Logo

রোগের আগেই স্বাস্থ্যঝুঁকি শনাক্ত করবে হংকংয়ের এআই প্রযুক্তি

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
৪ নভেম্বর, ২০২৬, ২০:২২
রোগের আগেই স্বাস্থ্যঝুঁকি শনাক্ত করবে হংকংয়ের এআই প্রযুক্তি
ছবি: সংগৃহীত

রোগ দেখা দেওয়ার পর চিকিৎসা নেওয়ার পরিবর্তে আগেই সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি শনাক্ত করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ধারণা ক্রমেই গুরুত্ব পাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), স্মার্ট স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যতথ্য বিশ্লেষণ স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে।

বিজ্ঞাপন

হংকংভিত্তিক প্রতিষ্ঠান লাইভফোরওয়েল এমনই একটি প্রযুক্তিনির্ভর স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করছে, যেখানে বিভিন্ন পরীক্ষার তথ্য একত্র করে ব্যক্তির সামগ্রিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি ও সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।

সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটির স্বাস্থ্য পরীক্ষা কার্যক্রমে অংশ নিয়ে এক প্রতিবেদক নিজের শরীরের ভঙ্গি সম্পর্কে এমন একটি তথ্য জানতে পারেন, যা আগে তাঁর নজরে আসেনি। একটি বিশেষ যন্ত্রের সামনে প্রথমে সোজা হয়ে এবং পরে ডানে ও বামে মুখ করে দাঁড়ানোর পর তৈরি করা প্রতিবেদনে তাঁর কঙ্কালের ছবি উঠে আসে। সেখানে দেখা যায়, হাঁটার সময় তাঁর শরীর সামনের দিকে ঝুঁকে থাকে। বয়স ৫০ পেরিয়ে গেলেও বিষয়টি সম্পর্কে তিনি আগে অবগত ছিলেন না।

পরীক্ষার ফল দেখে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তাঁকে জানান, এভাবে ঝুঁকে হাঁটার অভ্যাস ভবিষ্যতে বড় ধরনের শারীরিক সমস্যার কারণ হতে পারে।

বিজ্ঞাপন

গত ২৮ অক্টোবর বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের (বিএইচআরএফ) ৪০ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল হংকংয়ের লাইভফোরওয়েল প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করে। বাংলাদেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিক, সম্পাদক ও স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা এ সফরে অংশ নেন। তাঁরা প্রতিষ্ঠানটির প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য পরীক্ষার পদ্ধতি এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে জানার পাশাপাশি নিজেরাও বিভিন্ন স্মার্ট পরীক্ষায় অংশ নেন।

এআইনির্ভর স্বাস্থ্য পরীক্ষায় সাতটি যন্ত্র

লাইভফোরওয়েল পরিদর্শনকালে প্রতিষ্ঠানটির প্রতিনিধিরা তাদের সাতটি এআইভিত্তিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা যন্ত্র এবং নিজস্বভাবে তৈরি স্বাস্থ্যসেবাবিষয়ক লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল মেডিএলএলএম সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরেন।

বিজ্ঞাপন

প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তাদের ভাষ্য, বিভিন্ন উৎস থেকে পাওয়া স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য একীভূত করে বিশ্লেষণের মাধ্যমে ব্যক্তির স্বাস্থ্যঝুঁকি মূল্যায়ন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় সহায়তা করাই এসব প্রযুক্তির মূল উদ্দেশ্য। অর্থাৎ, একটি পরীক্ষার ফলের ওপর নির্ভর না করে একাধিক তথ্য বিশ্লেষণ করে ব্যক্তির সামগ্রিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।

এ সময় ই-সেন্স ইনোভেশন অ্যান্ড টেকনোলজি লিমিটেডের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. রাসেল চ্যান ইলেকট্রিক্যাল ইম্পিড্যান্স টমোগ্রাফি (ইআইটি) প্রযুক্তির মাধ্যমে স্বাস্থ্য পরীক্ষা পদ্ধতি সম্পর্কে প্রতিনিধিদলকে ধারণা দেন।

প্রযুক্তিটির কার্যকারিতা, পরীক্ষার নির্ভুলতা, খরচ এবং বাস্তবে ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়ে বাংলাদেশের সাংবাদিকেরা বিভিন্ন প্রশ্ন করেন। লাইভফোরওয়েলের সহ-প্রতিষ্ঠাতা মিরান্ডা ওং ও ড. রাসেল চ্যান সেসব প্রশ্নের উত্তর দেন। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে মানুষের স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা বিবেচনায় এ ধরনের প্রযুক্তি কীভাবে কাজে লাগানো যেতে পারে, তা নিয়েও আলোচনা হয়।

বিজ্ঞাপন

সাংবাদিকদের সরাসরি স্বাস্থ্য পরীক্ষায় অংশগ্রহণ

প্রযুক্তিগত উপস্থাপনা ও আলোচনা শেষে প্রতিনিধিদল লাইভফোরওয়েলের ইন্টেলিজেন্ট হেলথ অ্যাসেসমেন্ট সেন্টার ঘুরে দেখে। সেখানে স্বাস্থ্য পরীক্ষার প্রতিটি যন্ত্রের কার্যপদ্ধতি, ব্যবহারবিধি এবং পরীক্ষার বিভিন্ন ধাপ সম্পর্কে জানানো হয়।

প্রতিনিধিদলের সদস্যরাও এসব যন্ত্রের মাধ্যমে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করান। স্বাস্থ্য মূল্যায়ন, পরীক্ষার ফল তৈরি এবং সেই ফল বিশ্লেষণ—পুরো প্রক্রিয়াটি তাঁরা সরাসরি পর্যবেক্ষণ করেন। এতে প্রযুক্তিনির্ভর স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার ব্যবহারিক দিক সম্পর্কে তাঁদের ধারণা তৈরি হয়।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবায় সম্ভাবনা কতটা

