লালনসংগীতের কিংবদন্তি শিল্পী ফরিদা পারভীনের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

লালনসংগীতের কিংবদন্তি শিল্পী ও ‘লালনসম্রাজ্ঞী’খ্যাত ফরিদা পারভীনের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী আজ (১৩ সেপ্টেম্বর)। দীর্ঘদিন কিডনি জটিলতায় ভোগার পর গত বছরের এই দিনে মারা যান বরেণ্য এই শিল্পী। মৃত্যুর এক বছর পেরিয়ে গেলেও তার কণ্ঠের গান, সংগীতসাধনা এবং লালন সাঁইয়ের দর্শনের প্রতি নিবেদন এখনো শ্রোতাদের মনে গভীরভাবে স্মরণীয় হয়ে আছে।
বিজ্ঞাপন
ফরিদা পারভীন শুধু একজন সংগীতশিল্পী ছিলেন না, তিনি ছিলেন লালনগীতি ও বাঙালির লোকজ দর্শনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রচারক। তার কণ্ঠে লালন সাঁইয়ের গান দেশের সীমানা পেরিয়ে পৌঁছে যায় বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের শ্রোতার কাছে। লালনের মানবতাবাদ, জীবনবোধ ও দর্শনকে সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা ছিল অনন্য।
১৯৫৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর নাটোরের সিংড়া থানার শাওল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ফরিদা পারভীন। তবে তার শৈশব ও বেড়ে ওঠা কুষ্টিয়ায়। ছোটবেলায় মাগুরায় ওস্তাদ কমল চক্রবর্তীর কাছে সংগীতে হাতেখড়ি হয় তার।
১৯৬৮ সালে রাজশাহী বেতারের তালিকাভুক্ত শিল্পী হিসেবে নজরুলসংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে তার সংগীতজীবনের সূচনা। ১৯৭৩ সালের দিকে দেশাত্মবোধক গান গেয়ে তিনি পরিচিতি লাভ করেন। পরবর্তী সময়ে সাধক মোকছেদ আলী সাঁইয়ের কাছে লালনসংগীতে তালিম নেওয়া শুরু করেন। এরপর খোদা বক্স সাঁই, ব্রজেন দাস, বেহাল সাঁই, ইয়াছিন সাঁই ও করিম সাঁইয়ের কাছ থেকেও সংগীতের শিক্ষা নেন তিনি।
বিজ্ঞাপন
লালনের বাণী ও সুর সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে ফরিদা পারভীনের অবদান ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তার কণ্ঠে লালনের গান দেশের মানুষের পাশাপাশি বিদেশি শ্রোতাদের কাছেও জনপ্রিয়তা পায়। সংগীতের টানে তিনি দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরেছেন, পাশাপাশি গান পরিবেশন করেছেন বিশ্বের নানা দেশেও।
সংগীতে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৮৭ সালে একুশে পদক লাভ করেন ফরিদা পারভীন। ১৯৯৩ সালে ‘অন্ধ প্রেম’ চলচ্চিত্রের ‘নিন্দার কাঁটা’ গানের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা গায়িকার সম্মান পান তিনি। এরপর ২০০৮ সালে জাপান সরকারের ফুকুওয়াকা এশিয়ান কালচার পুরস্কারও অর্জন করেন এই শিল্পী।
শুধু সংগীত পরিবেশনেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না ফরিদা পারভীন। পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে লোকসংগীত ও লালনগীতি ছড়িয়ে দেওয়ার কাজেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। প্রায় ১৭ বছর আগে জীবনসঙ্গী প্রখ্যাত বংশীবাদক গাজী আবদুল হাকিমকে সঙ্গে নিয়ে ঢাকার তেজগাঁওয়ে প্রতিষ্ঠা করেন ‘অচিন পাখি সংগীত একাডেমি’।
বিজ্ঞাপন
