আদ্-দ্বীন হাসপাতাল বন্ধের সিদ্ধান্তে দিশেহারা ৭৬ রোগী

সংবাদ প্রকাশের পরও উদ্বেগ কাটছে না রাজধানীর আদ্-দ্বীন হাসপাতালের মগবাজার শাখায় চিকিৎসাধীন রোগী ও তাদের স্বজনদের। হাসপাতালটির লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার পর সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছেন নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ), নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (এনআইসিইউ), এইচডিইউ, সিসিইউ এবং অন্যান্য বিশেষায়িত ইউনিটে চিকিৎসাধীন রোগীরা। বিকল্প হাসপাতালে সিট না পাওয়া এবং অতিরিক্ত চিকিৎসা ব্যয়ের আশঙ্কায় অসহায় হয়ে পড়েছেন তারা।
বিজ্ঞাপন
বর্তমানে হাসপাতালটিতে চিকিৎসাধীন ৭৬ জন রোগীর স্বজন এক যৌথ আবেদনের মাধ্যমে কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ জানিয়েছেন, যাতে রোগীদের চিকিৎসা সম্পন্ন করার জন্য অন্তত কিছু সময় হাসপাতালটি চালু রাখার সুযোগ দেওয়া হয়। তাদের দাবি, অধিকাংশ রোগীই গুরুতর অবস্থায় রয়েছেন এবং হঠাৎ করে অন্য হাসপাতালে স্থানান্তর করা ঝুঁকিপূর্ণ।
হাসপাতালের এনআইসিইউতে ভর্তি যমজ সন্তানের বাবা মো. রাকিব হাসান জানান, সন্তানদের জন্য কয়েকদিন ধরে রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে এনআইসিইউ সিট খুঁজে বেড়িয়েও তিনি সফল হননি। পরে সহায়তার আশায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে গেলেও প্রত্যাশিত সহযোগিতা পাননি।
বিজ্ঞাপন
তার ভাষ্য, তুলনামূলক কম খরচে ভালো চিকিৎসা পাওয়ার কারণেই তিনি আদ্-দ্বীন হাসপাতালে এসেছিলেন। এখন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অন্যত্র স্থানান্তরের পরামর্শ দিলেও বাস্তবে কোথাও সিট মিলছে না। দুই নবজাতক সন্তানকে নিয়ে তিনি চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন।

রোগীদের স্বজনদের দেওয়া আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগে থাকা রোগীদের মধ্যে অনেকে সংকটাপন্ন। এমনকি হাম আক্রান্ত শিশুও রয়েছে। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলোর পক্ষে নতুন হাসপাতালে ভর্তি, চিকিৎসা ব্যয় বহন এবং দ্রুত সিট পাওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ কারণে তারা চিকিৎসা অব্যাহত রাখার জন্য প্রয়োজনীয় সময় ও অনুমোদন চেয়েছেন।
হাসপাতাল প্রাঙ্গণে কথা হয় কয়েকজন রোগীর স্বজনের সঙ্গে। তাদের অভিযোগ, বিকল্প চিকিৎসার আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে কোনো কার্যকর সহায়তা পাচ্ছেন না তারা। সরকারি হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ ও এনআইসিইউ সিটের সংকট রয়েছে, আর বেসরকারি হাসপাতালের ব্যয় বহন করার সামর্থ্য অধিকাংশ পরিবারের নেই।
বিজ্ঞাপন
স্বজনদের একজন রিক্তা আক্তার বলেন, তার বোনের নবজাতক সন্তান বর্তমানে এনআইসিইউতে চিকিৎসাধীন। দীর্ঘ চেষ্টা করেও অন্য কোথাও সিট না পাওয়ায় তারা হাসপাতালটিতেই চিকিৎসা চালিয়ে যেতে চান। তার মতে, শুধু বর্তমান রোগী নয়, এলাকার বহু মানুষ দীর্ঘদিন ধরে এই প্রতিষ্ঠানের চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করে আসছেন। তাই হাসপাতালটি বন্ধ হয়ে যাক— এমনটা তারা চান না।
শুধু কয়েকজন নয়, হাসপাতালটিতে বর্তমানে থাকা অধিকাংশ রোগী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য প্রায় একই। অনেকেই মনে করছেন, পর্যাপ্ত প্রস্তুতি এবং বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত না করেই হাসপাতাল বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
এদিকে রোগীদের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, রোগীর স্বজনদের সঙ্গে অসহযোগিতামূলক আচরণের অভিযোগ তার জানা নেই। তিনি দাবি করেন, রোগী স্থানান্তরে সহায়তার জন্য সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল পরিচালককে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। রোগীর স্বজনরা চাইলে হাসপাতাল পরিচালক কিংবা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছ থেকেও সহায়তা নিতে পারবেন।
তবে বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন বলে দাবি করেছেন একাধিক স্বজন। তাদের একজন জানান, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আইসিইউ সিটের জন্য তারা অপেক্ষমাণ তালিকায় অনেক পেছনে রয়েছেন। কয়েকবার খোঁজ নিতে গিয়ে উল্টো বিরূপ আচরণেরও মুখোমুখি হতে হয়েছে। তার প্রশ্ন, সাধারণ মানুষ কি আদৌ সহজে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে পৌঁছাতে পারেন?
উল্লেখ্য, গত ২৭ মে ভোর থেকে সকাল পর্যন্ত কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে আদ্-দ্বীন হাসপাতালের নবজাতক বিভাগে এক থেকে চার দিন বয়সী ছয় শিশুর মৃত্যুর ঘটনা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর তদন্ত শুরু করে এবং হাসপাতালের পোস্ট-অপারেটিভ ইউনিট সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়। পরবর্তীতে দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
বিজ্ঞাপন
তদন্ত প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতায় গত ১১ জুন আদ্-দ্বীন হাসপাতালের মগবাজার শাখার লাইসেন্স বাতিল করা হয়। এরপর থেকেই সেখানে চিকিৎসাধীন রোগী ও তাদের স্বজনদের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ আরও বেড়ে গেছে।








