নিপাহ ভাইরাসে বাড়ছে আতঙ্ক, অনিরাপদ খেজুরের রসই বড় ঝুঁকি

বাংলাদেশে প্রাণঘাতী নিপাহ ভাইরাস আবারও বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ ভাইরাসে আক্রান্তদের মৃত্যুহার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে গত দুই বছরে শনাক্ত হওয়া সব রোগীরই মৃত্যু হয়েছে, যা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের গভীর চিন্তায় ফেলেছে। এর পাশাপাশি অমৌসুমে সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।
বিজ্ঞাপন
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণ ক্ষমতা ও মৃত্যুহার কোভিড-১৯-এর তুলনায় অনেক বেশি। খেজুরের কাঁচা রস ও বাদুড়ের সংস্পর্শে আসা ফলের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার বন্ধ করা না গেলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সংকট তৈরি হতে পারে বলে তারা সতর্ক করেছেন।
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) জানিয়েছে, ২০০১ সাল থেকে এ পর্যন্ত দেশে নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন ৩৪৭ জন, যার মধ্যে ২৪৯ জন মারা গেছেন। শুধু ২০২৪ সালে পাঁচজন এবং ২০২৫ সালে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। অর্থাৎ সর্বশেষ দুই বছরে আক্রান্ত হওয়া নয়জনের সবাই প্রাণ হারিয়েছেন।
বিশ্বব্যাপী নিপাহ ভাইরাসে গড় মৃত্যুহার প্রায় ৭২ শতাংশ হলেও বাংলাদেশে সাম্প্রতিক পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিজ্ঞাপন
অর্ধেকের বেশি জেলায় ছড়িয়েছে নিপাহ
আইইডিসিআরের তথ্যে জানা গেছে, গত ২৫ বছরে দেশের অন্তত ৩৫টি জেলায় নিপাহ ভাইরাসের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। ফরিদপুর, রাজবাড়ী, নওগাঁ ও লালমনিরহাটে তুলনামূলকভাবে রোগীর সংখ্যা বেশি। প্রতি বছর নতুন নতুন জেলায় সংক্রমণ ধরা পড়ায় ঝুঁকির পরিধি বাড়ছে।
বিজ্ঞাপন
আইইডিসিআরের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা শারমিন সুলতানা জানান, সাধারণত ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সময়কে নিপাহর মৌসুম ধরা হলেও ২০২৫ সালের আগস্টে রোগী শনাক্ত হওয়ায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, কেবল কাঁচা খেজুরের রস নয়, সংক্রমণের আরও উৎস থাকতে পারে।
তিনি বলেন, গত বছর প্রথমবারের মতো ভোলা জেলায় নিপাহ রোগী শনাক্ত হয়, যেখানে আগে কখনো এ ভাইরাসের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। একই সঙ্গে বাদুড়ের আধখাওয়া ফল থেকেও সরাসরি সংক্রমণের প্রমাণ মিলেছে। নওগাঁয় আট বছরের এক শিশুর ক্ষেত্রে অমৌসুমি সংক্রমণের বিষয়টি গবেষকদের নজরদারিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
অনলাইনে রস বিক্রি, শহরেও ঝুঁকি
বিজ্ঞাপন
খেজুরের রস এখন আর শুধু গ্রামাঞ্চলে সীমাবদ্ধ নেই। অনলাইন অর্ডার ও হোম ডেলিভারির মাধ্যমে রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে সহজেই পৌঁছে যাচ্ছে এই কাঁচা রস। এতে গ্রাম থেকে শহরে নিপাহ ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
ঢাকার বনশ্রী-রামপুরা এলাকায় অনলাইনে খেজুরের রস বিক্রি করা এক ব্যবসায়ী জানান, শীত মৌসুমে রসের চাহিদা বেশি থাকলেও এখন শীত না থাকলেও অর্ডার পাওয়া যায়। তিনি দাবি করেন, সংগ্রহের সময় গাছে জাল ও ঢাকনা ব্যবহার করা হয়, তবে পুরো প্রক্রিয়া নিজে যাচাই করার সুযোগ তাদের নেই।
আরও পড়ুন: মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার ফল প্রকাশ
বিজ্ঞাপন
নিপাহ ভাইরাস কতটা ভয়ংকর
নিপাহ একটি আরএনএ ভাইরাস, যা মূলত মস্তিষ্কে প্রদাহ সৃষ্টি করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মানুষের মধ্যে এর সংক্রমণের হার প্রায় ২৮ শতাংশ, যা কোভিডের তুলনায় অনেক বেশি। আক্রান্তদের মধ্যে যারা বেঁচে যান, তাদের অনেকেই দীর্ঘমেয়াদি স্নায়বিক জটিলতায় ভোগেন—স্মৃতিভ্রংশ, দৃষ্টিশক্তি হ্রাস ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় বাধা দেখা দেয়।
আইসিডিডিআরবি’র সংক্রামক রোগ বিভাগের সহযোগী বিজ্ঞানী ডা. সৈয়দ মঈনুদ্দিন সাত্তার জানান, মাঠপর্যায়ের তদন্তে দেখা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে রোগীরা কাঁচা খেজুরের রস না খেলেও বাদুড়ের আধখাওয়া ফলের মাধ্যমে সংক্রমিত হয়েছেন। এটি নিপাহ নিয়ন্ত্রণে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
বিজ্ঞাপন
‘ওয়ান হেলথ’ মডেলে নজরদারি
আইইডিসিআর বলছে, নিপাহ একটি জুনোটিক রোগ—যা প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে ছড়ায়। তাই তারা ‘ওয়ান হেলথ’ পদ্ধতিতে মানুষ, প্রাণী ও পরিবেশ—এই তিনটি বিষয়কে একসঙ্গে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। সংক্রমণ শনাক্তের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিশেষজ্ঞ দল মাঠে গিয়ে উৎস খোঁজা, সংক্রমণের চেইন চিহ্নিত করা এবং তা ভাঙার উদ্যোগ নেয়।
আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. তাহমিনা শিরিন জানান, সাম্প্রতিক সময়ে মা থেকে শিশুর শরীরে সংক্রমণের প্রমাণ পাওয়া গেছে, যা পরিবারকেন্দ্রিক ছড়ানোর ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, বাদুড়ের সংস্পর্শে আসা যেকোনো ফল বা খাবার থেকেই নিপাহ ছড়াতে পারে।
বিজ্ঞাপন
তিনি আরও বলেন, বন উজাড় ও পরিবেশ ধ্বংসের কারণে বন্যপ্রাণীর সঙ্গে মানুষের খাদ্য-চেইনের দূরত্ব কমে যাচ্ছে। এর ফলে ভাইরাস ‘স্পিল ওভার’-এর ঝুঁকিও বাড়ছে। তাই নিপাহ মোকাবিলায় কেবল চিকিৎসা নয়, সচেতনতা ও প্রতিরোধমূলক আচরণকে দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।