বাংলাদেশে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ ও উচ্চ রক্তচাপের মতো অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি মোকাবিলা জনস্বাস্থ্যের বড় চ্যালেঞ্জ। এসব রোগের ঝুঁকি প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা এবং সময়মতো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া গেলে জটিলতা কমানোর সুযোগ তৈরি হয়। এ ক্ষেত্রে নিয়মিত স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ, ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যতথ্য বিশ্লেষণ এবং জীবনযাত্রা পরিবর্তনের পরামর্শ দিতে এআইভিত্তিক প্রযুক্তি সহায়ক হতে পারে।

তবে এ ধরনের প্রযুক্তির মাধ্যমে পাওয়া স্বাস্থ্য মূল্যায়নকে প্রচলিত চিকিৎসা পরীক্ষা কিংবা চিকিৎসকের রোগ নির্ণয়ের বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। পরীক্ষার ফল কতটা নির্ভুল, ব্যবহৃত প্রযুক্তির বৈজ্ঞানিক ভিত্তি কতটা গ্রহণযোগ্য এবং চিকিৎসাক্ষেত্রে এর কার্যকারিতা কী—এসব বিষয় স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশে এমন প্রযুক্তি চালুর ক্ষেত্রে সেবার মূল্য ও সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। এর পাশাপাশি প্রশিক্ষিত জনবল, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এবং ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যতথ্যের গোপনীয়তা নিশ্চিত করতে হবে। প্রযুক্তির সুবিধা যেন কেবল উচ্চ আয়ের মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, সেটিও বিবেচনায় রাখা জরুরি।

বাংলাদেশের বাজার ও মানুষের চাহিদা বুঝতে চায় প্রতিষ্ঠানটি

লাইভফোরওয়েলের সহ-প্রতিষ্ঠাতা মিরান্ডা ওং বলেন, বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের সফরের মাধ্যমে দেশটির মানুষের স্বাস্থ্য পরীক্ষা, সেবার ব্যয় এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে চাহিদা ও উদ্বেগ সম্পর্কে জানার সুযোগ হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের গণমাধ্যম ও স্বাস্থ্য খাতের প্রতিনিধিরা হংকংয়ে স্বাস্থ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার সরাসরি দেখার সুযোগ পেয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, নতুন কোনো দেশে কার্যক্রম সম্প্রসারণের আগে সেখানকার মানুষের আয়, প্রকৃত চাহিদা এবং স্থানীয় পরিস্থিতি বিবেচনা করা প্রয়োজন। এরপর সম্ভাব্য অংশীদারদের সঙ্গে আলোচনা করে উপযুক্ত সেবা, মূল্য নির্ধারণ ও সহযোগিতার মডেল তৈরি করতে হয়।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা পরিবেশ এবং সাধারণ মানুষের প্রয়োজন সম্পর্কে আরও জানার পাশাপাশি ভবিষ্যতে বিভিন্ন খাতে সহযোগিতার সুযোগ তৈরিতে এ ধরনের বিনিময় কার্যক্রম ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এশিয়ার বিভিন্ন দেশের প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা, স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার চাহিদা ও বাজার পরিস্থিতি নিয়ে তারা কাজ করছে। মেডিএলএলএমের গবেষণা ও উন্নয়নের মাধ্যমে এশীয় জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যগত বৈশিষ্ট্য প্রতিফলিত হয়—এমন একটি স্বাস্থ্যতথ্যভাণ্ডার গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

এ ধরনের উদ্যোগে তথ্যের সুশাসন, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা সুরক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধিবিধান অনুসরণের বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

প্রযুক্তির পাশাপাশি জরুরি বৈজ্ঞানিক যাচাই

হংকংয়ের লাইভফোরওয়েল পরিদর্শনের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার এখন শুধু রোগ শনাক্তকরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ব্যক্তির স্বাস্থ্যতথ্য বিশ্লেষণ, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং জীবনযাত্রায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের মাধ্যমে সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের দিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

তবে বাংলাদেশের মতো দেশে এ ধরনের প্রযুক্তির কার্যকর প্রয়োগের জন্য আধুনিক যন্ত্রপাতি কিংবা এআই মডেল থাকাই যথেষ্ট নয়। পরীক্ষার নির্ভুলতা ও বৈজ্ঞানিক গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সাশ্রয়ী মূল্য, তথ্যের নিরাপত্তা এবং প্রচলিত চিকিৎসাব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয় প্রয়োজন।

বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি প্রতীক ইজাজ বলেন, বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন নন। গুরুতর অসুস্থ না হওয়া পর্যন্ত অনেকেই চিকিৎসকের কাছে যান না। এ পরিস্থিতিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অল্প সময়ের মধ্যে স্বাস্থ্য পরিস্থিতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তিনি বলেন, লাইভফোরওয়েলের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এসব পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে একজন ব্যক্তির কী ধরনের সমস্যা রয়েছে, তা চিহ্নিত করা সম্ভব। তবে রোগীকে চিকিৎসা দেবেন চিকিৎসক।

বিজ্ঞাপন

প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবায় প্রযুক্তির সুফল পেতে হলে তা সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে নিয়ে আসা জরুরি। একই সঙ্গে প্রযুক্তির মাধ্যমে পাওয়া তথ্যের যথার্থতা যাচাই এবং চিকিৎসকের পরামর্শের সঙ্গে এর সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে। তাহলেই এআইভিত্তিক স্বাস্থ্য মূল্যায়ন জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় কার্যকর ভূমিকা রাখার সুযোগ পাবে।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD