পারমাণবিক বোমার চেয়েও শক্তিশালী অস্ত্র পেয়ে গেছে ইরান!

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির পেছনে দীর্ঘদিন ধরে দুটি লক্ষ্য কাজ করেছে বলে ধারণা করা হয়—ইসরায়েলকে চাপে রাখা এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বকে সতর্ক করা যে হামলা চালালে এর বড় মূল্য দিতে হবে। তবে সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে বিশ্লেষকরা বলছেন, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণই তেহরানের জন্য পারমাণবিক অস্ত্রের চেয়েও কার্যকর হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।
বিজ্ঞাপন
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানের পর ইসরায়েলের ওপর সরাসরি হুমকি কিছুটা কমলেও হরমুজ প্রণালিতে ইরানের দৃঢ় অবস্থান বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে। এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ এখন সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ইরানি বাহিনী ও তাদের সহযোগীরা ট্যাংকারে হামলা চালাচ্ছে এবং টোল আরোপের মাধ্যমে জাহাজ চলাচলে প্রভাব ফেলছে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট মারওয়ান মুয়াশার বলেন, হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণ ইরানের জন্য পারমাণবিক বোমার চেয়েও বেশি কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাম্প্রতিক সময়ে কঠোর ভাষায় ইরানকে প্রণালি খুলে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বার্তায় তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, প্রণালি খুলে না দিলে কঠিন পরিণতি ভোগ করতে হবে।
যদিও কয়েকদিন আগেও তিনি তুলনামূলক নরম অবস্থান নিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন, ইরানের অর্থনৈতিক প্রয়োজনের কারণে প্রণালিটি শেষ পর্যন্ত খুলে দেওয়া হবে। একই সঙ্গে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ দ্রুত শেষ হওয়ার কথাও উল্লেখ করেছিলেন তিনি।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে এই সংকট যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের ওপরও চাপ তৈরি করেছে। এমন ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে, প্রণালি পুরোপুরি স্বাভাবিক না হলেও যুদ্ধ সমাপ্তির বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
কার্নেগির আরেক গবেষক করিম সাজাদপুর মনে করেন, ইরান এই জলপথের নিয়ন্ত্রণকে নিজেদের স্থায়ী কৌশল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে, যা কার্যত তাদের নিজস্ব ‘পানামা খাল’-এর মতো ভূমিকা নিতে পারে। তবে এটি আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বিশ্লেষকরা আরও জানান, ইরান এখন সরাসরি সামরিক শক্তির চেয়ে রাজনৈতিক সহনশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদি টিকে থাকার কৌশলে জোর দিচ্ছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিরাপদ চলাচলের জন্য প্রতিটি ট্যাংকার থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ আদায় করা হচ্ছে, যা থেকে প্রতিদিন বড় অঙ্কের রাজস্ব পাচ্ছে দেশটি।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন প্রায় দুই কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য পরিবহন করা হয়, যা বৈশ্বিক ব্যবহারের প্রায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ। সৌদি আরব ও ইরাকসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর অধিকাংশ তেল রপ্তানিও এই পথনির্ভর।
বিজ্ঞাপন
ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেত কুপার এক বৈঠকে অভিযোগ করেন, ইরান কার্যত একটি আন্তর্জাতিক নৌপথকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে বিশ্ব অর্থনীতিকে চাপে ফেলছে। তার দাবি, সাম্প্রতিক অভিযানের পর থেকে একাধিক জাহাজে হামলা হয়েছে এবং বহু নাবিক আটকা পড়েছেন।
অন্যদিকে কার্নেগির গবেষক নিকোল গ্রাজিউস্কি মনে করেন, যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও ইরান অল্প সময়ের মধ্যেই তাদের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি পুনর্গঠন করতে সক্ষম হবে। ড্রোন প্রযুক্তির ক্ষেত্রে এটি আরও সহজ।
বিজ্ঞাপন
মারওয়ান মুয়াশার সতর্ক করে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তায় যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতার পুরোনো কৌশল এখন আর আগের মতো কার্যকর নয়। তার মতে, যদি হরমুজ প্রণালি খোলা ছাড়াই যুদ্ধ শেষ হয়, তবে অন্য কোনো দেশ শক্তি প্রয়োগ করে এটি স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নাও নিতে পারে।








