Logo

স্বাস্থ্যসেবার নেপথ্যের যোদ্ধা বেসরকারি নার্স-মিডওয়াইফরা

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
১৬ জুন, ২০২৬, ১৩:৫০
স্বাস্থ্যসেবার নেপথ্যের যোদ্ধা বেসরকারি নার্স-মিডওয়াইফরা
ছবি এআই।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবার অন্যতম প্রধান ভিত্তি দক্ষ নার্স ও মিডওয়াইফ। চিকিৎসকের নির্দেশনা বাস্তবায়ন থেকে শুরু করে রোগীর সার্বক্ষণিক পরিচর্যা—সব ক্ষেত্রেই তাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিজ্ঞাপন

সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি দেশের বেসরকারি নার্সিং কলেজগুলোও দীর্ঘদিন ধরে দক্ষ জনবল তৈরি করে স্বাস্থ্যখাতকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে। বিশেষ করে মাতৃ ও শিশুমৃত্যু হ্রাসে এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মিডওয়াইফদের ভূমিকা ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে।

তবে এই অবদানের পরও বেসরকারি নার্সিং ও মিডওয়াইফারি শিক্ষার্থীরা এখনও নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে রয়েছেন। ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিস, ইন্টার্নশিপ সুবিধা এবং সরকারি ভাতার ক্ষেত্রে তারা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ।

বিজ্ঞাপন

বরিশালের রাজধানী নার্সিং কলেজের অধ্যক্ষ সেলিনা আক্তার জানান, নার্সিং এমন একটি পেশা যেখানে তাত্ত্বিক জ্ঞানের পাশাপাশি ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। পাঠ্যক্রম অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের সপ্তাহে তিন দিন শ্রেণিকক্ষে পাঠ নিতে হয় এবং বাকি তিন দিন হাসপাতালে রোগীদের সঙ্গে সরাসরি কাজ করে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হয়।

তিনি আরও বলেন, বিএসসি ইন নার্সিং চার বছর মেয়াদি, ডিপ্লোমা ইন নার্সিং সায়েন্স অ্যান্ড মিডওয়াইফারি এবং ডিপ্লোমা ইন মিডওয়াইফারি তিন বছর মেয়াদি কোর্স। এসব কোর্স সম্পন্ন করার পর শিক্ষার্থীদের ছয় মাসের ইন্টার্নশিপ করতে হয়। এরপর বাংলাদেশ নার্সিং ও মিডওয়াইফারি কাউন্সিলের লাইসেন্সিং পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেই তারা পেশাগতভাবে কাজ করার অনুমতি পান।

নার্সিং শিক্ষার ক্ষেত্রে ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরে বরিশাল সরকারি নার্সিং কলেজের অধ্যক্ষ হোসনেরা আখতার এবং শিক্ষক ডা. মো. আলী আজগর বলেন, কেবল বই পড়ে বা ল্যাবে কৃত্রিম পরিবেশে প্রশিক্ষণ নিয়ে একজন দক্ষ নার্স তৈরি করা সম্ভব নয়। বাস্তব রোগী ও হাসপাতালভিত্তিক কাজের অভিজ্ঞতাই একজন শিক্ষার্থীকে পরিপূর্ণ দক্ষ করে তোলে।

বিজ্ঞাপন

শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. এ কে এম নাজমূল আহসান বলেন, আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থায় দক্ষ নার্সের বিকল্প নেই। বিশেষ করে আইসিইউ বা সিসিইউর মতো গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে কাজ করতে হলে উচ্চমানের প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। সরকারি ও বেসরকারি উভয় প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা হাসপাতালে প্র্যাকটিস করায় রোগী ও শিক্ষার্থী—দুই পক্ষই উপকৃত হচ্ছে।

দেশের স্বাস্থ্যখাতে দীর্ঘদিন ধরেই নার্স সংকট একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বরিশাল বিভাগের স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়ের উপপরিচালক ডা. মোহাম্মদ লোকমান হাকিম বলেন, দেশে চিকিৎসক নিয়োগ বাড়লেও সেই অনুপাতে নার্স নিয়োগ হয়নি। অথচ আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী একজন চিকিৎসকের বিপরীতে একাধিক নার্স থাকা প্রয়োজন।

