ফিরে পেতে পারে আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স

রাজধানীর মগবাজারের আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় লাইসেন্স বাতিলের পর সৃষ্ট অচলাবস্থা এখনও পুরোপুরি কাটেনি। হাসপাতালটির চিকিৎসাসেবা বন্ধ থাকায় রোগীরা যেমন ভোগান্তিতে পড়েছেন, তেমনি মেডিকেল কলেজের ২৯৫ জন বিদেশি শিক্ষার্থীসহ শত শত শিক্ষার্থীর শিক্ষা কার্যক্রমও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। এ পরিস্থিতির সমাধানে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, শিক্ষার্থী ও রোগীরা বিভিন্ন পর্যায়ে উদ্যোগ নিচ্ছেন।
বিজ্ঞাপন
বিষয়টি জাতীয় সংসদেও আলোচনায় এসেছে। সরকারের নির্ধারিত শর্ত মেনে হাসপাতাল চালু করতে সম্মতি জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সরকারও লাইসেন্স পুনর্বহালের বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে।
আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশনের পরিচালক (কোম্পানি অ্যাফেয়ার্স) তারিকুল ইসলাম মুকুল জানিয়েছেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যেসব ত্রুটি চিহ্নিত করেছিল, সেগুলো সংশোধন করে সচিবের কাছে আবেদন করা হয়েছে। এখন সরকারের সিদ্ধান্তের অপেক্ষা করা হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
রবিবার জাতীয় সংসদে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, চিকিৎসকদের গাফিলতি, সেন্ট্রাল এসি বন্ধ থাকা এবং পর্যাপ্ত অক্সিজেনের অভাবের কারণে একই দিনে ছয় নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে। তিনি জানান, হাইপারক্যাপনিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসার সময় সেন্ট্রাল এসি বন্ধ ছিল, জানালা খোলা হয়নি এবং জরুরি অক্সিজেন সরবরাহও পাওয়া যায়নি। এ সময় সন্তানদের বাঁচাতে মায়েরা ছুটোছুটি করলেও সেখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক ছিলেন না এবং নার্সরাও সাড়া দেননি। এসব কারণেই কার্বন ডাই-অক্সাইডের বিষক্রিয়ায় শিশুদের মৃত্যু হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
মন্ত্রী আরও বলেন, লাইসেন্সের শর্ত লঙ্ঘন ও গুরুতর অব্যবস্থাপনার কারণে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর হাসপাতালটির লাইসেন্স স্থগিত করেছে এবং পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে সরকারি তত্ত্বাবধানে নতুন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
তবে লাইসেন্স বাতিল নাকি স্থগিত—এ বিষয়ে বিভ্রান্তি রয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, এটি মূলত শব্দ ব্যবহারের পার্থক্য। বাস্তবে হাসপাতালটির লাইসেন্স বাতিলই করা হয়েছে। তিনি জানান, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আপিল করেছে। এখন সরকার প্রক্রিয়া অনুসরণ করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে।
বিজ্ঞাপন
হাসপাতালের কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও মেডিকেল কলেজ চালু রয়েছে। কিন্তু ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণ ও ইন্টার্নশিপ নিয়ে শিক্ষার্থীরা বড় ধরনের সংকটে পড়েছেন। বিশেষ করে ভারত ও মালদ্বীপের ২৯৫ জন শিক্ষার্থী উদ্বিগ্ন। তাদের দেশের মেডিকেল কাউন্সিলের নিয়ম অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট মেডিকেল কলেজের সংযুক্ত হাসপাতালেই ইন্টার্নশিপ সম্পন্ন করতে হয়। অন্য হাসপাতালে ইন্টার্নশিপ করলে সেটি নিজ দেশে স্বীকৃতি নাও পেতে পারে। ফলে কয়েক বছরের শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে বলে তারা আশঙ্কা করছেন।
এ বিষয়ে তারা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে স্মারকলিপিও জমা দিয়েছেন। স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাজমুল হোসেন বলেন, আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হাসপাতালের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে। তবে শিক্ষার্থীদের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে এবং তাদের উদ্বিগ্ন হওয়ার প্রয়োজন নেই।
বিজ্ঞাপন
মন্ত্রণালয়ের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, হাসপাতালের পরিচালনা পর্ষদে ইতোমধ্যে পরিবর্তন আনা হয়েছে। হাসপাতাল এলাকায় বেকারি না রাখা, ভবনের কাঠামোগত সংস্কারসহ কয়েকটি শর্ত পূরণ করা হলে লাইসেন্স পুনর্বহালের বিষয়ে সরকার ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করছে। যেহেতু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এসব শর্ত মানতে সম্মত হয়েছে, তাই জনস্বার্থে প্রতিষ্ঠানটি আবার চালুর সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে স্বল্প খরচে চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসা আদ্-দ্বীন হাসপাতাল বন্ধ থাকায় সাধারণ রোগীরাও চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। লাইসেন্স পুনর্বহালের দাবিতে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধনও হয়েছে। সেখানে বক্তারা নবজাতক মৃত্যুর ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানান, যাতে শিক্ষার্থী ও সাধারণ রোগীরা দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত না হন।
গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের চেয়ারম্যান শিরীন পারভিনও হাসপাতালটির প্রতি সংহতি প্রকাশ করে বলেন, স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য আদ্-দ্বীন হাসপাতাল একটি গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাকেন্দ্র। একটি মর্মান্তিক ঘটনার কারণে পুরো হাসপাতালের কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়ায় অসংখ্য মানুষ চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। দ্রুত হাসপাতালটির স্বাভাবিক কার্যক্রম চালুর আহ্বান জানান তিনি।
বিজ্ঞাপন
এদিকে বেসরকারি হাসপাতাল মালিকদের সংগঠনও বলেছে, ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। তবে একটি ঘটনার কারণে দীর্ঘদিনের চিকিৎসাসেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স স্থায়ীভাবে বাতিল করা সমাধান হতে পারে না। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত ও দরিদ্র রোগীরা।
অন্যদিকে চিকিৎসকদের দুটি সংগঠনও পৃথক বিবৃতিতে হাসপাতালটি বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছে। ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় হাসপাতাল ও ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষে থাকা আইনজীবী অ্যাডভোকেট শিশির মনিরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।








