হামের চিকিৎসায় ঋণে জর্জরিত ৮৯ শতাংশ অতিদরিদ্র পরিবার: জরিপ

বাংলাদেশে হামে আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে গিয়ে বিপুল সংখ্যক অতিদরিদ্র পরিবার চরম আর্থিক সংকটে পড়ছে। সাম্প্রতিক এক যৌথ জরিপে উঠে এসেছে, আক্রান্ত প্রতি ১০টি পরিবারের মধ্যে প্রায় ৯টি পরিবারই চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে ঋণ নিতে বাধ্য হয়েছে। একই সঙ্গে ৬১ শতাংশ পরিবার তাদের দীর্ঘদিনের সঞ্চয়ও শেষ করে ফেলেছে।
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি (বিডিআরসিএস) এবং আন্তর্জাতিক রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি ফেডারেশন (আইএফআরসি) পরিচালিত যৌথ মূল্যায়নে এ চিত্র উঠে এসেছে। চলতি বছরের মে ও জুন মাসে দেশের ২ হাজার ৭৪৬টি পরিবারের ওপর পরিচালিত এই জরিপে দেখা যায়, হামের প্রাদুর্ভাব শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকিই নয়, হাজারো পরিবারকে গুরুতর অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটের মুখেও ঠেলে দিচ্ছে।
জরিপ অনুযায়ী, চিকিৎসা, ওষুধ, যাতায়াত এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ মিলিয়ে একটি পরিবারকে গড়ে প্রায় ১৬ হাজার টাকা ব্যয় করতে হয়েছে। অংশগ্রহণকারী পরিবারগুলোর মধ্যে ৭৮ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমজীবী, যাদের মাসিক আয় ৬ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ। ফলে চিকিৎসার অতিরিক্ত ব্যয় তাদের জন্য বড় ধরনের চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, আক্রান্ত শিশুদের দীর্ঘ সময় হাসপাতালে ভর্তি থাকতে হওয়ায় অনেক অভিভাবক নিয়মিত কাজে যেতে পারেননি। এতে বহু পরিবারের আয় বন্ধ হয়ে গেছে এবং কেউ কেউ চাকরিও হারিয়েছেন। চিকিৎসা-পরবর্তী সময়েও এসব পরিবার অর্থনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়াতে হিমশিম খাচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
জরিপে অংশ নেওয়া পরিবারগুলোর মধ্যে ৩৫ শতাংশ ওষুধের সহায়তা প্রয়োজন বলে জানিয়েছে। এছাড়া ৩৩ শতাংশ পরিবার নিরাপদ পানি ও স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছে। অন্যদিকে ২২ শতাংশ পরিবার খাদ্য সহায়তার প্রয়োজন রয়েছে বলে জানিয়েছে।
বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির সেক্রেটারি জেনারেল ড. কবির এম. আশরাফ আলম জানান, জরিপের তথ্য বিশ্লেষণ করে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ২ হাজার ৪০০টি পরিবারকে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাদের প্রত্যেককে ১০ হাজার টাকা করে জরুরি নগদ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে, যাতে তারা প্রাথমিক আর্থিক সংকট কাটিয়ে উঠতে পারেন।
আইএফআরসির বাংলাদেশ প্রধান আলবার্তো বোকানেগ্রা বলেন, স্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলায় শুধু চিকিৎসা নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয়। আক্রান্ত পরিবারগুলোর জন্য কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বিজ্ঞাপন
এদিকে দেশে হামের সংক্রমণ এখনো উদ্বেগজনক অবস্থায় রয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে সুনামগঞ্জে দুইজন এবং ঢাকায় একজনের মৃত্যু হয়েছে।
এর ফলে গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৫১ জনে। একই সময়ে পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হওয়া হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে আরও ৯৬ শিশু। সব মিলিয়ে হামের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মোট মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৪৭ জনে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৯৬৭ জনের মধ্যে হামের উপসর্গ শনাক্ত হয়েছে এবং তাদের মধ্যে ৯০৮ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত দেশে মোট সন্দেহভাজন হাম রোগীর সংখ্যা ১ লাখ ৩১ হাজার ৫০ জনে পৌঁছেছে। এর মধ্যে পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া রোগীর সংখ্যা ১৬ হাজার ৪০৮।
বিজ্ঞাপন
হামের বিস্তার রোধে সরকারের টিকাদান কর্মসূচিকে সহায়তা করতে বর্তমানে দেশের বিভিন্ন এলাকায় এক হাজারেরও বেশি রেড ক্রিসেন্ট স্বেচ্ছাসেবক কাজ করছেন। তারা টিকাদান কার্যক্রমে সহযোগিতার পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে মাঠপর্যায়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন।







