Logo

ভয়ংকর রূপে ফিরছে ম্যালেরিয়া, ছড়াচ্ছে পাহাড়ি এলাকা থেকে সমতলে

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
২০ এপ্রিল, ২০২৬, ১৮:৩৭
ভয়ংকর রূপে ফিরছে ম্যালেরিয়া, ছড়াচ্ছে পাহাড়ি এলাকা থেকে সমতলে
ছবি: সংগৃহীত

দেশে আবারও উদ্বেগজনকভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে ম্যালেরিয়া। সংক্রামক এই রোগটি মূলত স্ত্রী অ্যানোফিলিস মশার মাধ্যমে ছড়ালেও সাম্প্রতিক সময়ে পার্বত্য অঞ্চল থেকে ফিরে আসা পর্যটকদের মাধ্যমে এর বিস্তার সমতল এলাকাতেও বাড়ছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে এক শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তার মৃত্যুসহ বিভিন্ন এলাকায় নতুন করে সংক্রমণের খবর পরিস্থিতিকে আরও শঙ্কাজনক করে তুলেছে।

বিজ্ঞাপন

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ১৬ জনের মৃত্যু হয়। চলতি বছরেও সংক্রমণ বাড়তির দিকে, বছরের প্রথম তিন মাসেই আক্রান্ত হয়েছেন ৪৬০ জন। যা দেশের ম্যালেরিয়া নির্মূল পরিকল্পনার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।

সম্প্রতি পার্বত্য জেলা বান্দরবানের দুর্গম এলাকায় ভ্রমণ শেষে ঢাকায় ফিরে আসা কয়েকজনের মধ্যে ম্যালেরিয়ার লক্ষণ দেখা যায়। গত ২১ মার্চ একটি পর্যটক দল সাঙ্গু ও মাতামুহুরি রিজার্ভ ফরেস্ট এলাকায় ভ্রমণে যায় এবং সেখানে কয়েকদিন তাঁবু ও জুমঘরে অবস্থান করে। ভ্রমণ শেষে রাজধানীতে ফেরার প্রায় ১০ দিন পর দলের কয়েকজন সদস্য জ্বরে আক্রান্ত হন। তাদের মধ্যে কবি নজরুল কলেজের এক শিক্ষার্থীসহ আরও কয়েকজনের শরীরে তীব্র জ্বর, মাথাব্যথা ও দুর্বলতা দেখা দেয়।

বিজ্ঞাপন

অবস্থা গুরুতর হলে ওই শিক্ষার্থীকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং পরে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকদের মতে, তার উপসর্গের মধ্যে কালো প্রস্রাবের মতো গুরুতর লক্ষণও ছিল, যা ম্যালেরিয়ার জটিল অবস্থার ইঙ্গিত দেয়। দ্রুত চিকিৎসা শুরু করায় বর্তমানে তিনি কিছুটা সুস্থ রয়েছেন।

চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, গত দুই সপ্তাহেই রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে একাধিক ম্যালেরিয়া রোগী শনাক্ত হয়েছে। কেউ কেউ প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েই বাড়ি ফিরে গেছেন, আবার কেউ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাহাড়ি বা ম্যালেরিয়াপ্রবণ এলাকায় ভ্রমণের পর এক মাসের মধ্যে জ্বর দেখা দিলে অবহেলা না করে দ্রুত পরীক্ষা করানো জরুরি। সময়মতো চিকিৎসা না নিলে রোগটি প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। পাশাপাশি দেশের সব জায়গায় ম্যালেরিয়ার ওষুধ সহজলভ্য না থাকায় বিশেষায়িত হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

পরিসংখ্যান বলছে, দেশে ম্যালেরিয়ার সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি রয়েছে পার্বত্য জেলাগুলোতে। বান্দরবানে আক্রান্তের সংখ্যা সর্বোচ্চ, যা মোট রোগীর প্রায় অর্ধেক। এরপর রয়েছে রাঙামাটি, কক্সবাজার ও খাগড়াছড়ি। চলতি বছরেও মূলত এসব এলাকাতেই সংক্রমণ বেশি শনাক্ত হচ্ছে।

গত কয়েক বছরে ম্যালেরিয়ার সংক্রমণে ওঠানামা দেখা গেলেও সাম্প্রতিক সময়ে তা আবার বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে স্থবিরতা, বরাদ্দ অর্থের যথাযথ ব্যবহার না হওয়া এবং অপারেশন প্ল্যান বন্ধ থাকার কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।

বিজ্ঞাপন

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ২০২৭ সালের মধ্যে ম্যালেরিয়াজনিত মৃত্যু শূন্যে নামানো এবং ২০৩০ সালের মধ্যে সংক্রমণ নির্মূলের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে এই লক্ষ্য অর্জন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এমনকি কেউ কেউ বলছেন, লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে আরও কয়েক বছর অতিরিক্ত সময় লাগতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। মশা নিধন কার্যক্রম জোরদার করা, কীটনাশকযুক্ত মশারি ব্যবহার বাড়ানো, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে সচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি। একইসঙ্গে স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে মশার উৎপত্তিস্থল ধ্বংস এবং প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

সামগ্রিকভাবে, পার্বত্য এলাকা থেকে সমতলে ম্যালেরিয়ার বিস্তার নতুন করে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। তাই এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে বলে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD