Logo

এবার চিনি ও সয়াবিন তেলেও মিলল ভয়াবহ মাত্রায় মাইক্রোপ্লাস্টিক

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
২৯ জুলাই, ২০২৬, ১৩:০১
এবার চিনি ও সয়াবিন তেলেও মিলল ভয়াবহ মাত্রায় মাইক্রোপ্লাস্টিক
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের বাজারে বিক্রি হওয়া চিনি ও সয়াবিন তেলে উদ্বেগজনক মাত্রায় মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। পৃথক দুটি গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিদিন ব্যবহৃত এসব খাদ্যপণ্যের মাধ্যমে মানুষ অজান্তেই ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা শরীরে গ্রহণ করছে।

বিজ্ঞাপন

গবেষকদের মতে, বিষয়টি দীর্ঘমেয়াদে জনস্বাস্থ্যের জন্য নতুন ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই খাদ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণে আরও কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী জার্নাল অব ফুড কম্পোজিশন অ্যান্ড অ্যানালাইসিস-এ প্রকাশিত গবেষণাগুলোতে চিনি ও সয়াবিন তেলের নমুনা বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য উঠে আসে। চিনি নিয়ে গবেষণা পরিচালনা করেন সাদিয়া আফরিন, নায়ন হোসেন ও মোস্তাফিজুর রহমান। অন্যদিকে সয়াবিন তেল নিয়ে গবেষণা যৌথভাবে পরিচালনা করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) ও বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) গবেষকরা।

চিনির ৯৫ শতাংশ নমুনায় মিলেছে মাইক্রোপ্লাস্টিক

বিজ্ঞাপন

গবেষণার জন্য রাজধানীর বিভিন্ন খুচরা বাজার থেকে সাত ধরনের ব্র্যান্ডেড ও খোলা চিনি সংগ্রহ করা হয়। বিশ্লেষণে দেখা যায়, পরীক্ষা করা নমুনার ৯৫ শতাংশেই মাইক্রোপ্লাস্টিক রয়েছে। প্রতি কেজি চিনিতে ২১০ থেকে ৫০৮টি পর্যন্ত প্লাস্টিক কণা শনাক্ত হয়েছে।

ব্র্যান্ডেড চিনিতে গড়ে প্রতি কেজিতে ৩২২টি এবং খোলা চিনিতে গড়ে ৪০৩টি মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যায়। যদিও পরিসংখ্যানগতভাবে পার্থক্য খুব বেশি নয়, তবুও খোলা চিনিতে দূষণের মাত্রা তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

পরীক্ষায় শনাক্ত হওয়া কণার আকার ছিল প্রায় ১২ মাইক্রোমিটার থেকে ৩ দশমিক ১৯ মিলিমিটার পর্যন্ত। এর মধ্যে ৬৩ শতাংশ ছিল ফাইবার, ২১ শতাংশ ভাঙা প্লাস্টিকের খণ্ড, ১১ শতাংশ ফিল্ম এবং বাকি ৫ শতাংশ ছিল গোলাকার কণা।

গবেষকদের ধারণা, প্লাস্টিকের প্যাকেজিং, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি, পরিবহন, সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং পরিবেশে ছড়িয়ে থাকা ক্ষয়প্রাপ্ত প্লাস্টিক থেকেই এসব কণা খাদ্যে মিশে যেতে পারে।

বিজ্ঞাপন

বিভিন্ন ধরনের প্লাস্টিক পলিমারের উপস্থিতি

রাসায়নিক বিশ্লেষণে চিনিতে অ্যাক্রাইলোনাইট্রাইল বিউটাডিয়েন স্টাইরিন (এবিএস), পলিভিনাইল ক্লোরাইড (পিভিসি), পলিইথিলিন টেরেফথ্যালেট (পিইটি), পলিটেট্রাফ্লুরোইথিলিন (পিটিএফই), উচ্চ ঘনত্বের পলিইথিলিন (এইচডিপিই), নাইলনসহ বিভিন্ন ধরনের প্লাস্টিক পলিমারের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছে।

গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, শুধুমাত্র চিনি থেকেই একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি প্রতিদিন প্রতি কেজি শারীরিক ওজনের বিপরীতে গড়ে ০.২১৭৮টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা গ্রহণ করতে পারেন। পরিমাণ তুলনামূলক কম হলেও নিয়মিত খাদ্যাভ্যাসে চিনি থাকায় এটি মাইক্রোপ্লাস্টিক গ্রহণের একটি ধারাবাহিক উৎস হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

সয়াবিন তেলেও ভয়াবহ দূষণের চিত্র

সয়াবিন তেল নিয়ে পরিচালিত গবেষণায় রাজধানীর তেজগাঁও, উত্তরা ও ক্যান্টনমেন্ট এলাকার বিভিন্ন সুপারশপ এবং খোলা বাজার থেকে মোট ৬০টি নমুনা সংগ্রহ করা হয়। আধুনিক স্পেকট্রোস্কোপিক ও রাসায়নিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রতি লিটার সয়াবিন তেলে গড়ে ৫৩ হাজার ৯২২টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা রয়েছে।

গবেষণায় আরও দেখা যায়, বোতলজাত তেলের তুলনায় খোলা সয়াবিন তেলে দূষণের পরিমাণ অন্তত ১ দশমিক ২৪ গুণ বেশি। খোলা তেলে প্রতি লিটারে গড়ে ৫৯ হাজার ৭৭৮টি প্লাস্টিক কণা শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে তেজগাঁও এলাকা থেকে সংগ্রহ করা নমুনায় দূষণের মাত্রা ছিল সবচেয়ে বেশি।

বিজ্ঞাপন

গবেষকদের মতে, শিল্পকারখানার ঘনত্ব, টেক্সটাইল ও প্লাস্টিক কারখানার নিকটবর্তী অবস্থান এবং খোলা তেল সংরক্ষণে একই পাত্র বারবার ব্যবহারের কারণে দূষণের ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে।

বিশ্বে প্রথমবার শনাক্ত দুই ধরনের প্লাস্টিক

ল্যাবরেটরি বিশ্লেষণে সয়াবিন তেলে ছয় ধরনের প্লাস্টিক পলিমার শনাক্ত করা হয়েছে। এগুলো হলো—লো-ডেনসিটি পলিইথিলিন (এলডিপিই), হাই-ডেনসিটি পলিইথিলিন (এইচডিপিই), পলিপ্রোপিলিন (পিপি), পলিইথিলিন টেরেফথ্যালেট (পিইটিই), পলিইউরেথেন (পিইউ) এবং নাইলন।

বিজ্ঞাপন

গবেষকদের দাবি, ভোজ্যতেলে পলিইউরেথেন ও নাইলনের উপস্থিতি এই প্রথম কোনো গবেষণায় শনাক্ত হলো। পাওয়া কণাগুলোর প্রায় ৮২ দশমিক ৫ শতাংশই ছিল আঁশ বা ফাইবারজাতীয়। এছাড়া অর্ধেকের বেশি কণা ছিল স্বচ্ছ এবং উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কণার আকার ছিল ১০১ থেকে ৫০০ মাইক্রোমিটারের মধ্যে।

শিশুদের ঝুঁকি আরও বেশি

গবেষণায় মানুষের শরীরে সম্ভাব্য মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশের হিসাবও তুলে ধরা হয়েছে। এতে দেখা যায়, একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি প্রতিদিন গড়ে ১৭ দশমিক ৬৫টি এবং বছরে প্রায় ৬ হাজার ৪৪১টি প্লাস্টিক কণা গ্রহণ করতে পারেন।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

অন্যদিকে শিশুদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি। গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৭৭ দশমিক ২১টি এবং বছরে প্রায় ২৮ হাজার ১৮০টি মাইক্রোপ্লাস্টিক তাদের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। গবেষকদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, একটি শিশু জীবদ্দশায় প্রায় ২০ লাখ ৯০ হাজার প্লাস্টিক কণা গ্রহণ করতে পারে।

কী ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে?

বিশেষজ্ঞদের মতে, মাইক্রোপ্লাস্টিক মানুষের পরিপাকতন্ত্রে জটিলতা, শরীরের হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হওয়া, দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ এবং কোষের ক্ষতির মতো সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে ১৩০ মাইক্রোমিটারের চেয়ে ছোট কণাগুলো কোষের দেয়াল ভেদ করে রক্তপ্রবাহে প্রবেশ করার ঝুঁকি বহন করে।

বিজ্ঞাপন

গবেষণা দলের প্রধান এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. শফি মুহাম্মদ তারেক বলেন, মাইক্রোপ্লাস্টিক বর্তমানে একটি উদীয়মান দূষক, যা ভবিষ্যতে মানুষের প্রজননতন্ত্র ও বিপাকীয় ব্যবস্থার ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে। তার মতে, প্লাস্টিকের ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব না হলেও প্লাস্টিক বর্জ্যের সঠিক ব্যবস্থাপনা, পুনর্ব্যবহার বৃদ্ধি এবং খাদ্য উৎপাদনের প্রতিটি ধাপে মান নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা এখন সময়ের দাবি।

আগে টুথপেস্টেও মিলেছিল মাইক্রোপ্লাস্টিক

এর আগে পরিবেশ ও সামাজিক উন্নয়ন সংস্থা (ইএসডিও)-র এক বছরব্যাপী গবেষণায় দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া বিভিন্ন ব্র্যান্ডের টুথপেস্টেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছিল। ওই গবেষণায় ১৯টি ব্র্যান্ডের ৩৪টি নমুনার মধ্যে ২৬টিতে প্লাস্টিক কণা পাওয়া যায়। প্রতি ১০০ গ্রাম টুথপেস্টে ২০ থেকে ৩২০টি পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়। এমনকি শিশুদের জন্য তৈরি কয়েকটি টুথপেস্টেও এই দূষণের প্রমাণ মিলেছিল।

গবেষকদের মতে, খাদ্য ও দৈনন্দিন ব্যবহার্য পণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ ক্রমেই বাড়ছে। তাই দেশের খাদ্যনিরাপত্তা ব্যবস্থায় মাইক্রোপ্লাস্টিক পর্যবেক্ষণ অন্তর্ভুক্ত করা, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড কঠোরভাবে অনুসরণ করা এবং এ বিষয়ে আরও বিস্তৃত গবেষণা পরিচালনা করা এখন অত্যন্ত জরুরি।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD