জাতিসংঘে ইসরায়েল বহিষ্কারের দাবি ফের জোরদার, ঝুঁকিতে সদস্যপদ

ইসরায়েলকে জাতিসংঘ থেকে বহিষ্কারের দাবিতে আন্তর্জাতিক পরিসরে আবারও আলোচনার ঝড় উঠেছে। গত ২৪ নভেম্বর চিলির নাগরিক সমাজের নেতারা জাতিসংঘ সনদের ৬ নম্বর ধারা কার্যকর করার আহ্বান জানিয়ে আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু করেন।
বিজ্ঞাপন
তাদের দাবি—ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘন করছে এবং জাতিসংঘের গৃহীত প্রস্তাব উপেক্ষা করছে, বিশেষ করে গাজায় চলমান গণহত্যা ও মানবিক সংকট তার জ্বলন্ত প্রমাণ।
জাতিসংঘ সনদের ৬ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো সদস্য রাষ্ট্র যদি সনদের নীতি ধারাবাহিকভাবে অমান্য করে, তবে নিরাপত্তা পরিষদের সুপারিশের ভিত্তিতে সাধারণ পরিষদ তাকে সংস্থা থেকে বহিষ্কার করতে পারে।
ইসরায়েলকে বহিষ্কার বা স্থগিত করার আহ্বান নতুন নয়। গত সেপ্টেম্বরে কাতারে হামাস নেতাদের লক্ষ্য করে ইসরায়েলি বিমান হামলার পর পাকিস্তান জাতিসংঘে ইসরায়েলের সদস্যপদ স্থগিত বা বাতিলের দাবি তোলে। পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত তখন সতর্ক করেছিলেন—ইসরায়েলের আচরণ আন্তর্জাতিক আইন ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুতর হুমকি।
বিজ্ঞাপন
জাতিসংঘের বিশেষ দূত ফ্রান্সেসকা আলবানিজও একাধিকবার ইসরায়েলের সদস্যপদ স্থগিত করার কথা বলেছেন, ফিলিস্তিনে চলমান মানবাধিকার লঙ্ঘন ও গণহত্যার অভিযোগ তুলে।
জাতিসংঘ সনদের ৫ ও ৬ অনুচ্ছেদের অধীনে কোনো রাষ্ট্রকে স্থগিত বা বহিষ্কার করা সম্ভব হলেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে এমন ঘটনা আর ঘটেনি। দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী শাসনব্যবস্থার সময় সাধারণ পরিষদ তাদের কার্যক্রম সীমিত করেছিল, তবে সদস্যপদ বাতিল করা যায়নি।
বিজ্ঞাপন
ইসরায়েলকে বহিষ্কারের জন্য অতীতে বহুবার প্রচেষ্টা নেওয়া হলেও রাজনৈতিক চাপ ও নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো ক্ষমতাধারী রাষ্ট্রগুলোর কারণে কোনোটিই সফল হয়নি। উল্লেখযোগ্যভাবে, ১৯৭৫ সালে সাধারণ পরিষদ জায়নিজমকে একটি বর্ণবাদী মতাদর্শ হিসেবে ঘোষণা করেছিল। তৎকালীন ৩৪টি মুসলিম দেশ ও সোভিয়েত ইউনিয়নও ইসরায়েলকে বহিষ্কারের আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠিয়েছিল।
ইসরায়েলকে বহিষ্কারের জন্য আইনি ভিত্তি থাকলেও বাস্তবে তা অত্যন্ত কঠিন। কারণ প্রস্তাব পাশ করাতে হলে নিরাপত্তা পরিষদের সমর্থন ও স্থায়ী পাঁচ সদস্য—যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের ভেটো অপ্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। পশ্চিমা দেশগুলোর রাজনৈতিক সমর্থন ও মার্কিন ভেটো ব্যবহারের সম্ভাবনা এ প্রক্রিয়াকে অতীতের মতোই জটিল করে তোলে।
গাজায় এখনো যুদ্ধাপরাধ, গণহত্যা ও মানবিক বিপর্যয়ের অভিযোগ অব্যাহত। ফলে ইসরায়েলকে বহিষ্কারের এই নতুন আহ্বান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতীকী ও রাজনৈতিক চাপ তৈরি করছে। বহিষ্কার না হলেও এটি ইসরায়েলের বৈধতা, নৈতিক অবস্থান এবং কূটনৈতিক গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে।
বিজ্ঞাপন
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের বিকল্প পদক্ষেপগুলোর মধ্যে রয়েছে— ফিলিস্তিনের পূর্ণ সদস্যপদ নিশ্চিত করা, ইসরায়েলের জাতিসংঘ উপস্থিতি সীমিত করার প্রস্তাব এবং ক্রেডেনশিয়াল কমিটিতে ইসরায়েলি প্রতিনিধি দলের স্বীকৃতি বাতিলের সুপারিশ।
এছাড়াও "শান্তির জন্য ঐক্যবদ্ধ" প্রক্রিয়ার আওতায় জরুরি অধিবেশন আহ্বান করাও সদস্য রাষ্ট্রগুলোর জন্য একটি কার্যকর উপায় হতে পারে, যদি নিরাপত্তা পরিষদ কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়।
বিজ্ঞাপন
আইনি কাঠামো ইসরায়েলকে সদস্যপদ থেকে স্থগিত বা বহিষ্কার করার সুযোগ দিলেও রাজনৈতিক বাস্তবতা ও ভেটো ব্যবস্থার কারণে তা বাস্তবায়ন অত্যন্ত কঠিন। তবুও বিশ্বব্যাপী ক্রমবর্ধমান ক্ষোভ, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এবং গাজায় চলমান নৃশংসতার পরিপ্রেক্ষিতে এই দাবি আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে।