এই সংকট মোকাবিলায় বেসরকারি নার্সিং শিক্ষার্থীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। বরিশাল সরকারি নার্সিং কলেজের সিনিয়র স্টাফ নার্স বাসন্তী রানী বিশ্বাস বলেন, হাসপাতালে অনেক সময় সীমিত জনবল দিয়ে বিপুল সংখ্যক রোগীর সেবা দিতে হয়। সে সময় প্রশিক্ষণরত শিক্ষার্থীরা দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ায় কাজ অনেক সহজ হয়ে যায়।

বিজ্ঞাপন

হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরাও এসব শিক্ষার্থীর সেবার প্রশংসা করেছেন। তাদের মতে, সিনিয়র নার্সরা ব্যস্ত থাকলে শিক্ষার্থীরাই দ্রুত এগিয়ে এসে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেন।

মাতৃস্বাস্থ্য সুরক্ষায় মিডওয়াইফদের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেলিনা আক্তার বলেন, একজন মিডওয়াইফকে একই সঙ্গে মা ও নবজাতকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হয়। দক্ষ মিডওয়াইফ প্রসবকালীন জটিলতা কমিয়ে মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করতে সক্ষম।

তবে মাঠপর্যায়ে কর্মপরিবেশ এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। হোসনেরা আখতার জানান, অনেক ক্ষেত্রে একজন নার্স বা মিডওয়াইফকে বিপুলসংখ্যক রোগীর দায়িত্ব নিতে হয়। প্রসূতি ওয়ার্ডে অতিরিক্ত ভিড় এবং দর্শনার্থীদের উপস্থিতির কারণে সেবা কার্যক্রম ব্যাহত হয়। ফলে সেবার মান ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

বিজ্ঞাপন

এত দায়িত্ব পালন করলেও বেসরকারি নার্সিং কলেজের শিক্ষার্থীরা কোনো সরকারি ভাতা পান না। রাজধানী নার্সিং কলেজের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ নিয়াম ও সানজিদা আক্তার মিম জানান, হাসপাতালে কাজের মাধ্যমে তারা বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেন, কিন্তু সরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের মতো ইন্টার্নশিপ ভাতা তাদের জন্য নেই। ফলে পুরো শিক্ষাজীবনের ব্যয় নিজেদের বা পরিবারের ওপরই বহন করতে হয়।

একই কলেজের শিক্ষার্থী অঙ্কিতা হালদার ও সাথী আক্তার বলেন, ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিস নার্সিং শিক্ষার অপরিহার্য অংশ। যথাযথ প্রশিক্ষণ ছাড়া দক্ষতা অর্জন অসম্ভব। তাই তারা বেসরকারি শিক্ষার্থীদের জন্য আরও উন্নত প্রশিক্ষণ সুবিধা ও সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানান।

বরিশালের ডিডাব্লিউএফ নার্সিং কলেজের অধ্যক্ষ বলেন, তাদের প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা দেশের নামকরা হাসপাতালের পাশাপাশি বিদেশেও সুনামের সঙ্গে কাজ করছেন। তিনি মনে করেন, প্রতিটি বেসরকারি নার্সিং কলেজের জন্য নিজস্ব হাসপাতাল বা নির্ধারিত প্র্যাকটিস ফিল্ড থাকলে শিক্ষার্থীরা আরও কার্যকরভাবে প্রশিক্ষণ নিতে পারবে।

বিজ্ঞাপন

এদিকে নার্সিং পেশার মর্যাদা ও কর্মপরিবেশ উন্নয়নের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ও পেশাজীবীরা। তাদের মতে, নার্সদের যথাযথ মূল্যায়ন, উন্নত বেতন এবং জীবনমান নিশ্চিত করা গেলে স্বাস্থ্যসেবার মান আরও বাড়বে। একজন সন্তুষ্ট ও মানসিকভাবে সুস্থ নার্সই রোগীদের সর্বোচ্চ সেবা দিতে পারেন।

বাংলাদেশ নার্সিং ও মিডওয়াইফারি কাউন্সিলের রেজিস্ট্রার হালিমা আক্তার বলেন, নার্সিং শিক্ষায় ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিস ও ইন্টার্নশিপের বিকল্প নেই। শতভাগ ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ ছাড়া কোনো শিক্ষার্থী কর্মক্ষেত্রে দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে পারবে না।

বিজ্ঞাপন

তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক মানের নার্স তৈরি করতে হলে তাত্ত্বিক জ্ঞানের পাশাপাশি হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের ওপর সমান গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে সমাজের সব শ্রেণির মানুষের সহযোগিতায় শিক্ষার্থীদের জন্য হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একটি উপযুক্ত শেখার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। তবেই দেশের নার্সিং শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা সম্ভব হবে।

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD