রাজধানীজুড়ে বাড়ছে নতুন শঙ্কা, মিলল ম্যালেরিয়ার বাহক মশা

বাংলাদেশ ২০৩০ সালের মধ্যে ম্যালেরিয়া নির্মূলের লক্ষ্য নির্ধারণ করলেও রাজধানী ঢাকায় ম্যালেরিয়ার বাহক অ্যানোফিলিস মশার উপস্থিতি নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজধানীতে যদি স্থানীয়ভাবে ম্যালেরিয়া সংক্রমণ শুরু হয়, তাহলে তা নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে।
বিজ্ঞাপন
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে দেশে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন ৪৬০ জন। এর আগে ২০২৫ সালে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১০ হাজার ১৬২ জন, আর মৃত্যু হয়েছিল ১৬ জনের। যদিও চলতি বছরের আক্রান্তদের সবাই দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের ম্যালেরিয়া-প্রবণ ১১ জেলার বাসিন্দা।
তবে উদ্বেগের কারণ, ম্যালেরিয়ার জীবাণুবাহী স্ত্রী এলোফিলিস মশা (Anopheles mosquito) এখন রাজধানী ঢাকাতেও শনাক্ত হয়েছে। সম্প্রতি ৩ থেকে ৭ এপ্রিল পর্যন্ত ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ছয়টি জোনে পরিচালিত এক জরিপে এই মশার উপস্থিতি পাওয়া যায়।
বিজ্ঞাপন
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা ওই জরিপে মাত্র এক সপ্তাহে ৯৮টি অ্যানোফিলিস মশা শনাক্ত করেন। এছাড়া ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত একই ছয়টি জোনে মোট আড়াই হাজারের বেশি অ্যানোফিলিস মশা পাওয়া গেছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার জানান, এ পর্যন্ত ঢাকায় অ্যানোফিলিসের অন্তত ৯টি প্রজাতি শনাক্ত হয়েছে। তার মতে, এসব মশার ঘনত্ব উদ্বেগজনক এবং ভবিষ্যতে ঢাকায় ম্যালেরিয়া ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
ম্যালেরিয়ার ভয়াবহতা সম্পর্কে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি দ্রুত শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। গুরুতর সংক্রমণে মস্তিষ্ক, চোখ এবং অন্যান্য অঙ্গ আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে, যা অল্প সময়ের মধ্যেই প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফজলে রাব্বী চৌধুরী বলেন, সিভিয়ার ম্যালেরিয়া হলে রোগীর শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ দ্রুত বিকল হতে পারে। এমনকি এটি স্নায়ুতন্ত্রে সংক্রমণ ঘটিয়ে মারাত্মক জটিলতা তৈরি করতে সক্ষম।
সম্প্রতি বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমানের ম্যালেরিয়ায় মৃত্যু বিষয়টিকে আরও আলোচনায় নিয়ে এসেছে। যদিও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, তিনি মৃত্যুর কয়েকদিন আগে ক্যামেরুন সফর করেছিলেন। ফলে তার সংক্রমণ বিদেশে নাকি দেশে হয়েছে, তা এখনও নিশ্চিত নয়।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী সতর্ক করে বলেন, প্রতিবেশী মিয়ানমার ও ভারত থেকে বহু ওষুধ-প্রতিরোধী ম্যালেরিয়ার জীবাণু বাংলাদেশে প্রবেশের ঝুঁকি রয়েছে। এ অবস্থায় ঢাকায় অ্যানোফিলিস মশার উপস্থিতি নতুন করে ম্যালেরিয়া প্রতিরোধ কর্মসূচি জোরদারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছে।
বিজ্ঞাপন
আরেকটি উদ্বেগের বিষয় হলো, খোলা বাজারে ম্যালেরিয়ার ওষুধ সহজলভ্য নয়। বর্তমানে আক্রান্ত রোগীদের প্রয়োজন অনুযায়ী ওষুধ সরবরাহ করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সম্ভাব্য সংক্রমণ মোকাবিলায় পর্যাপ্ত ওষুধ ও চিকিৎসা প্রস্তুতি নিশ্চিত করা জরুরি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. জাহিদ রায়হান জানিয়েছেন, দেশে ম্যালেরিয়া চিকিৎসার জন্য পর্যাপ্ত ওষুধ, ভ্যাকসিন এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী মজুদ রয়েছে। যেখানে বিচ্ছিন্নভাবে ম্যালেরিয়ার সংক্রমণ দেখা দেবে, সেখানেই দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিজ্ঞাপন
বিশেষজ্ঞদের মতে, করোনার পর পুরোনো সংক্রামক রোগগুলো আবারও সক্রিয় হয়ে উঠছে। এই প্রেক্ষাপটে রাজধানীতে ম্যালেরিয়ার বাহক মশার উপস্থিতি জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। এখনই কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।







