থীদের কীভাবে পাঠদান করা যায়, সে বিষয়ে শিক্ষকরা ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পাবেন। একই সঙ্গে শ্রেণিকক্ষকে কীভাবে শুধু বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থী নয়, সব ধরনের শিক্ষার্থীর জন্য উপযোগী করা যায়, সেটিও এই প্রশিক্ষণের অংশ হবে।

তোরসার সাম্প্রতিক অর্জনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মর্যাদাপূর্ণ পেশাজীবী সংগঠন ‘আমেরিকান স্পিচ-ল্যাঙ্গুয়েজ-হিয়ারিং অ্যাসোসিয়েশন’-এর সদস্যপদ লাভও উল্লেখযোগ্য। স্পিচ-ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপি ও অডিওলজি পেশার সঙ্গে যুক্ত পেশাজীবীদের গুরুত্বপূর্ণ এই সংগঠনের সদস্যপদ তাঁর পেশাগত দক্ষতার আরেকটি স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

এ ছাড়া বৈশ্বিক শিক্ষামূলক প্রযুক্তি সংস্থা ‘অ্যাসোসিয়েশন ফর এডুকেশনাল কমিউনিকেশনস অ্যান্ড টেকনোলজি’-এর কালচার, লার্নিং অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগের গ্র্যাজুয়েট স্টুডেন্ট প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। ২০২৬ সালের আগস্ট থেকে শুরু হওয়া এই দায়িত্বে বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তিনির্ভর অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষাদান পদ্ধতি ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য নিয়ে কাজ করার সুযোগ পাচ্ছেন তোরসা।

ইউনিভার্সিটি অব নর্থ ডাকোটার অ্যাডভোকেসিভ বডি এক্সেসিবিলিটি ক্লাবের নেতৃত্বের সঙ্গেও যুক্ত রয়েছেন তিনি। ফলে গবেষণার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের জন্য একটি আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সহজলভ্য শিক্ষার পরিবেশ তৈরিতেও সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন।

লার্নিং ডিজএবিলিটি নিয়ে তোরসা জহুরের গবেষণা ও সচেতনতামূলক কর্মকাণ্ডও যুক্তরাষ্ট্রে আলোচনায় এসেছে। তাঁর তৈরি বিভিন্ন সচেতনতামূলক প্রদর্শনী ও বৈজ্ঞানিক পোস্টার গণমাধ্যমে গুরুত্ব পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক সংবাদপত্র ‘গ্র্যান্ড ফোর্কস হেরাল্ড’-এ তাঁর কাজ ও সাক্ষাৎকারও প্রকাশিত হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

এ ছাড়া গ্র্যাজুয়েট রিসার্চ অ্যাচিভমেন্ট ডেতে সামাজিক বিজ্ঞান ও শিক্ষা বিভাগে তাঁর উপস্থাপিত পোস্টার দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে। সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদাপূর্ণ ‘টর্চবেয়ারার স্কলারশিপ অ্যাওয়ার্ড’ প্রদান অনুষ্ঠানেও তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো হয়।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে এক্সেসিবিলিটি, লার্নিং ডিজএবিলিটি এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক শ্রেণিকক্ষ তৈরিতে দক্ষ ও অভিজ্ঞ শিক্ষকের প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে তোরসা জহুরের গবেষণা ও প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

গবেষণা, ক্লিনিক্যাল অভিজ্ঞতা, প্রযুক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্ব—সব ক্ষেত্রেই তোরসার ধারাবাহিক কর্মকাণ্ড তাঁকে আন্তর্জাতিক পরিসরে আলাদা পরিচিতি এনে দিয়েছে। তাঁর এই অর্জন শুধু যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষাক্ষেত্রে অবদান রাখার সুযোগ তৈরি করছে না, বরং বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের তরুণ গবেষকদের মেধা, দক্ষতা ও সম্ভাবনাকেও তুলে ধরছে।

বিজ্ঞাপন

বিশ্বজুড়ে যখন অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার জন্য দক্ষ জনবলের প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে, তখন তোরসা জহুরের গবেষণা ও উদ্ভাবনী নেতৃত্ব বাংলাদেশের জন্যও গর্বের বিষয় হয়ে উঠেছে। তাঁর কাজ ভবিষ্যতে প্রযুক্তিনির্ভর ও সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে।

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD