Logo

চট্টগ্রামে বাড়ছে জলাতঙ্ক ঝুঁকি, টিকার সংকটে বিপাকে আহতরা

profile picture
জেলা প্রতিনিধি
চট্টগ্রাম
১৫ জুন, ২০২৬, ১৮:৩১
চট্টগ্রামে বাড়ছে জলাতঙ্ক ঝুঁকি, টিকার সংকটে বিপাকে আহতরা
ছবি : জনবাণী গ্রাফিক্স

চট্টগ্রামে কুকুর, বিড়ালসহ বিভিন্ন প্রাণীর কামড় ও আঁচড়ে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। একই সময়ে সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে জলাতঙ্ক প্রতিরোধী টিকার সীমিত সরবরাহের কারণে ভোগান্তিতে পড়ছেন রোগী ও তাদের স্বজনরা। ফলে অনেকেই বাধ্য হয়ে উচ্চমূল্যে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে টিকা সংগ্রহ করছেন।

বিজ্ঞাপন

চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রাণীর কামড় বা আঁচড়ে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নেওয়া মানুষের সংখ্যা গত কয়েক বছরে ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ২০২১ সালে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৫ হাজার ১৬৯ জন। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৭ হাজার ৬৩ জনে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত মাত্র চার মাসেই আক্রান্ত হয়েছেন ২ হাজার ৭৫২ জন।

চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের তথ্য বলছে, গত পাঁচ বছরে সেখানে জলাতঙ্ক প্রতিরোধী ভ্যাকসিন গ্রহণকারীর সংখ্যা প্রায় চার গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। রোগীর চাপ বেড়ে যাওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে সরকারি হাসপাতালের সক্ষমতা ছাড়িয়ে যাচ্ছে পরিস্থিতি। ফলে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষকে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

জেলার বিভিন্ন উপজেলা ও উপকূলীয় এলাকাতেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে সীতাকুণ্ডে গত পাঁচ বছরে আক্রান্তের সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়েছে। একইভাবে বাঁশখালী, পটিয়া ও সন্দ্বীপেও প্রাণীর কামড় ও আঁচড়ের ঘটনা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু কুকুর নয়, বিড়াল, শিয়ালসহ অন্যান্য প্রাণীর মাধ্যমেও জলাতঙ্ক সংক্রমিত হতে পারে। বর্তমানে শহর ও গ্রামাঞ্চলে পোষা প্রাণী পালনের প্রবণতা বাড়লেও অনেক ক্ষেত্রে নিয়মিত টিকাদান নিশ্চিত করা হচ্ছে না। এতে মানুষ ঝুঁকির মুখে পড়ছে।

চিকিৎসকরা বলছেন, প্রাণীর কামড় বা আঁচড়ের পর অনেকেই দ্রুত হাসপাতালে না গিয়ে স্থানীয় চিকিৎসা বা কুসংস্কারের আশ্রয় নেন। এতে সময় নষ্ট হয় এবং রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। জলাতঙ্কের লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার পর অধিকাংশ ক্ষেত্রে রোগীকে বাঁচানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। তাই দ্রুত চিকিৎসা ও টিকাদানই একমাত্র কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা।

বিজ্ঞাপন

সম্প্রতি ফটিকছড়ির নাজিরহাট এলাকায় দুই দিনে দুটি কুকুরের হামলায় নারী ও শিশুসহ ১৯ জন আহত হন। তাদের মধ্যে কয়েকজন স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসা পেলেও অনেককে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠাতে হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, উপজেলা পর্যায়ে পর্যাপ্ত টিকা না থাকায় আহতদের চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে।

যদিও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দেশে জলাতঙ্ক প্রতিরোধী টিকার পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকার কথা বলা হয়েছে, মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে। বিভিন্ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রোগীর চাপের তুলনায় টিকার সরবরাহ অনেক সময় পর্যাপ্ত থাকে না।

জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যমতে, চট্টগ্রামের ১৫টি উপজেলায় স্থানীয় চাহিদা বিবেচনায় ভ্যাকসিন সরবরাহ করা হয়েছে। তবে বিভিন্ন অঞ্চলে আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রয়োজনের তুলনায় সরবরাহকে অপর্যাপ্ত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিজ্ঞাপন

এদিকে জলাতঙ্ক প্রতিরোধে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নগরজুড়ে পথকুকুর টিকাদান কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে। চলতি বছরে নগরের ৪১টি ওয়ার্ডে ১৫ হাজারের বেশি পথকুকুরকে টিকার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। একইসঙ্গে জেলা পর্যায়েও বিভিন্ন এলাকায় কুকুরের গণ-টিকাদান কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

প্রাণিসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, শুধু মানুষকে টিকা দিলেই হবে না; কুকুর, বিড়াল ও জলাতঙ্ক বহন করতে সক্ষম অন্যান্য প্রাণীকেও ব্যাপক হারে টিকাদানের আওতায় আনতে হবে। শতভাগ কভারেজ নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে জলাতঙ্ক নির্মূল করা সম্ভব হবে।

বিজ্ঞাপন

স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রামে বছরে প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ হাজার মানুষ জলাতঙ্ক প্রতিরোধী টিকা গ্রহণ করেন। একজন রোগীর সাধারণত তিন থেকে চার ডোজ প্রয়োজন হয়। সে হিসাবে বছরে এক লাখেরও বেশি ডোজ ভ্যাকসিনের চাহিদা তৈরি হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাণীর সংখ্যা বৃদ্ধি, পথকুকুরের বিস্তার, টিকাদানের সীমাবদ্ধতা এবং সচেতনতার ঘাটতির কারণে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পর্যাপ্ত ভ্যাকসিন সরবরাহ, গণ-টিকাদান কর্মসূচি জোরদার এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির বিকল্প নেই।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আশা করছেন, সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, প্রাণিসম্পদ বিভাগ, স্বাস্থ্য বিভাগ এবং সাধারণ মানুষের সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে জলাতঙ্ক প্রতিরোধে আরও কার্যকর ফল পাওয়া সম্ভব হবে।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD