হামের প্রকোপ: আক্রান্ত হচ্ছেন বড়রাও, টিকা নিয়েও বাড়ছে উদ্বেগ

রাজধানীতে হামের সংক্রমণ নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করছে। শুধু শিশু নয়, প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যেও এই রোগে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। হাসপাতালগুলোতে বিভিন্ন বয়সী রোগীর ভিড় পরিস্থিতির গভীরতাই তুলে ধরছে।
বিজ্ঞাপন
মহাখালীর ডিএনসিসি ডেডিকেটেড হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, পঞ্চম তলায় ভর্তি আছেন ৩৫ বছর বয়সী ঝর্ণা আক্তার। রামপুরার বাসিন্দা এই গৃহিণী হঠাৎ উচ্চ জ্বর, মাথাব্যথা ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হন। একদিন পর শরীরে র্যাশ দেখা দিলে প্রথমে অ্যালার্জি মনে করলেও অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরীক্ষার পর নিশ্চিত হয়, তিনি হামে আক্রান্ত।
তিনি জানান, কয়েকদিন আগে এক আত্মীয়ের শিশুর সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছিল, এরপরই অসুস্থ হয়ে পড়েন।
বিজ্ঞাপন
একই ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ২১ বছর বয়সী সিএনজি মিস্ত্রি মো. সোহেল। তার শরীরজুড়ে র্যাশ, সঙ্গে তীব্র চুলকানি। পরিবারের সদস্যরা জানান, কয়েকদিন ধরে তার চোখ খুলতে সমস্যা হচ্ছে এবং চোখ লাল হয়ে গেছে। চিকিৎসা চললেও উন্নতি ধীরগতির।
আরও কয়েকজন প্রাপ্তবয়স্ক রোগীও গুরুতর অবস্থায় চিকিৎসাধীন। সাভার থেকে আসা ৩২ বছর বয়সী মানিক হোসেন উচ্চ জ্বর ও ডায়রিয়ায় ভুগে ভর্তি হন।
অন্যদিকে, গাজীপুরের বাসিন্দা ২৯ বছর বয়সী আব্দুস সালামও জ্বর ও দুর্বলতায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তাদের স্বজনরা জানিয়েছেন, রোগের তীব্রতায় তারা স্বাভাবিকভাবে কথা বলা বা চোখ খোলার মতো শক্তিও হারিয়ে ফেলছেন।
বিজ্ঞাপন
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে ওই প্রতিষ্ঠানের পঞ্চম তলায় ৮ থেকে ৪৫ বছর বয়সী প্রায় ১২০ জন রোগী ভর্তি আছেন। একই সঙ্গে শিশুদের জন্য নির্ধারিত ওয়ার্ডগুলোতেও রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। ২ থেকে ৮ বছর বয়সী শতাধিক শিশু এবং দুই বছরের কম বয়সী তিন শতাধিক শিশু হামে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছে।
চিকিৎসকরা বলছেন, আগে ধারণা ছিল হাম মূলত শিশুদের রোগ। তবে এখন বড়দের মধ্যেও সংক্রমণ বাড়ছে। বিশেষ করে যাদের ছোটবেলায় টিকা নেওয়ার সুযোগ ছিল না বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তারা সহজেই আক্রান্ত হচ্ছেন। এমনকি টিকা নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যেও সংক্রমণের ঘটনা পাওয়া যাচ্ছে, যা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
শিশুদের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। অনেক শিশু নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় থাকার পরও হামে আক্রান্ত হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
হাসপাতালের একাধিক চিকিৎসক জানান, ভর্তি শিশুদের মধ্যে একটি অংশ এক বা দুই ডোজ এমআর টিকা নেওয়ার পরও সংক্রমিত হয়েছে। এদের অনেকের ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া বা ডায়রিয়ার মতো জটিলতা দেখা দিচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক এক জরিপেও উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। হাম-সন্দেহে পরীক্ষা করা দুই হাজারের বেশি শিশুর মধ্যে অর্ধেকের বেশি কোনো টিকা নেয়নি। তবে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু এক বা দুই ডোজ টিকা নেওয়ার পরও আক্রান্ত হয়েছে। নিশ্চিত রোগীদের বিশ্লেষণেও একই প্রবণতা দেখা গেছে—যেখানে টিকাবিহীন শিশুদের হার বেশি হলেও, টিকা নেওয়া শিশুর মধ্যেও সংক্রমণ রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকা নেওয়ার পরও আক্রান্ত হওয়ার পেছনে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল থাকা, পুষ্টিহীনতা কিংবা অন্যান্য স্বাস্থ্যগত কারণ ভূমিকা রাখতে পারে। এ পরিস্থিতিতে টিকাদান কর্মসূচি জোরদারের পাশাপাশি সচেতনতা বাড়ানো এবং আক্রান্তদের দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা।