এই একাডেমিতে লোকগান, নজরুলসংগীত, আধুনিক ও শাস্ত্রীয় সংগীতের পাশাপাশি ছবি আঁকা, গিটার ও তবলা শেখানো হয়। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে প্রায় ৮০ জন শিক্ষার্থী সংগীতের তালিম নিচ্ছেন। তিন বছর বয়সী শিশু থেকে শুরু করে অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তাও রয়েছেন শিক্ষার্থীদের মধ্যে।
ফরিদা পারভীনের মৃত্যুর এক বছর পরও তার প্রতিষ্ঠিত সংগীত একাডেমিতে অব্যাহত রয়েছে তার স্বপ্ন বাস্তবায়নের কাজ। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম একাই সামলাচ্ছেন গাজী আবদুল হাকিম।
ফরিদা পারভীনকে স্মরণ করে তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, তার শূন্যতা কখনো পূরণ হওয়ার নয়। তবে ফরিদা পারভীনের স্বপ্ন বাস্তবায়নে তারা কাজ করে যাচ্ছেন। বাংলা লোকগান বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে দেওয়ার যে স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন, শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে সেই স্বপ্ন এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
বিজ্ঞাপন
ফরিদা পারভীনের সঙ্গে পাঁচ দশকেরও বেশি সময়ের সম্পর্ক ছিল বরেণ্য সংগীতশিল্পী ফেরদৌসী রহমানের। তাদের সম্পর্ক ছিল বড় বোন ও ছোট বোনের মতো। প্রিয় শিল্পীকে স্মরণ করে ফেরদৌসী রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, অন্য অনেক শিল্পী মুখ দিয়ে গান গাইলেও ফরিদা পারভীনের গান শুনলে মনে হতো তিনি ভেতর থেকে গানটি অনুভব করে গাইছেন। গানের প্রতিটি কথা ও সারমর্ম উপলব্ধি করেই তিনি গান পরিবেশন করতেন।
ফেরদৌসী রহমান আরও বলেন, ফরিদা পারভীনের গান যেমন সহজ-সরল ও মিষ্টি ছিল, তার জীবনও ছিল তেমনই সরল। তার মধ্যে কোনো জটিলতা তিনি দেখেননি।
ফরিদা পারভীনের সন্তানদের ইচ্ছা ছিল, মাকে কুষ্টিয়া পৌর শহরে তার মা-বাবার কবরের পাশে সমাহিত করা হবে। শেষ পর্যন্ত সেই ইচ্ছাই পূরণ হয়েছে। কুষ্টিয়া পৌর কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন লালনসংগীতের এই কিংবদন্তি শিল্পী।
বিজ্ঞাপন
প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে ফরিদা পারভীনকে স্মরণ করে বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেল ও সংগীত প্রতিষ্ঠান নানা আয়োজন করেছে। বাংলাদেশ বেতারে আজ (১৩ সেপ্টেম্বর) প্রচারিত হবে তাকে নিয়ে এক ঘণ্টার বিশেষ অনুষ্ঠান। এতে তার গান পরিবেশন করবেন নাসরিন আক্তার বিউটি ও সাজিয়া সুলতানা পুতুল। বাঁশি বাজাবেন গাজী আবদুল হাকিম।
এ ছাড়া আজ সন্ধ্যায় অচিন পাখি সংগীত একাডেমিতেও থাকছে স্মরণ আয়োজন। সেখানে একাডেমির কর্মকর্তা ও শিক্ষার্থীরা ফরিদা পারভীনের জীবন এবং সংগীতে তার অবদান নিয়ে আলোচনা করবেন।
আগামী ২৬ সেপ্টেম্বর ঢাকার ধানমন্ডি ২৭ নম্বরের একটি মিলনায়তনে ফরিদা পারভীনের গান ও জীবন নিয়ে আরও একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে বলে জানিয়েছেন গাজী আবদুল হাকিম।
বিজ্ঞাপন
ফরিদা পারভীনের মৃত্যুর পর এক বছর ধরে তার কণ্ঠে নতুন কোনো গান শোনা যায়নি। তবে তার গাওয়া গান, শেখানো সুর, লালনের বাণী এবং সংগীতসাধনার উত্তরাধিকার এখনো বয়ে চলেছেন তার শিক্ষার্থীরা। গান ও সাধনায় রেখে যাওয়া সেই উত্তরাধিকারই বাঁচিয়ে রেখেছে লালনসম্রাজ্ঞী ফরিদা পারভীনের স্মৃতি।








